লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার চর সিন্দুনা।
তিস্তা ও ধরলা নদীর ভাঙনে বিচ্ছিন্ন এ চরে এক বছর আগেও বৈদ্যুতিক কোনো আলো ছিল না।
সন্ধ্যা নামলেই কুপি আর হারিকেনের আলো ছিল সেখানকার জনজীবনের নৈমিত্তিক চিত্র।
কিন্তু এখন চরবাসীর সে দিন বদলে গেছে।
সৌরবিদ্যুতের আলোয় চর সিন্দুনা সন্ধ্যা নামলেই আলোকিত হয়ে ওঠে।
চরের বাসিন্দা আব্দুল আওয়াল জানান, চরে আলো জ্বলবে এটা কখনই ভাবিনি।
সৌরবিদ্যুৎ এসে এখানকার মানুষের জীবন বদলে গেছে।
বিদ্যুৎ সুবিধা থাকায় এখন চরের মানুষ মোবাইল, টর্চলাইট, ফ্যান, টেলিভিশনসহ নানা ধরনের ইলেকট্রিক পণ্য ব্যবহার করতে পারে।
রাতের বেলায় ছোট ছোট দোকান বসছে।
রাত নামলেই বিভিন্ন বাড়িতে সৌরবিদ্যুতের বাতি জ্বলে ওঠে।
তবে চরবাসীর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এ বিদ্যুতের জন্য কোনো বিল পরিশোধ করতে হয় না।
সরকারি অর্থায়নে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেয়া এ সুবিধা বদলে দিয়েছে চরবাসীর জীবন।
তবে এ অবস্থা শুধু চর সিন্দুনা বাসিন্দাদের নয়, হাতিবান্ধা ও কালীগঞ্জ উপজেলার চর ধুবনী, ডাউয়াবাড়ি, পাটিকাপাড়া, হলদিবাড়ি, শৈলমারী, রুদ্রেশ্বর ও মহিষামুরি এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে সৌরবিদ্যুতের কল্যাণে।
বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান আধুনিকায়নে সেখানে সৌরবিদ্যুতের আলো পৌঁছে দিয়েছে নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো)। সংস্থাটির নিজস্ব অর্থায়নে স্থলভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এসব চরে সৌরবিদ্যুৎ সুবিধা দেয়া হয়েছে।
সরকারের শতভাগ বিদ্যুতায়নের অংশ হিসেবে চর, দ্বীপ ও পাহাড়ি এলাকায় সোলারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সুবিধা দেয়ার অংশ হিসেবে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জাকিউল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের শতভাগ বিদ্যুতায়নের অংশ হিসেবে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের চরাঞ্চলে সোলারের মাধ্যমে বিদ্যুতায়ন করা হয়েছে।
চর এলাকার প্রায় ১৪ হাজার গ্রাহককে বিদ্যুেসবা দেয়া হচ্ছে।
বিনা মূল্যে এ সুবিধা তারা পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, গ্রিডের মাধ্যমে চরাঞ্চলে বিদ্যুৎ টেনে নিয়ে যাওয়ার জটিলতা থাকায় বিকল্প উপায়ে সোলারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ দেয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ পেয়ে সেখানকার মানুষের জীবনমান প্রতিনিয়ত উন্নত হচ্ছে।
জানা গেছে, সৌরবিদ্যুতের সুবিধা শুধু লালমনিরহাট জেলার চরবাসীর জন্যই নয়।
নেসকোর নিজস্ব অর্থায়নে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কয়েকটি উপজেলায় ৬ হাজার গ্রাহককে সোলার হোম সিস্টেম সুবিধা দিচ্ছে বিতরণ কোম্পানিটি।
এসব এলাকার মোট ২৩টি চরাঞ্চলে ‘সোলার হোম সিস্টেম’
চালু করে চরের মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধা দেয়া হয়েছে।
নেসকোর নিজস্ব অর্থায়নে ইডকলের (কারিগরি সহায়তা দানকারী প্রতিষ্ঠান) সহযোগিতায় চরের অন্তত এক লাখ মানুষ এ সুবিধা পাচ্ছে।
নেসকো সূত্রে জানা গেছে, ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দুই বিভাগের ২৩টি চর এলাকায় সোলার হোম সিস্টেম বসানো হয়েছে।
এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার মাজহারদিয়ার, চর খিদিরপুর, খানপুর ও গোদাগাড়ী উপজেলার আশারিয়ারদাহা।
এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আলাটুলি।
অন্যদিকে লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ও হাতিবান্ধা উপজেলার ১৪টি চরে সৌরবিদ্যুৎ সুবিধা দেয়া হয়েছে।
ইডকলের সহযোগিতায় প্রত্যেকটি সোলার হোম সিস্টেমে গড়ে ২০ হাজার টাকা খরচ পড়লেও সেখানকার জনগোষ্ঠী নামমাত্র অর্থে এ সুবিধা পাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব এলাকার বিভিন্ন চরে টিনের চালে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বসানো হয়েছে।
ছোট আকারে সোলারে বৈদ্যুতিক বাতি, ফ্যান, মোবাইল চার্জসহ ছোট ছোট বিভিন্ন ইলেকট্রিক সামগ্রী ব্যবহার করা যাচ্ছে।
সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে দেশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং চরাঞ্চল আলোকিত করা হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুতের সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড’
(ইডকল) তথ্য অনুযায়ী, দেশে অন্তত ৪৩ লাখ বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার হচ্ছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে সৌরবিদ্যুতের প্রসারে ২০২১ সালে ৬০ লাখ বাসাবাড়িতে সোলার হোম সিস্টেম চালু করার কথা রয়েছে।
যদিও সোলার হোম সিস্টেমের খরচ এবং নেট মিটারিং সিস্টেম অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিল বেশি হওয়ায় গত বছরে হ্রাস পেয়েছে।
ইডকলের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, সৌরবিদ্যুতের চাহিদা গত বছর কিছুটা কমলেও এখন আবার বাড়ছে।
বাসাবাড়ির পাশাপাশি শিল্প এলাকায় রুফটফ সোলার জনপ্রিয় হচ্ছে।
দেশের যেসব শিল্প এলাকা রয়েছে, সেখানে সোলার স্থাপন করে ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।
ফলে বাসাবাড়িতে কমলেও এখন শিল্প এলাকায় জনপ্রিয় হচ্ছে।










