দেশে ধর্মীয় পরিচয়ে কাউকে আর বঞ্চিত করার সুযোগ থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। হবিগঞ্জে গতকাল নির্বাচনী জনসভায় তিনি বলেছেন, ‘দেশকে আমরা ধর্মের ভিত্তিতে আর বিভক্ত করতে দেব না। কোনো ধার্মিক মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের ক্ষতি করতে পারে না। তার সাক্ষী বাংলাদেশের জনগণ। এ দেশে চারটি ধর্মের মানুষ যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছে—মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ আর খ্রিস্টান।’

সব ধর্মের মানুষ নির্ভয়ে তাদের আচার-অনুষ্ঠান করবে, কেউ বাধা দেয়ার সাহস দেখাতে পারবে না—দাবি করে জামায়াত আমির বলেন, ‘ধর্মের ভিত্তিতে কারো ওপর বাড়াবাড়ি ইসলাম পছন্দ করে না, এটা হারাম। আমাদের বিরুদ্ধে, আলেম-ওলামার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু একটি অভিযোগও কেউ প্রমাণ করার সাহস দেখাতে পারেনি।’

রাজনীতিকে যারা পেশা হিসেবে নিয়েছে তারাই দুর্নীতি আর চাঁদাবাজিতে জড়িয়েছে বলেও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় গেলে তার দলের সংসদ সদস্যরা (এমপি) শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি নেবেন না। প্রয়োজনে আমরা রিকশায় চলব। এমপিদের জন্য নামমাত্র মূল্যে যেসব ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হয়, তা-ও তারা নেবেন না। রাজনীতিকে জামায়াত পেশা নয়, বরং একটি কর্তব্য হিসেবে নিয়েছে।’

‘আমরা দেখে আসছি, এ দেশে বংশানুক্রমে রাজার ছেলে রাজা হয়। আমরা সেই ধারা পাল্টে দিতে চাই। একজন সাধারণ শ্রমিকের সন্তান, সে যদি মেধাবী হয়, তাহলে তার মেধার বিকাশ ঘটিয়ে আমরা চাই, সে হবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সেই রাজনীতির ধারা আমরা চালু করতে চাই।’

নির্বাচনী প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এখন তারা জনগণের কাছে আসে ভোটের জন্য। একেকজন দরবেশ-আউলিয়া হয়ে আসেন। তারা আসেন বসন্তের কোকিল হয়ে, বসন্তের সুবাতাস উপভোগ করতে। ইলেকশনের সময় উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে পদ্মা-মেঘনা আর কুশিয়ারা নদী ভাসিয়ে দেন। যখন ইলেকশন শেষ হয়ে যায়, তখন আর তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না।’

জামায়াতের আমির বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একে একে ৫৪টি বছর পার করেছে। একটি জাতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য যথেষ্ট সময় ছিল। ভিয়েতনাম আমাদের বহু পরে স্বাধীনতা পেয়েছে। ভিয়েতনাম এখন এ অঞ্চলের উন্নয়নের রোল মডেল। কিন্তু বাংলাদেশের কপালে কোনো ভালো উন্নয়ন করা যাচ্ছে না। এখনো বাংলাদেশে সন্ত্রাস হয়। দেশের মানুষের নিরাপত্তা নেই। চাঁদাবাজদের ভয়ে মানুষ অস্থির। দুর্নীতি আমাদের সমাজকে আগাগোড়া ছেয়ে ফেলেছে।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘যে দেশের মানুষের পরিশ্রমের হাতের ছোঁয়ায় ভিন্ন দেশের অর্থনীতির চাকা পাল্টে যায়, সে দেশের মানুষের ভাগ্য পাল্টায় না কেন। না পাল্টানোর কারণ হলো অসৎ নেতৃত্ব। আমরা অঙ্গীকার করে নির্বাচনের মাঠে এসেছি। ক্ষমতায় গেলে চাঁদাবাজের হাত বন্ধ করে দেব। ব্যবসায়ীদের রাতের ঘুম হারাম হবে না। ফুটপাতের হকারকে চোখের পানি ফেলতে হবে না। চাঁদাবাজরা সাহস পাবে না দুর্নীতি করার।’

চা-শ্রমিকদের ব্যাপারে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি চায়ের রাজধানী মৌলভীবাজারে জন্মগ্রহণ করেছি। চা-শ্রমিকদের ভুলে গেলে আমি নিজেকেই ভুলে যাব। তারা অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যুগের পর যুগ তারা একই কষ্টসাধ্য পেশায় আটকে আছেন। জামায়াত ক্ষমতায় এলে চা-বাগান আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিসমৃদ্ধ করা হবে। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা হবে, যাতে তাদের কোনো সন্তান শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়। পাশাপাশি আমি তাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করব।’

হবিগঞ্জ শহরের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মুখলিছুর রহমান। জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব যুবায়ের, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় আমির ও হবিগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী আবদুল বাসিত, একই দলের মহাসচিব ও হবিগঞ্জ-৪ আসনের প্রার্থী আহমদ আবদুল কাদির, ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও হবিগঞ্জ-১ আসনের প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া নবীন চন্দ্র সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠেও নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াত আমির শফিকুর রহমান। সেখানে তিনি বলেন, ‘সিলেটে বিমানবন্দর থাকলেও তা পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানের না হওয়ায় এর সুফল পুরোপুরি মিলছে না। বর্তমানে লন্ডন ছাড়া অন্য কোনো গন্তব্য থেকে সিলেটে সরাসরি বিমান ওঠানামা করে না। অথচ বিপুলসংখ্যক মানুষ ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আছেন। তাই জামায়াত ক্ষমতায় গেলে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তর করা হবে। তখন যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারসহ বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্য থেকে সরাসরি ফ্লাইট সিলেটে আসবে।’

জামায়াত আমির শফিকুর রহমান গতকাল বিকালে সিলেট নগরের সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায়ও বক্তব্য দেন। জেলা ও মহানগর জামায়াতের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম।