দেশের গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুতের আলো পৌঁছাতে ছয় দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি)। ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকসংখ্যা বর্তমানে ৩ কোটি ৪৪ লাখ ৬০ হাজার। বিপুল জনগোষ্ঠীর কাছে বিদ্যুতের আলো পৌঁছাতে কাজ করলেও এখন আরইবির বেশির ভাগ সমিতি লোকসানে রয়েছে। 

সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৬৬টি বর্তমানে লোকসানে রয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এসব সমিতির লোকসান ছিল ৯৬২ কোটি টাকা। আর লাভে রয়েছে ১৪টি। এসব সমিতির আওতায় আরইবির লাভের পরিমাণ ছিল ওই অর্থবছরে ৩৩৮ কোটি টাকা।

আরইবি জানিয়েছে, লোকসানে থাকা এসব সমিতি ক্রস সাবসিডির মাধ্যমে সমন্বয় করে চলছে। গত অর্থবছরে ক্রস সাবসিডির মাধ্যমে এসব সমিতি থেকে ২ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। লাভের ৯০ শতাংশ অর্থ দিয়ে লোকসানে থাকা সমিতিগুলোর ৮০ শতাংশ আর্থিক ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে। তবে বিদ্যুতের বাল্কমূল্য বেড়ে যাওয়ায় এবং সেই তুলনায় গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম না বাড়ায় আরইবির চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াবে ২ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা।

মূলত শিল্প এলাকার সমিতিগুলো বেশি রাজস্ব আয় করছে। ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ এবং চট্টগ্রাম সমিতিগুলোই লাভ করছে। এসব এলাকায় সমিতিগুলোর গ্রাহকের বেশির ভাগই শিল্প মালিক।

বিআরইবির সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) আমজাদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলো এবং যেসব সমিতি এলাকায় শিল্পের গ্রাহক নেই সেসব প্রতিষ্ঠান লোকসানে। এর ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগে বৈদ্যুতিক লাইন ছিঁড়ে যাওয়া, অবকাঠামো নষ্ট হওয়া, ভোল্টেজ আপডাউনের কারণে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিদ্যুৎ বিক্রি বাবদ এ অর্থ তুলে আনতে পারে না তারা। ফলে লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপ নিচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে লাভজনক করতে হলে সংশ্লিষ্ট সমিতির আওতায় শিল্প এলাকা থাকতে হবে। শিল্প-কারখানার আওতাধীন সমিতিগুলো এখন লাভে রয়েছে।’

ক্রস সাবসিডির মাধ্যমে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ দেয়া হচ্ছে লোকসানে থাকা সমিতিগুলোকে। প্রতি বছর ক্রস সাবসিডির পরিমাণ বাড়ছে। ১৩-১৪টি সমিতি বিপুল পরিমাণ ক্রস সাবসিডি দিচ্ছে।

আইইবি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬৪টি সমিতিকে ১ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা ক্রস সাবসিডি দেয়া হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ হাজার ৭ কোটি, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২ হাজার ৪০ কোটি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ৩৩০ কোটি ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা সাবসিডি দেয়া হয়েছে। গত পাঁচ অর্থবছরে গড়ে ৬৫টি সমিতিকে ১০ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা ক্রস সাবসিডি দেয়া হয়েছে। 

আরইবি বলছে, বিদ্যুতের বাল্ক প্রাইজ বেড়ে যাওয়ার কারণে এ ক্ষতি আরো বেড়ে গেছে। সংস্থাটির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বিদ্যুতের বাল্কমূল্য ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়িয়েছে। বিপরীতে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য বেড়েছে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ।

বিআরইবির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র বলছে, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে আরইবির লোকসান হতে পারে ২ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ২ টাকা ৫০ পয়সা লোকসান হচ্ছে। ক্রয়ের চেয়ে কম মূল্যে বিদ্যুৎ বিক্রি করায় এ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। 

তবে আরইবির অন্য একটি সূত্র বলছে, সমিতিগুলোর আর্থিক লোকসান হওয়ার আরো একটি বড় কারণ কম মূল্যে লাইফলাইন গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেয়া। সাধারণত ০-৫০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের বিদ্যুতের লাইফলাইন গ্রাহক হিসেবে ধরা হয়। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বিদ্যুতের সুবিধা দেয়া এবং আর্থিক জীবনমান উন্নয়নে এ শ্রেণীর গ্রাহককে কম মূল্যে বিদ্যুৎ সুবিধা দেয়ার নীতি সরকারের পাঁচ দশক আগের। ২০১০ সালের মার্চের আগ পর্যন্ত লাইফলাইন  গ্রাহকের বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম ছিল ২ টাকা ৫০ পয়সা। ১০ বছর পর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা করা হয় ইউনিটপ্রতি ৩ টাকা ৭৫ পয়সা। এরপর চলতি বছরে তিন দফা দাম বাড়িয়ে ইউনিটপ্রতি করা হয় ৪ টাকা ৩৫ পয়সা। অর্থাৎ গত ১৩ বছরে লাইফলাইন গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি বেড়েছে ১ টাকা ৮৫ পয়সা।

বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ৮৪ পয়সা। অন্যদিকে এই বিদ্যুৎ লাইফলাইন গ্রাহকের কাছে বিক্রি হচ্ছে ৪ টাকা ৩৫ পয়সা। ইউনিটপ্রতি লোকসান ৪ টাকা ৪৯ পয়সা। ক্রস সাবসিডি ও ভর্তুকির মাধ্যমে এ খরচ সমন্বয় করা হলেও বর্তমানে এটি এখন লোকসানের বড় একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরই মধ্যে বিতরণ কোম্পানি আইইবি থেকে লাইফলাইন গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে প্রস্তাব দেয়াও হয়েছে।

২০২১ সালের মার্চে দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নে ঘোষণা দিয়েছে সরকার। গ্রাম পর্যায়ে এখন অর্থনীতির কর্মকাণ্ড বেড়ে চলেছে। ছোট ছোট ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে উঠেছে। ফলে এখন আর কম মূল্যে লাইফলাইন গ্রাহকের বিদ্যুৎ দেয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা তা নিয়ে ভেবে দেখার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যুতের নীতি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতউল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়ন হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছে সরকার। গ্রামীণ জীবনমান আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। গ্রামে এখন ইলেকট্রিক নানা ধরনের যন্ত্রাংশ ব্যবহার হয়। পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকের বিদ্যুতের ব্যবহারও আগের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে লাইফলাইন গ্রাহকের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভেবে দেখার সময় এসেছে। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে লাইফলাইন গ্রাহকদের সরবরাহ করা হচ্ছে কিনা সেটি দেখতে হবে। এখানে বিদ্যুৎ চুরির ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।’