ফেনী শহরের ভিআইপি সড়ক নামে খ্যাত জনগুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘ এক দশক যাবত সড়কটি সংস্কার হয়নি। ফলে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় সড়কটি এখন চলাচলের অনুপযোগী। মাত্র ১ হাজার ৭০০ মিটারের এ সড়কে এখন কোনো যানবাহন দূরের কথা হেঁটে চলাও কঠিন হয়ে পড়েছে। শহর বাইপাস সড়কটির আশপাশে বসতি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে বেকায়দায় পড়েছেন স্থানীয়রা। সড়কটি সংস্কারে জেলা পরিষদ, পৌরসভা, এলজিইডি এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কেউ দায়িত্ব না নেয়ায় বছরের পর বছর স্থানীয়রা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা যেন দেখার কেউ নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালের শুরুর দিকে তত্কালীন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারীর উদ্যোগে ফেনী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উত্তর পাশঘেঁষে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহিপাল পর্যন্ত কৃষিজমি ভরাট করে রাতারাতি একটি কাঁচা সড়ক নির্মাণ করা হয়। এরপর সড়কটি মহিপাল থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও আদালত ভবনে আসা-যাওয়ার বিকল্প সড়ক হয়ে ওঠে। কিছুদিনের মধ্যেই ১ হাজার ৭০০ মিটার দীর্ঘ ও ৩০ ফুট প্রস্থের সড়কটি ফেনীর ভিআইপি সড়ক বলে পরিচিতি পায়। তবে জয়নাল হাজারীর উদ্যোগে অল্প সময়ের মধ্যে সড়কটি নির্মাণ করায় স্থানীয়রা এটিকে হাজারী সড়ক নাম দেয়। আবার কেউ কেউ পাগলা মিয়া সড়ক বলেও অবহিত করেন।
সড়কটি নির্মাণের পর যাতায়াত সুবিধা ভালো হওয়ায় দ্রুত সময়ে এলাকাটিতে বাড়ি-ঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর স্থাপিত হয়। এ সড়কে চালু হয় জেলার সর্ববৃহৎ দুটি কমিউনিটি সেন্টার। বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ দপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কার্যালয় রয়েছে এ সড়কে। সড়কটির দুই পাশে অন্তত দুই শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। মালিকানা জটিলতায় দীর্ঘদিন সড়কটি সংস্কারে কারো কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে এ সড়কে চলাচলে দুর্ভোগের পাশাপাশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও।
ফলে দীর্ঘদিন লোকসান দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুটিয়ে নিয়েছে অনেকে।
সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জনদুর্ভোগ লাঘব করতে ২০০৪ সালের দিকে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ভিপি জেলা পরিষদের অর্থায়নে ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটি পাকা করে দেন। ২০০৮ সালে এলজিইডি এটি সংস্কার করে ফেনী পৌরসভার কাছে মালিকানা হস্তান্তর করে। ২০১২ সালে ফেনী পৌরসভা থেকে দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। কিছুদিন পরই পাশের ড্রেন সংস্কার করতে গিয়ে সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে সড়কটির সংস্কারে আর কোনো বরাদ্দ দেয়নি ফেনী পৌরসভা। দীর্ঘ এক দশক ধরে ফেনীতে সরকারি কোনো দপ্তর বা সংস্থা সড়কের মালিকানা স্বীকার না করায় সংস্কারকাজ হচ্ছে না। এতে করে এ সড়ক বর্তমানে ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে পড়ে আছে।
স্থানীয়রা জানায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে ফেনীতে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটি শহরের যানযট নিরসনেও ভূমিকা রাখছে। এছাড়া এ সড়কের পাশে জেলার প্রশাসনিক কার্যালয়গুলো অবস্থিত হওয়ায় শহরের অন্য সড়কের তুলনায় এ সড়কের গুরুত্ব অনেকাংশে বেশি। শহর থেকে যাতায়াত সুবিধা ভালো থাকা ও সহজে নাগরিক সুবিধা পাওয়ায় কয়েক বছরের মাঝেই ওই এলাকা লোকারণ্য হয়ে ওঠে। বর্তমানে কোর্ট বিল্ডিং সংলগ্ন পাগলা মিয়া সড়কের পূর্ব অংশ থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন পশ্চিম অংশ পর্যন্ত সড়কটিতে অসংখ্য খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলেই গর্তগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। অন্য সময় ধুলোবালিতে পরিপূর্ণ হয়ে নাকাল অবস্থায় পড়েন এলাকাবাসী। এতে করে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনার কারণে যানবাহন চলাচলও সীমিত হয়ে গিয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান জানান, সড়কটির দুই পাশে অন্তত দুই শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সবচেয়ে বেশি অটোমোবাইল, গাড়ি মেরামত, ফার্নিচার, মোটর পার্টসের দোকান রয়েছে এ সড়কে। সড়কের পূর্ব ও পশ্চিম পাশে গড়ে উঠেছে জেলার দুটি সর্ববৃহৎ কমিউনিটি সেন্টার। সড়কে খানাখন্দ
হওয়ায় এখন তারাও তেমন কোনো প্রোগ্রাম পাচ্ছেন না। এরই মধ্যে অনেক ব্যবসায়ী তাদের প্রতিষ্ঠান গুটিয়ে নিয়েছেন। যারা রয়েছেন তারা লোকসানের ভার নিয়ে সড়কটি সংস্কারের প্রত্যাশায় দিন গুনছেন।
ফেনী পৌরসভার মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী জানান, সড়কটির মালিকানা নিতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কাছে চলতি বছরের শুরুর দিকে চিঠি দেয়া হয়েছে। ওই দপ্তর সড়কটি সংস্কারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
ফেনী সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী বিনয় কুমার পাল জানান, কিছুদিন আগে সড়কটি আমাদের কাছে হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ করেছে পৌরসভা। সে অনুযায়ী প্রধান কার্যালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এখনো পাস হয়নি, হস্তান্তরও হয়নি। আশা করি শিগগিরই এটি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত হবে। এরপর এটির প্রাক্কলন তৈরি ও সংস্কারে প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করা হবে।
জেলা প্রশাসক আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান বলেন, বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে ফেনীর এ সড়কটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শহরের এ বাইপাস সড়ক সংস্কারের তাগিদ দিয়ে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা ও উন্নয়ন সমন্বয় সভায় বারবার আলোচনা করা হয়েছে। সম্প্রতি সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে এ সড়কটি হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আশা করি অল্প সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষে সড়কটি সংস্কার করা হবে। এটি সংস্কার করা হলে জনসাধারণের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হবে।










