বিএনপি মনোনীত চট্টগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মো. আসলাম চৌধুরী আগে থেকেই নানা কারণে আলোচিত ছিলেন। ৫ আগস্ট–পরবর্তী সময়ে বিএনপির মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়েও তিনি আবার আলোচনায় আসেন। দল থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ার পর ঋণখেলাপি ইস্যুতেও তাঁকে ঘিরে আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের যাচাইয়ে ঋণখেলাপিসংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে তিনি সীতাকুণ্ডে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন বণিক বার্তার সঙ্গে।
১৭ বছর পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখছে মানুষ। আবার আইনশৃঙ্খলার অবনতি, সুষ্ঠু ভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহও দানা বাঁধছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
নির্বাচন মানুষের একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত কয়েকটি নির্বাচনে মানুষ সেই অধিকার বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারেনি। ভোট দিতে চাইলেও দিতে পারেনি, কিংবা ভোটের ফলাফল নিয়ে মানুষের অনাস্থা তৈরি হয়েছিল। এবার যে পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, তাতে আমি মনে করি মানুষের মধ্যে একটা নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। মানুষ ভোট দিতে চায়, নিজের মত প্রকাশ করতে চায়। তবে এ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, আমাদের জন্যও একই রকম চ্যালেঞ্জ। কারণ দীর্ঘদিন ভোটবিমুখতা, ভয়, অনাস্থা—এসব কাটিয়ে মানুষকে কেন্দ্রমুখী করা সহজ কাজ নয়। তবুও আমি আশাবাদী, মানুষ যদি সৎভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে এ নির্বাচন দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে বড় পদক্ষেপ হবে।
আপনার কথায় একটা বিষয় এসেছে, নির্বাচন নিয়ে উদ্দীপনা আছে, কিন্তু আগের মতো তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। এটা কি নির্বাচনে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করবে বলে মনে করেন?
দেখুন, আগে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি দ্বিমুখী প্রতিযোগিতা ছিল। এতে স্বাভাবিকভাবেই মাঠ গরম থাকত। এবার দৃশ্যপটে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তাই আগের মতো ‘টানটান প্রতিযোগিতা’ সব জায়গায় নাও থাকতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি, ভোটের আসল শক্তি প্রতিযোগিতার উত্তাপে নয়, মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্তে। মানুষ যদি বুঝে যে তার ভোট সত্যিকার অর্থেই গণনা হবে, তাহলে প্রতিযোগিতা তুলনামূলক কম হলেও ভোটকেন্দ্রে আসবে। তবে একটা অংশ হয়তো বাইরে থাকতে পারে, ধরা যাক ১০ থেকে ১৫ শতাংশ।
নির্বাচনে সহিংসতা, ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা প্রদান, কারচুপি বা প্রভাব বিস্তারের কথা বলছে অনেক দল ও প্রার্থীরা। আপনার কী মনে হয়?
আশঙ্কা তো থাকেই, কারণ অতীত অভিজ্ঞতা মানুষকে সেই শিক্ষা দিয়েছে। কিন্তু কারচুপি-আশঙ্কা যতটা, তার চেয়ে বড় বিষয় হলো মানুষের প্রত্যাশা। আমি মনে করি, স্বচ্ছ ভোট হলে ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন থাকবে না। মানুষ যদি কেন্দ্রে গিয়ে নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পারে, তাহলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমে যাবে। মানুষের পাশে থেকে, জনসম্পৃক্ততা রেখে, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে, আইনগতভাবে যা যা দরকার তা করে আমরা মাঠে আছি। একটা নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে হলে ভোটারের নিরাপত্তা, নিরপেক্ষ মাঠ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা—এই তিনটি জায়গা নিশ্চিত করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা ৫ আগস্ট–পরবর্তী দখল, চাঁদাবাজির বিষয় নিয়েও নানান আলোচনা-সমালোচনা করছে। আপনার এলাকার বাস্তবতায় আপনি কী দেখছেন?
চাঁদাবাজি, দখল—এসব খুবই ক্ষুদ্র ও আপেক্ষিক বিষয়। দেশে কর্মসংস্থান নেই, আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণে অনেক বিষয় ঘটছে, যা নির্বাচিত সরকার এলে থাকবে না। বাস্তবতা হচ্ছে, কিছু দলের ভোট মূলত সংগঠন বা ক্যাডারভিত্তিক। জনসমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে তারা রাজনীতি করে—এমন নয়। তাদের সংগঠন শক্ত, তারা একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক দলীয় ভোটকে নিয়েই রাজনীতি করে। আপনি দেখবেন, ৫ আগস্ট–পরবর্তী কিংবা কয়েক দশক আগেও জামায়াতে ইসলামী ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কীভাবে তাদের দখলে ছিল, আছে। কিন্তু হঠাৎ করে রাতারাতি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া—এসব দলের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। আমার এলাকায় যে হিসাব আমি দেখেছি, স্বাভাবিক অবস্থায় কিছু দল কয়েকশ’র বেশি ভোট পাওয়ার কথা না, যদি কোনো ধরনের কারসাজি না হয়। তাই আমি বলি, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে মানুষের প্রকৃত রায় প্রতিফলিত হবে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু কারও ভোট-গণিতকে অতিরঞ্জিত করে ভয় তৈরি করা ঠিক নয়।
৫ আগস্ট-পূর্ববর্তী আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা, ৮ বছরের বেশি কারাভোগ সত্ত্বেও দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নানান অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। এ অনিশ্চয়তা কেন তৈরি হলো বলে মনে করেন?
