দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত নওগাঁ জেলা। বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলের অংশ হিসেবে পরিচিত জেলার আয়তন ৩ হাজার ৪৩৫ দশমিক ৬৫ বর্গকিলোমিটার। ২০২১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১১টি উপজেলায় স্থাপন করা হয় ৩০৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক। তবে বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো নানা সমস্যায় জর্জরিত। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না করায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে অধিকাংশ কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবন। কোথাও কোথাও ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা হলেও ঝুঁকি নিয়ে চলছে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। এছাড়া রয়েছে ওষুধ সংকট। অনেক ক্লিনিকে নেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী। কোথাও আবার নেই নিয়মিত বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা। এ অবস্থায় প্রত্যাশিত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে গ্রামীণ দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। মূলত জনগণের অংশগ্রহণে গ্রামীণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা পৌঁছে দেয়াই ছিল এর মূল লক্ষ্য।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, কমিউনিটি ক্লিনিক শুধু একটি ভবনই নয়। এ ক্লিনিকের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে মাতৃ, শিক্ষা, কৈশোর স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা হয়। টিকাদান কর্মসূচি ও পুষ্টির কার্যক্রম চালানো হয়। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে এসব ক্লিনিক থেকে সেবাগ্রহীতাদের পরবর্তী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়। তবে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক কাজ সঠিকভাবে হয় না। চিকিৎসক, নার্সসহ অন্য স্বাস্থ্য কর্মীদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। তবে এগুলো একদিনে এসব সম্ভব নয়।

সরজমিনে নওগাঁ সদর, মহাদেবপুর, নিয়ামতপুর ও বদলগাছী উপজেলার ২০টি ক্লিনিক ঘুরে দেখা গেছে, ভবনগুলো সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। দেয়াল ও ছাদে ছোট-বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ছাদসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। জরাজীর্ণ এসব ভবনে ঝুঁকি নিয়ে চলছে চিকিৎসা। অনেক ক্লিনিকে নেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী। রয়েছে ওষুধ সংকট। কোথাও দেখা গেছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নিয়মিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও নেই। কোথাও আবার শৌচাগার নষ্ট হয়ে আছে। সংস্কার না করায় ব্যবহারের অনুপযোগী এসব ভবনে অবস্থান করার সময় রোগী, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীরা আতঙ্কে থাকেন।

নিয়ামতপুর উপজেলার হাজীনগর ইউনিয়নের কন্যাপাড়া কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) ইমরান হোসেন বলেন, ‘স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় ওই ভবনেই ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিতে হচ্ছে। ভবনে যতক্ষণ থাকি ততক্ষণই আতঙ্কে থাকতে হয়। মাঝে মাঝে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে।’

একই উপজেলার পাড়ইল ইউনিয়নের ফুলহারা কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি নুরুজ্জামান বুলবুল বলেন, ‘দুই বছর আগে ভবনটি একেবারেই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ঝুঁকি থাকায় দুই বছর ধরে ফুলহারা বড় সমাসপুর নুরানী হাফেজিয়া মাদ্রাসা ভবনের একটি কক্ষে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ক্লিনিকগুলোতে আগে ২৭ ধরনের ওষুধ দেয়া হতো। বর্তমানে এসব ক্লিনিকে কৃমি, স্ক্যাভিস, গ্যাস, চর্মরোগ, প্রজননজনিত রোগসহ বিভিন্ন রোগের ২২ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হয়।

তবে চাহিদার তুলনায় ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ সরবরাহ কম। এ কারণে অনেক সময় রোগীরা প্রয়োজনীয় ওষুধ পান না বলে অভিযোগ করেন। আবার অনেক সময় স্বাস্থ্য কর্মীদের না পেয়ে রোগীদের ফিরে আসতে হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে। সঠিক সময়ে কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবনগুলো সংস্কার না করায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এসব কারণে ক্লিনিকগুলোর যে মূল উদ্দেশ্য, তা ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করেন প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ করা স্বাস্থ্য কর্মীরা।

মহাদেবপুর উপজেলার চান্দাশ কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি বিলকিস আক্তার বলেন, ‘ক্লিনিকটা পরিত্যক্ত হতে বসেছে। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে। একটু বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি কাগজপত্র, টেবিল-চেয়ারসহ অন্যান্য আসবাবপত্রে গিয়ে পড়ে। এ কারণে ক্লিনিকের কক্ষগুলোর ছাদ পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। পানি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকলেও ক্লিনিকের একমাত্র টয়লেট তিন-চার বছর ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে আছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সব জানা সত্ত্বেও সমস্যাগুলোর সমাধান হচ্ছে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘একটা কমিউনিটি ক্লিনিকে একজন সিএইচসিপি, একজন স্বাস্থ্য সহকারী ও একজন করে পরিবার পরিকল্পনা সহকারী কর্মকর্তা থাকার কথা। সিএইচসিপি হিসেবে আমি সপ্তাহে ছয়দিন ক্লিনিকে থাকলেও স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার পরিকল্পনা সহকারীকে আরো দুটি ক্লিনিকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তারা সপ্তাহে দুই কিংবা একদিন এখানে এসে চিকিৎসা দিতে পারেন। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মানসম্মত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’

রোগী ও তাদের স্বজনরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এমন অবস্থায় চিকিৎসাসেবা চললেও নতুন ভবন তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চিকিৎসা নিতে এসে আতঙ্কে থাকতে হয় তাদের। চিকিৎসাসেবা নিতে এসে পলেস্তারা খসে পড়ে আহত হওয়ার শঙ্কায় থাকেন রোগী ও স্বজনরা। তারা আশা করছেন, দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ হলে চিকিৎসাসেবার মান যেমন বাড়বে, তেমনি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ভোগান্তিও কমবে।

সার্বিক বিষয়ে নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলার যে কয়টি কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শন করেছি, তাতে খুবই হতাশাজনক চিত্র চোখে পড়েছে। এখানকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমিউনিটি ক্লিনিক ভবন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এগুলো সংস্কার করেও কাজ চালানো সম্ভব নয়। ভবনগুলো পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে একাধিকবার চিঠি দেয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে কিছু কিছু ভবন সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ হতে পারে।’