উত্তরের জনপদ গাইবান্ধার জনসংখ্যা ২৫ লাখ ৬২ হাজার ২৩২। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসাস্থল ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল। বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির পরিসর আরো বাড়াতে ২০২২ সালে নির্মাণ করা হয় ছয় তলাবিশিষ্ট একটি আধুনিক ভবন। তবে জনবল সংকটে এখনো নতুন ভবনে চিকিৎসা শুরু করতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফলে ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, পুরনো ভবনে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। অথচ নতুন ভবনে পর্যাপ্ত কেবিন, ১৫০ শয্যার ওয়ার্ড, বহির্বিভাগে রোগীদের সেবা দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, আইসিইউ, ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা, আধুনিক অপারেশন থিয়েটারসহ সব চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে। কিন্তু চালু না করায় নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। পরিপূর্ণ চিকিৎসাসেবা চালুর জন্য দরকার ৫৫ জন চিকিৎসক, ১০১ জন নার্সসহ ২৩৩ জনের জনবল। এর মধ্যে আছেন মাত্র ৪৩ জন। সামান্য জনবল দিয়ে নতুন ভবনে কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ১৯৮৪ সালে স্থাপিত হয় ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটি ২০০৫ সালে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এরপর ২০১৪ সালে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে জনবল অনুমোদন না পাওয়ায় পুরনো ভবনেই চলছে চিকিৎসাসেবা। চরাঞ্চলসহ সাত উপজেলা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন এখানে। এ অবস্থায় নতুন একটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে দি ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড আর্কিটেক্ট লিমিটেড নামক একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নতুন ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দেয় গণপূর্ত বিভাগ, যার ব্যয় ধরা হয় ৩৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২২ সালের এপ্রিলের শুরুর দিকে ছয় তলাবিশিষ্ট ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেয় গণপূর্ত বিভাগ।

তবে ভবন বুঝে পাওয়ার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও চালু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। আগের মতো পুরনো ভবনেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে রোগীদের।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ডা. মো. রফিকুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাসপাতালে পরিপূর্ণ চিকিৎসাসেবা চালুর জন্য দরকার ৫৫ চিকিৎসক, ১০১ নার্সসহ ২৩৩ জনবল। এর মধ্যে রয়েছেন মাত্র ৪৩ জন। বিষয়টি জানিয়ে বারবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েছি, তবু কোনো কাজ হচ্ছে না। একজনের পোস্টিং হয়েছিল, তিনি এখানে যোগদান করেননি। হাসপাতালের অবস্থা এমন হয়েছে, রোগীদের চিকিৎসা দেয়া মুশকিল হয়ে পড়েছে।’

সরজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের পুরনো ভবনের আন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগে রোগীদের উপচেপড়া ভিড়। পা ফেলার মতো জায়গা নেই। পুরুষ-নারী ওয়ার্ডেও রয়েছে শয্যা সংকট। হাসপাতালের মেঝেতে জায়গা নিয়েছে রোগীরা। ভেতরে জায়গা না থাকায় অনেকে চলার পথেও অবস্থান নিয়েছে।

বুকে সমস্যা নিয়ে ডাক্তার দেখাতে এসেছেন ইয়াকুব আলী। কিন্তু হাসপাতালের অবস্থা দেখে তিনি আরো বেশি অসুস্থ বোধ করছেন।

চিকিৎসকদের বিরুদ্ধেও রোগীদের রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তারা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে টাকা বাঁচাতে এসে আরো খরচ বেশি পড়ছে। এখানকার ডাক্তার সকালের দিকে একবার দেখে যান। রোগীর সমস্যা হলে ডাক্তারের প্রাইভেট চেম্বারে যাওয়া লাগে। সেখানকার ভিজিট, রিকশা ভাড়াসহ যাতায়াতের কষ্ট হিসাব করলে বাইরে রোগী দেখানোই ভালো।

পৌর শহরের গোবিন্দপুর থেকে আয়নাল হোসেন তার বৃদ্ধ মাকে নিয়ে এসেছেন হাসপাতালে। তিনি জরুরি বিভাগে ডাক্তার দেখান। তবে ডাক্তার তার মাকে রংপুরে রেফার্ড করেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে আয়নাল হোসেন বলেন, হাসপাতালের নাম রেফার্ড হাসপাতাল হওয়া উচিত। এখানে রোগী এলে বিভিন্ন জায়গায় রেফার্ড করা হয়। তাহলে এ হাসপাতাল থেকে লাভ কী?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালে নিয়মিত রোগী ভর্তি থাকে দুই শতাধিক। মেঝে আর বারান্দায় বিছানা পেতে সেবা নিতে হয় তাদের। এছাড়া বহির্বিভাগে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসে এক-দেড় হাজার রোগী। তবে হাসপাতালে বহুতল নতুন ভবন নির্মাণের তিন বছরেও চিকিৎসাসেবা চালু না হওয়া দুঃখজনক বলে জানান রোগী ও তাদের স্বজনরা।

এ প্রসঙ্গে সিভিল সার্জন ডা. মো. রফিকুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যদিও তিন বছর আগে ভবনটি বুঝে নেয়া হয়েছে। আমি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছি। নতুন ভবনের বিষয়ে আরো কিছু জানার আছে। ওখানে ওঠার জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু জনবল, ফার্নিচার এবং অপারেশন থিয়েটারের জন্য যন্ত্রপাতি নেই। এগুলোর ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।’