কোরবানির ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বকেয়া টাকা পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে নাটোরের চামড়া ব্যবসায়ীদের। ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়ার টাকা বাকি রয়েছে বছরের পর বছর ধরে। প্রতি বছর কোরবানি ঈদে ধারদেনা করে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা নগদ টাকায় চামড়া কিনলেও ট্যানারি মালিকদের কাছে তা দিতে হয় বাকিতে। তাদের কাছে নাটোরের চামড়া ব্যবসায়ীদের বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা। এ টাকা পেলে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা নাটোরের চামড়া শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের।

এদিকে লবণের বাড়তি দামে চামড়া সংরক্ষণ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। খরচ বেড়ে যাওয়ায় চামড়া নষ্টের আশঙ্কা তাদের। তবে ভারতে চামড়ার দাম বেশি হওয়ার কারণে তৈরি হয়েছে পাচারের শঙ্কা। 

স্থানীয় সূত্র জানায়, বছরের মোট চাহিদার ৫০ শতাংশ চামড়া সংগ্রহ হয় কোরবানির ঈদে। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ জোগান দেয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নাটোরের চকবৈদ্যনাথের চামড়া মোকাম। ঈদকে টার্গেট করে চামড়া ক্রয়-বিক্রয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এখানকার ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা জানান, ভালো মানের চামড়ার আমদানি হয় বলেই ট্যানারি মালিকদের সবার নজর থাকে নাটোরের চামড়ার মোকামগুলোয়। গত দুই মৌসুমে চামড়ার অস্বাভাবিক নিম্নমুখী দাম হতাশ করে ব্যবসায়ীদের। তবে এবার বর্তমান চামড়ার দাম সেই হতাশা কাটিয়ে দিয়েছে ব্যবসায়ীদের। নগদ টাকায় চামড়া ক্রয়-বিক্রয় করায় আর্থিক সংকটও কেটেছে নাটোরের ব্যবসায়ীদের। যার কারণে মৌসুম শুরুর আগে থেকেই চামড়া কেনার প্রস্তুতি  নিচ্ছেন তারা। এবার চামড়ার দামের পাশাপাশি ভালো বেচাকেনার প্রত্যাশাও তাদের।

নাটোরের চকবৈদ্যনাথের চামড়া ব্যবসায়ী মঞ্জরুল আলম হিরু। কোরবানি ঈদ ঘনিয়ে আসায় তার উৎকণ্ঠা বাড়ছে। বকেয়া পাওনা টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন তিনি। কারণ বেশ কয়েকটি ট্যানারি মালিকদের কাছে তার বকেয়া পড়ে রয়েছে কোটি টাকা।

ব্যবসায়ী মঞ্জুরুল আলম হিরু বলেন, ‘আমরা চলতি বছর নগদ টাকায় চামড়া কেনাবেচা করেছি। কিন্তু পাঁচ বছরের বকেয়া টাকা আমরা পাচ্ছি না। বার বার ট্যানারিমালিকদের কাছে ধরনা দিলেও তারা টাকা দিচ্ছেন না। বকেয়া টাকা পেলে নাটোরের চামড়ার বাজার আরো চাঙ্গা হবে।’ 

তার মতো দুশ্চিন্তা আর হতাশায় দিন পার করছেন চকবৈদ্যনাথের বেশির ভাগ চামড়া ব্যবসায়ী। চলতি বছর নগদ টাকায় চামড়া বিক্রি হলেও ট্যানারি মালিকদের কাছে কয়েক বছর ধরে পড়ে রয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা। বকেয়া টাকা পেলে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা নাটোরের চামড়া ব্যবসায়ীদের।

চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, নাটোর জেলায় প্রতি মৌসুমে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে প্রয়োজন হয় অন্তত ৫০০ টন লবণ, কিন্তু বকেয়া টাকার পাশাপাশি লবণের দাম বৃদ্ধি বিপাকে ফেলেছে চামড়া ব্যবসায়ীদের। প্রতি বস্তায় মোটা লবণের দাম বেড়েছে ২০০-৩০০ টাকা। এতে বাড়বে চামড়া সংরক্ষণের খরচ।

নাটোরের চকবৈদ্যনাথের চামড়া ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম নুরু বলেন, গত কোরবানির ঈদে আমরা প্রতি বস্তা লবণ কিনেছি ৯০০-৯৫০ টাকায়। কিন্তু এবার ঈদের আগে সিন্ডিকেট করে লবণের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রতি বস্তা লবণ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকায়। এতে চামড়া লবণজাত করতে বাড়তি খরচ গুনতে হবে।

বর্তমানে পাশের দেশ ভারতে ভালো মানের গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ রুপি এবং খাসির চামড়া ২০-২৫ রুপিতে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে চামড়ার দাম বেশি হওয়ার কারণে এবার চামড়া পাচারের শঙ্কাও বেড়েছে ব্যবসায়ীদের। তবে চামড়া পাচার নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানান নাটোরের জেলা প্রশাসক আবু নাসের ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনার বাইরে কেউ চামড়া পাচার বা পাচারের চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

নাটোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দুই মৌসুম ধরে কাঁচা চামড়ার দাম নিয়ে হা-হুতাশ করতে হয় মৌসুমি ও আড়ত মালিকদের। বর্তমানে চকবৈদ্যনাথের সে দৃশ্য বদলে গেছে। নতুন মৌসুম শুরুর এক মাস আগে থেকে ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে চামড়া। তাছাড়া একসময় যারা নাটোরের মোকাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, এবার তারাও চামড়া কিনতে আসছেন। এ ধারাবাহিতা বজায় থাকলে এবার চামড়া নিয়ে হতাশা থাকবে না।’