ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০টি আসনে ফলাফল জালিয়াতি ও কারচুপির অভিযোগ তুলে এসব আসনে বিজয়ীদের শপথ স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে ফলাফল পুনর্মূল্যায়ন করার দাবিও জানিয়েছে দলটি। এছাড়া নির্বাচনের পর সারা দেশে দলীয় কর্মীদের ওপর হামলা বন্ধের দাবি জানিয়েছে তারা। গতকাল দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব দাবি করেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করেছিল। সে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। যদিও নির্বাচনে অনেক ক্ষেত্রেই ভোট কারচুপি, জালিয়াতি, ভোট প্রদানে বাধা দেয়া হয়েছে, কেন্দ্রে এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। এ বিষয়গুলো আমরা আগেও বলেছি, আজও আপনাদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরছি। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০টি আসনে চরম অব্যবস্থাপনা দেখেছি। যেখানে ভোট জালিয়াতি, কারচুপি হয়েছে। যেসব কাগজ তারা দিয়েছে সেখানে কাটাছেঁড়া, ঘষামাজা ও ওভাররাইটিং হয়েছে। বিভিন্ন অসুবিধা হয়েছে। এসব বিষয়ে নির্বাচনের দিন রিটার্নিং অফিসার, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছিলাম।’

তিনি আরো বলেন, ‘কিছু আসনে ফলাফল ঘোষণায় মারাত্মক বিলম্ব হয়েছে, বিশেষ করে ঢাকার কয়েকটি আসনে ভোর ৫টা পর্যন্ত সময় লেগেছে। অথচ কিছু আসনে বিদ্যুৎ গতিতে ফল দেয়া হয়েছে। এ ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করা হয়েছে। নির্বাচনে যেসব আসনে অনেক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা দেখেছি, সেখানে পুনর্গণনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছি। নির্বাচন কমিশনকেও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হবে। সম্ভাব্য সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ আমাদের রয়েছে এবং আমরা তা গ্রহণ করব।’

সংবাদ সম্মেলনে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল ৩০টি আসনের তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘৩০টি আসনে ৫-১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হার-জিত হয়েছে। সেখানে নানারকম অনিয়ম হয়েছে। সেগুলোর প্রাথমিক তালিকা করা হয়েছে। এসব আসনে রিটার্নিং অফিসারের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু গেজেট প্রকাশ হয়ে গেছে। তবে এসব আসনে ফলাফল স্থগিত রেখে পুনর্গণনার মাধ্যমে নতুনভাবে ফলাফল ঘোষণার জন্য আইনি পদক্ষেপ নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। ফলাফল বাতিল ও পুনর্গণনার আবেদনের পাশাপাশি ঘোষিত যাদের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে, তাদের শপথ স্থগিত রাখার আবেদন করা হবে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে তুলে ধরা হবে। আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা-৭, ঢাকা-৮, ঢাকা-১০, ঢাকা-১৩, ঢাকা-১৭, পঞ্চগড়-১, ঠাকুরগাঁও-২, দিনাজপুর-৩, দিনাজপুর-৫, লালমনিরহাট-১, লালমনিরহাট-২, গাইবান্ধা-৪, বগুড়া-৩, সিরাজগঞ্জ-১, যশোর-৩, খুলনা-৩, খুলনা-৫, বরগুনা-২, ঝালকাঠি-১, পিরোজপুর-২, ময়মনসিংহ-১, ময়মনসিংহ-৪, ময়মনসিংহ-১০, কিশোরগঞ্জ-৩, গোপালগঞ্জ-২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫, চাঁদপুর-৪, চট্টগ্রাম-১৪ ও কক্সবাজার-৪।

এদিকে বিএনপি সরকার গঠন করলে গণভোটে জনগণের রায় বাস্তবায়ন হবে কিনা শঙ্কার কথা জানিয়েছে ১১ দলীয় জোট। জোটের পক্ষে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘এ নির্বাচন শুধু সংসদ নির্বাচন ছিল না। একই সঙ্গে গণভোটও হয়েছে। যেখানে জনগণ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছে। এটি ছিল জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য একটি সাংবিধানিক রেফারেন্ডাম। চারটি প্রশ্নের ওপর এই রেফারেন্ডাম অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং জনগণের রায়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উচ্চকক্ষে প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে ১০০টি আসন প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশনের (পিআর) মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। যেহেতু জনগণ এটি গ্রহণ করেছে, সেহেতু এখন এ বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর বা ধোঁয়াশা তৈরির কোনো সুযোগ নেই। তাই সংসদ বসার ১৮০ দিনের মধ্যেই যেন জুলাই সনদের আলোকে উচ্চকক্ষ গঠনে জনগণের রায় প্রতিফলিত হয়। জনগণের ভোটে গঠিত সংসদ জনমতের বিরুদ্ধে যেতে পারে না। তাহলে সংস্কার প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। তবে আমাদের শঙ্কা রয়েছে যারা সরকার গঠন করবে তারা এটি বাস্তবায়ন করবে কিনা। কারণ বাহ্যিকভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের কথা বললেও অভ্যন্তরীণভাবে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে দেখেছি। সেজন্য শঙ্কাটা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে।’

এ সময় তিনি নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ১১ দলীয় জোটের পক্ষে কাজ করা নারীদের টার্গেট করে হামলা চালানো হয়েছে। তাহলে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে দেশকে কি আবার নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে? আমরা তো জুলাইয়ের রক্তাক্ত অভ্যুত্থান করেছি একটি সুন্দর, সহিংসতামুক্ত, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য। যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন, তাদের দায়িত্ব আরো বেশি। তাদের দলীয় কমান্ড ব্যবহার করে এ সহিংসতা বন্ধ করা উচিত। না হলে আমরা রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকে যেতে বাধ্য হব। আমরা কর্মসূচি প্রস্তুত রেখেছি, শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা করে তা ঘোষণা করা হবে।’

এদিকে সারা দেশে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার প্রতিবাদে আগামীকাল রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করবে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এদিন আসরের পর বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট থেকে মিছিলটি বের হবে।

গতকাল সন্ধ্যায় ১১ দলীয় জোটের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে এ কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

ওই সূত্র জানায়, নির্বাচন-পরবর্তী দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের লোকদের বহু বাসা-বাড়ি, পরিবারের সদস্য ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বর্বর হামলার খবর পাওয়া গেছে।

ভোটের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনা ছাড়াও ভোটের রাতেই অন্তত ২১টি সহিংসতার তথ্য তুলে ধরেছে জামায়াত। নির্বাচনে ব্যাপক জয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় বসতে যাওয়া বিএনপির লোকেরাই এসব সহিংসতা ঘটাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন।