কলাগাছকে বলা হয় ভেষজ উদ্ভিদ। নরম কাণ্ডবিশিষ্ট এ গাছের আঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে সুতা। আর সেই সুতা তাঁতে বুনে তৈরি করা হয়েছে শাড়ি, যার নাম দেয়া হয়েছে কলাবতী। অকেজো কলাগাছের সুতায় তৈরি হচ্ছে কার্পেট, চাদরসহ কত কিছু। এতদিন কেবল ফল দেয়ার পর যে গাছ কেটে ফেলা হতো, সেই গাছই এখন হয়ে উঠেছে মূল্যবান। শাড়ি-সুতার পর এবার গাইবান্ধায় কলাগাছ দিয়ে তৈরি হচ্ছে গোখাদ্য।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের দুর্গম চর হাজিরহাট (কানি চরিতাবাড়ী)। নদীভাঙন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এ জনপদের মানুষের দিন কাটে অভাব-অনটনে। তবে চরের কৃষক আইয়ুব মিয়ার চোখে এখন নতুন আশার আলো। একসময় অভাব ছিল তার নিত্যসঙ্গী। কৃষিকাজে খরচ বেশি, আয় কম। চরাঞ্চলের দুর্গমতার কারণে আধুনিক প্রযুক্তিও তেমন ছিল না। সম্প্রতি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসকেএস ফাউন্ডেশনের প্রদৃপ্ত প্রকল্পের সহযোগিতায় হেলেজ (গোখাদ্য) তৈরির একটি মেশিন হাতে পান তিনি। মেশিনে কলাগাছ প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে গবাদিপশুর জন্য তৈরি করেন পুষ্টিকর খাদ্য। এতে একদিকে কমছে গোখাদ্যের সংকট, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। আইয়ুব মিয়া এখন নিজের পালন করা গবাদিপশুর নিয়মিত খাবার জোগান দেয়ার পাশাপাশি আশপাশের কৃষকদের কাছেও সরবরাহ করছেন গোখাদ্য।

আইয়ুব মিয়া জানান, শুরুতে ফেলনা কলাগাছ সংগ্রহ করা হয়। এরপর পাতা ও অতিরিক্ত অংশ ফেলে দিয়ে ছোট ছোট টুকরো করে মেশিনে দেয়া হয়। মুহূর্তেই সেগুলো চূর্ণ হয়ে যায়। পরে তা সংগ্রহ করে রোদে শুকাতে দেয়া হয়। শুকানোর পর তাতে ভুসি, নালি ও লবণ মিশিয়ে কনটেইনারে করে সংরক্ষণ করে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়। প্রতিটি কলাগাছ থেকে দুই-সাত কেজি পর্যন্ত হেলেজ তৈরি করা যায়। প্রতি কেজি হেলেজ ৩৫ টাকা দরে বিক্রি করা হয়।

তিনি বলেন, ‘আগে গরুর খাবারের জন্য চিন্তায় পড়তে হতো। এখন কলাগাছ দিয়েই খাবার তৈরি করছি। এতে খরচ কমছে, গরুও সুস্থ থাকছে। আশা করছি সামনে এ কাজ দিয়েই আমার সংসার চালাতে পারব।’

গ্রামের মানুষও বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তারা জানান, আগে কলাগাছ কেটে ফেলে দিতেন। এখন তা দিয়েই তৈরি হচ্ছে গোখাদ্য। চরাঞ্চলের যুবকদেরও এ পেশায় আগ্রহী হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এসকেএস ফাউন্ডেশনের প্রদৃপ্ত প্রকল্পের মাঠকর্মীরা বলছেন, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখবে। কারণ টেকসই কৃষির জন্য স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপাদান ব্যবহার করে পশুপালন ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেয়া এখন সময়ের দাবি।

এসকেএস ফাউন্ডেশনের প্রদৃপ্ত প্রকল্পের মাঠকর্মী আনিসুল হক প্লাবন বলেন, ‘আইয়ুব আলীকে গোখাদ্য তৈরির মেশিনসহ ৭২ হাজার টাকার প্রয়োজনীয় উপকরণ দেয়া হয়েছে। চরাঞ্চলে বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের খাবার জুটলেও গরুর জন্য খাবার সংগ্রহ দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। সে সময় এ খাদ্য অনেক বেশি কাজে লাগবে।’

গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘এ পদ্ধতিতে গরুর খাদ্য উৎপাদন করা হলে তাতে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি গরুর খাদ্য সংকটও কিছুটা দূর হবে।’ এ পদ্ধতি সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার পরামর্শ দেন এ কর্মকর্তা।