নভেল করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের সংক্রমণ ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে অধিকাংশ দেশ। ডেল্টার চেয়ে ভয়াবহ হতে পারে এমন আশঙ্কায় আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে তারা। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রস্তুতি অনেকটাই নির্দেশনায় সীমাবদ্ধ। অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ রোধে একগুচ্ছ নির্দেশনার বাইরে কার্যকর তেমন কোনো পদক্ষেপই দেখা যাচ্ছে না। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশে ওমিক্রনের সংক্রমণ হবেই, এটি অনেকটা নিশ্চিত। কিন্তু আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে এটিকে বিলম্বিত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া রোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি দেরিতে শনাক্ত হলে সেই সময়ের মধ্যে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নসহ সার্বিক প্রস্তুতি নেয়া সহজ হবে।

গত মাসে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম ধরনটি শনাক্ত হয়। পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এটিকে ওমিক্রন নাম দেয়। একই সঙ্গে ধরনটিকে উদ্বেগজনক হিসেবে আখ্যা দেয় তারা। ডেল্টার চেয়ে এটি ভয়াবহ হতে পারে এমন সতর্কবার্তাও দিয়েছে সংস্থাটি। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দ্রুত অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ার জেরে বাংলাদেশেও ধরনটি নিয়ে উদ্বেগ ও আলোচনা শুরু হয়। এক পর্যায়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে গত সপ্তাহে ১৫ দফা নির্দেশনা দেয়া হয়। এতে স্থল ও বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং জোরদারের পাশাপাশি বেশকিছু নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্দেশনার বাইরে দেশের মধ্যে অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত চোখে পড়ার মতো নয়। ডেল্টার মতো এটি দ্রুত জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়লে সেটি মোকাবেলা বেশ কঠিন হবে। এজন্য দেশে ধরনটি প্রবেশ করলেও তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়া যেন রোধ করা যায়, সেজন্য আরো কঠোর পদক্ষেপ জরুরি। বিশেষ করে ভারতে এরই মধ্যে এটি শনাক্ত হওয়ায় সীমান্তে আরো কঠোরতা আরোপ করা প্রয়োজন বলে মত তাদের।

ডব্লিউএইচওর তথ্যমতে, এক সপ্তাহের মধ্যে অতিসংক্রামক ওমিক্রন বিশ্বের ৪০টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশেও যেকোনো সময় এটির উপস্থিতি শনাক্ত হতে পারে বলে মনে করছেন ভাইরাস ও রোগতত্ত্ববিদরা। তারা বলছেন, বৈশ্বিক অতিমারীর এ সময়ে করোনার সংক্রমণ নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রাখা যায়নি। তেমনি সব দেশে নতুন ধরনের সংক্রমণ ছড়াবেই। তবে নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে সংক্রমণ বিলম্বিত করা যেতে পারে। এ সময়ের মধ্যে চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত হতে সময় পাওয়া যায়। ভারতে ওমিক্রনের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় ঘাটতি রাখা যাবে না। প্রবেশপথগুলোতে কড়াকড়ি আরোপের পাশাপাশি দেশের মধ্যে জোরদার পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজধানীসহ বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম নিতে হবে। ওমিক্রন ঠেকাতে সরকার গঠিত করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি গত মাসের শেষে সরকারকে বেশ কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছে। এ অনুযায়ী সরকার বিভিন্ন ব্যবস্থা নিলেও স্থানীয় পর্যায়ে আরো পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করেন কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, গত বছরও স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে জনসাধারণের আগ্রহ দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এখন তা আর দেখা যাচ্ছে না। করোনা ও টিকার বিষয়ে সরকার গঠিত কয়েকটি পরামর্শক কমিটি রয়েছে। তবে এসব কমিটির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা যাচ্ছে।

ওমিক্রনের সংক্রমণ ঠেকানো যাবে না, তবে সংক্রমণ বিলম্ব করা যাবে উল্লেখ করে এ ভাইরোলজিস্ট বলেন, অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এখনো ততটা সংগঠিত হতে পারেনি।

দেশে ওমিক্রনের সংক্রমণ ঠেকাতে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপের পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া ১৫ দফা নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে সব ধরনের জনসমাগম নিরুৎসাহিত করা, পর্যটন কেন্দ্রে অর্ধেক মানুষের অংশগ্রহণ ও রেস্টুরেন্টে অর্ধেক বা তারও কম মানুষ বসে খাওয়াসহ স্বাস্থ্যবিধি মানার পরামর্শ। যদিও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের কেউ কেউ বিমানবন্দরে কড়াকড়ির বিষয়টিকে পর্যাপ্ত ভাবলে তা আত্মঘাতী হবে। ওমিক্রন দেশে কখন সংক্রমণ ঘটাবে তা বোঝা মুশকিল। ফলে এখনই সারা দেশে সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মানতে প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কেবল নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে ভয়াবহতা বাড়তে পারে।

যদিও ওমিক্রন মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে প্রস্তুতি নেয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। গতকাল ঢাকার সাভারে এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, সংক্রমিত দেশ থেকে বাংলাদেশীদের এ মুহূর্তে না ফিরতে অনুরোধ করা হচ্ছে। সীমান্তে পরীক্ষা ও কোয়ারেন্টিনের বিষয়টি জোরদার করা হয়েছে। যারা দেশের বাইরে থেকে আসবে, তারা সেখানে নিজ খরচে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিন করতে পারবেন। করোনার সংক্রমণ বাড়লে সামাল দেয়ার জন্য সব জেলা হাসপাতালকে প্রস্তুত থাকতে চিঠি দেয়া হয়েছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

তবে শুধু দেশের প্রবেশপথে কড়াকড়ি আরোপ করে করোনার নতুন ধরনের সংক্রমণ ঠেকানো যাবে না বলে মনে করেন সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বাংলাদেশীরা থাকেন। তাদের মাধ্যমে বা বিদেশীদের মাধ্যমে ওমিক্রনের সংক্রমণ দেশে আসবে। এজন্য দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ এ বিশেষজ্ঞের।

অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ প্রতিরোধে তিন ধরনের কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিতে হবে বলে জানান ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি বলেন, দেশে করোনার জিনোম সিকোয়েন্সিং বাড়াতে হবে। এতে রোগী শনাক্ত হলে খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া যাবে। রোগী শনাক্ত হলে প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে রাখতে হবে। এসব লোকজন কাদের সংস্পর্শে এসেছিলেন তাদের শনাক্ত করে কোয়ারেন্টিন করতে হবে। রোগী শনাক্ত হলে দ্রুত ঘোষণা দিতে হবে।

ওমিক্রনের সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধিই অন্যতম পন্থা বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক এ পরিচালক। এ জন্য স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ তার। একই সঙ্গে টিকা প্রয়োগ আরো গতিশীল করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, টিকা কার্যক্রম প্রথমে যেভাবে শুরু হয়েছিল, তা এখন অব্যাহত নেই। বেশিসংখ্যক মানুষকে পূর্ণাঙ্গ টিকা কার্যক্রমের আওতায় আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক দেশের থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এজন্য টিকা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

তবে ওমিক্রন প্রতিরোধে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ মোকাবেলায় সরকার নির্দেশিত কার্যক্রম ঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, তার জন্য মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালককে (প্রশাসন) প্রধান করে সব পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টরকে সদস্য করে কমিটি গঠন করা হয়েছে।  এ কমিটি সপ্তাহে অন্তত দুবার বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে। একই সঙ্গে দেশের সব পর্যায়ের হাসপাতালকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।