রাজনীতিতে অনেক সময় বাস্তবতা আর প্রত্যাশা এক জায়গায় স্থির থাকে না। দীর্ঘদিন যারা সংগ্রামে ছিলেন, তাঁদের প্রতি মানুষের আলাদা আবেগ থাকে। আবার দলীয় প্রক্রিয়ায় অনেক হিসাব-নিকাশও থাকে। আমি ব্যক্তিগতভাবে দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হয়েছি, জেল খেটেছি, মামলা-মোকদ্দমার শিকার হয়েছি, ব্যবসায়ও বড় ক্ষতি হয়েছে। তবুও রাজনীতি ছেড়ে দিইনি, কারণ আমি বিশ্বাস করি দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করতে হলে রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্যেই থাকতে হয়। মনোনয়ন নিয়ে যে নাটকীয়তা হয়েছে, সেটাকে আমি দলীয় সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখছি। তবে এটাও সত্য যে জনগণ যাকে চায়, তাকে পাশ কাটিয়ে অন্য কাউকে সামনে আনলে জনগণ সেটা গ্রহণ করবে না। এ বার্তাটা জনগণ বারবার দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত দলও জনগণের অনুভূতির প্রতি সম্মান রেখেছে।
এলাকাবাসীর আস্থা ও প্রত্যাশাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন বা নির্বাচিত হলে করবেন?
আমার কাছে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের ভালোবাসা। চট্টগ্রাম-৪, বিশেষ করে সীতাকুণ্ডের মানুষ আমাকে চেনে, আমার কাজ দেখেছে, আমার সংগ্রামও দেখেছে। জনগণ বুঝিয়ে দিয়েছে যে এখানে বাইরে থেকে কাউকে চাপিয়ে দিলে তারা মেনে নেবে না। এ যে জনমত, এ যে গণসংযোগ—এটাই রাজনীতির প্রাণ। আমি বিশ্বাস করি, মানুষ যদি ভোট দিতে পারে, তাহলে আমি বড় ভোটের ব্যবধানে জয়ী হতে পারব। কারণ মানুষ পরিবর্তন চায়, নিরাপত্তা চায়, সুশাসন চায় এবং অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন চায়।
সীতাকুণ্ড এলাকার অর্থনৈতিক গুরুত্ব কোথায়?
এ এলাকা শুধু চট্টগ্রামের নয়, দেশের অর্থনীতিরও মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ, পাহাড়-সমুদ্রের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, শিপ ব্রেকিং শিল্প, ইস্পাত, স্টিল—নানা ভারী শিল্প সবকিছু মিলিয়ে এটি দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের কেন্দ্রীয় স্রোতের সঙ্গে যুক্ত সীতাকুণ্ড। কিন্তু আমরা দেখেছি, দীর্ঘ সময় ধরে ‘উন্নয়ন’ শব্দটা অনেক ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া ব্যবহার হয়েছে। অনেক অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, কিন্তু তার ব্যবস্থাপনা ও উপযোগিতা ঠিকভাবে কাজে লাগেনি। আমার লক্ষ্য হবে বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ এলাকার প্রতিনিধি হিসেবে শিল্প, শ্রমিক, ব্যবসায়ী—সবাই যেন উপকৃত হয়।
পর্যটনের সম্ভাবনা কীভাবে দেখছেন?
একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সমুদ্র—এমন সম্ভাবনা সব এলাকায় নেই। চন্দ্রনাথ ধাম, কৈবল্যধাম, ইকোপার্কসহ তীর্থস্থানগুলো পরিকল্পিতভাবে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটক বাড়বে। পর্যটন মানে শুধু ঘুরতে আসা নয়, এটি কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয়ের বড় খাত। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
শিপ ব্রেকিং শিল্পের নিরাপত্তা নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
আগের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ঝুঁকি শূন্য হয়নি। এই শিল্পখাতকে আরও পরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে, কার্যকর তদারকি ও জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের নিরাপত্তাই এখানে মুখ্য।
পরিবেশ ও শিল্পের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব?
পরিবেশ বাদ দিয়ে শিল্পায়ন টেকসই হয় না। আবার মানুষকে কর্মহীন করেও দেশ চলবে না। পরিবেশ রক্ষা করে, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যমান বজায় রেখে শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে—এটাই আমাদের লক্ষ্য।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে আপনার অবস্থান?
আমরা সবাই আগে মানুষ, তারপর ধর্ম। সমান নিরাপত্তা, সমান অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ঋণখেলাপি ইস্যু নিয়ে আপনার বক্তব্য?
ঋণ নিয়ে ব্যবসা করা স্বাভাবিক। কিন্তু টাকা লুট করে বিদেশে পাচার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচন কমিশন সবকিছু যাচাই করেই আমার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে।










