একসময় এ খাল দিয়ে রামদিয়ার সঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নৌ-যোগাযোগ ছিল। এটিকে রামদিয়া বন্দরের প্রাণ বলা হয়। বর্তমানে পানি শুকিয়ে বলুগা খাল মরা খালে পরিণত হয়। পলি জমে খালের বিভিন্ন অংশ ভরাট হয়ে গেছে। নাব্য সংকটে রামদিয়া বাণিজ্যিক কেন্দ্রের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। নৌ-যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন ও সেচকাজ ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া দেশী প্রজাতির মাছ উৎপাদনও কমে গেছে।

গোপালগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, রামদিয়া বন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্য ও খালের ওপর নির্ভরশীল ১০ হাজার হেক্টর জমির কৃষিকাজ অব্যাহত রাখতে সরকার খালটির নাব্য ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেয়। ২০১৭ সালে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি প্যাকেজে খালটি খনন করা হয়। খননের পর খালটিতে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হয়ে আসে।

রামদিয়া বাজারের ব্যবসায়ী মো. সাঈদ মোল্যা বলেন, ‘নৌপথে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায় রামদিয়া বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, ঝালকাঠি, টেকেরহাট থেকে ব্যবসায়ীরা বড় বড় নৌকা, ট্রলার নিয়ে এখানে ব্যবসা করতে আসতেন। এ খাল দিয়ে নৌপথে কৃষকরা বাজারে ধান, পাটসহ কৃষিপণ্য বিক্রির জন্য নিয়ে আসতেন। আমরা নৌপথে লঞ্চে করে গোপালগঞ্জ জেলা শহরসহ বিভিন্ন স্থানে যেতাম। নাব্য সংকটের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য একেবারেই স্থবির হয়ে পড়েছে।’

ওই বাজারের ব্যবসায়ী আকরাম হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘কাশিয়ানী উপজেলার সোনাডাঙ্গা থেকে কুমারিয়া পর্যন্ত খালের প্রায় ১০টি স্থানে খননকাজের সুবিধার্থে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। কাজ শেষে বাঁধগুলো অপসারণের শর্ত ছিল। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাঁধ অপসারণ করেনি। খননের চার বছর পর খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে শুরু করে। পলি জমতে জমতে নাব্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এখন পণ্য পরিবহন, নৌ-যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। সড়কপথে পণ্য পরিবহনে খরচ বেড়ে গেছে। লাভ কমেছে। তাই ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

সোনাডাঙ্গা গ্রামের কৃষক হারেজ আলী বলেন, ‘খালে পানি নেই, সেচ দিতে পারি না। মাটির নিচ থেকে শ্যালো দিয়ে পানি তুলে সেচ দেয়া হচ্ছে। এতে ফসলের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। উৎপাদিত ফসল খাল দিয়ে আনা-নেয়া যাচ্ছে না। আগে খালে মাছ পাওয়া যেত, কিন্তু এখন মাছও নেই। এ মাছ ছিল আমাদের জীবন-জীবিকার অন্যতম উৎস। তাই আমাদের বাঁচাতে দ্রুত খাল খনন করে দেয়া দরকার।’

লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক গোপাল দাস বলেন, ‘দীর্ঘদিন খালটি খনন করা হয়নি। তাই এটি মরা খালে পরিণত হয়েছে। খালে পানির অভাবে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বোরো মৌসুমে খালে পানি থাকে না। আগে আমরা নৌকায় করে ধান-পাটসহ কৃষিপণ্য রামদিয়া বাজারে নিয়ে বিক্রি করতাম। এখন খালে পানি নেই। তাই মাথায় বা ভ্যানে করে, অনেক সময় বাড়তি খরচে পণ্য আনা-নেয়া করতে হচ্ছে।’

রামদিয়া বাজারের উদ্যোক্তা কামাল হোসেন বলেন, ‘খালটি খনন করা হলে আবারো আগের নাব্য ফিরে পাবে। ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ খালটি খননের উদ্যোগ নেবে, এটি আমার প্রত্যাশা।’

গোপালগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনিস হায়দার খান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দেশব্যাপী জলাশয় ও খাল পুনঃখনন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা গোপালগঞ্জে বেশকিছু প্রকল্প গ্রহণ করেছি। সেই সঙ্গে বলুগা খালটিও খননের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পেলে খালটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খনন করা হবে। খাল খননে আগের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করে থাকলে সেটাও খতিয়ে দেখা হবে।’