ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) নির্বাচনী ভাষণ দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। গতকাল সন্ধ্যায় প্রচারিত ভাষণে তিনি বৈষম্যহীন ও ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এনসিপির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানান।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর গত ৫৫ বছরে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বন্দোবস্ত গড়ে উঠেছে, তার মূল ভিত্তি ছিল বৈষম্য। এরই পরিণতিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পুরনো কাঠামো ভেঙে পড়েছিল। এ বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, আইনের প্রয়োগ এবং সুযোগ বণ্টনের প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে প্রোথিত। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা ছিল এবং ক্ষমতাসীনদের সংস্পর্শে পৌঁছতে পেরেছে, তারাই শুধু নিজেদের ভাগ্য বদলে নিয়েছে। বিপরীতে সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী শ্রেণী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সর্বক্ষেত্রে বঞ্চিতই থেকে গেছে।’

বিগত শাসনামলে গুম-খুনের সঙ্গে জড়িতদের বিচার করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট ঘোষণা দিচ্ছি, বিভিন্ন বাহিনীর ভেতরে গুম, খুন, নির্যাতন, দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত লুকিয়ে থাকা সব অপরাধীকে শনাক্ত করা হবে। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকৃত দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি বিধান করা হবে।’

পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা ও লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গীকার করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘দেশবাসী যদি আমাদের সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়, তবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে। লুটপাট ও অর্থ পাচারের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়মুক্তি দেয়া হবে না। খুনি হাসিনার দোসর ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, তাদের সুবিধাভোগী আমলা ও আত্মীয়-স্বজনদের আইন ও বিচারের আওতায় আনা হবে।’

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও সহযোগিতা উল্লেখ করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ঘাটতি এবং কারো ওপর অতি নির্ভরশীলতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে এনে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা হবে। আমরা অগণতান্ত্রিক শাসকদের নতজানু নীতিকাঠামো ভেঙে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও স্বকীয় পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করব। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে সার্ক পুনরুজ্জীবিত করা হবে এবং আসিয়ানে যোগ দেয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাব।’

দেশের প্রতিরক্ষা বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘দেশের সব ১৮-ঊর্ধ্ব সক্ষম তরুণ-তরুণীর জন্য বাধ্যতামূলক মিলিটারি ট্রেনিং চালু করা হবে। এতে দেশব্যাপী জনভিত্তিসম্পন্ন এক গণপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। ফলে আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের বিনিয়োগকৃত অর্থের অপচয় কমবে।’

ন্যায্য, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব বাজার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলাদের সিন্ডিকেট ভাঙা হবে। এমন দুষ্ট চক্রের বিরুদ্ধে আইন করে তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে। কৃত্রিমভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ, কারসাজি ও অবৈধ মজুদদারি প্রমাণ হলে অপরাধীরা কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে।’

আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় দলীয় বাহিনী ভেঙে জননিরাপত্তার গণসংস্থা গড়ার কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম দুটি পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘দেশবাসীর মতামত নিয়ে, ফ্যাসিবাদের ১৫ বছরে হাজারো মানুষ হত্যা, নির্যাতন, গুম, খুন ও নানা জুলুমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার দায়ে পুলিশ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে “‍জনসেবক বাহিনী” বা অন্য কিছু রাখা হবে।’

শাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ করে কেন্দ্র ভেঙে ক্ষমতা প্রান্তে ছড়িয়ে দেয়ার কথা উল্লেখ করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘বিচার ব্যবস্থার জট কমাতে উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপন করা হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা ও আয়োজন করা হবে, যাতে ছোটখাটো বিরোধ স্থানীয়ভাবেই দ্রুত সমাধান পায়।’

নারীর অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে এনসিপির নেতা বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাঙ্গন, যানবাহন, জনসমাগমস্থল, এমনকি ঘরের ভেতরেও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি চাকরি, রাজনীতি, জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকারসহ সব পর্যায়ে নারীদের যৌক্তিক অংশগ্রহণের সুযোগ অবারিত করা হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের নতুন বন্দোবস্ত হবে এমন এক শিক্ষা সংস্কার, যেখানে উন্নয়ন মানে নতুন ভবন ও অবকাঠামো বাড়ানো নয়; বরং বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকার অর্থে মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।’

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে অঙ্গীকার জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে “‍চিকিৎসা” শব্দের অর্থ হবে সেবা নিশ্চিত করা।’

ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ধর্ম থাকবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সামাজিক সাংস্কৃতিক চর্চার জায়গায়, আর রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে।’