খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত সব উপকরণের দামের ঊর্ধ্বগতিতে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন ফেনীর বেকারি মালিকরা। উপকরণের দামের তুলনায় বেকারিতে উৎপাদিত পণ্যের দাম কম হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে বেকারি মালিকদের। ফলে ফেনীতে বেকারি শিল্পে অস্থিরতা বিরাজ করছে। টানা লোকসানের ভার সইতে না পেরে জেলায় একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বেকারি। আবার অনেকেই মালিকানা বিক্রি করে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। যারা কোনো রকম টিকে আছেন তাদেরও যায় যায় অবস্থা। অনেকে উৎপাদন সীমিত করেছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বিনাসুদে ঋণদান, খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণের মূল্য স্থিতিশীল রাখা ও ভ্যাট-ট্যাক্স মওকুফের দাবি জানিয়েছেন বেকারি খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। 

জেলা কারখানা পরিদর্শন বিভাগের তথ্য মতে, ফেনীতে ৪৫টি ক্ষুদ্র ও মাঝারি বেকারি রয়েছে। আর বিএসটিআই বলছে ফেনীতে এ শিল্পের জন্য অনুমোদিত কারখানার সংখ্যা ৫২টি। তবে বেকারিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবে ফেনী শহরসহ ছয়টি উপজেলা ও গ্রামেগঞ্জে গড়ে ওঠা বেকারির সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যাবে। গ্রামেগঞ্জে গড়ে ওঠা অনেক ক্ষুদ্র বেকারির মালিকরা জানেন না এসব খাদ্য উৎপাদনের জন্য অনুমোদন নিতে হয়। তবে বাজার স্থিতিশীল না হওয়ায় এখন ছোট-বড় সব বেকারিই বন্ধের উপক্রম হয়েছে। 

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে এক বছর আগেও প্রতি কেজি খোলা ময়দার দাম ছিল সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা। এখন সে ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৭২ টাকায়। এ হিসাব মতে, বেকারি পণ্যের প্রধান উপকরণ ময়দার দাম বেড়েছে অন্তত ১০৬ শতাংশ। শুধু ময়দা নয়, দাম বেড়েছে চিনি, ভোজ্যতেল, ডালডা, ডিমসহ প্রায় সব বেকারি উপকরণের। এখানেই শেষ নয়, জানুয়ারি থেকে সরকার ক্ষুদ্র শিল্পে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে ১৭৮ শতাংশ। আর মাঝারি শিল্পে বাড়িয়েছে ১৫৫ শতাংশ। এর বাইরে সরকার চলতি বছরেই তিন দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে ১৫ শতাংশ।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, দুই বছর আগে প্রতি লিটার পামঅয়েলের দাম ছিল ৬৫-৭০ টাকা। দাম ওঠানামার পর যা এখন ১০৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর প্রতি কেজি চিনি ছিলো ৭৮-৮০ টাকা। সেই চিনি এখন বিক্রি হচ্ছে ১৩০-১৪০ টাকায়।   

বেকারি মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেকারিতে তৈরি বেশির ভাগ পণ্যে ডিম ব্যবহার করতে হয়। সাধারণত ফার্মের মুরগির বাদামি ডিমের দাম বেড়ে প্রতি ডজন ১৪০-১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিস্কুটের স্বাদ ও ঘ্রাণ যোগ করতে বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করতে হয়। ডলারের দাম বাড়ার কারণে বিদেশী এসব ফ্লেভারের উপকরণের দাম বেড়ে গেছে। উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় প্রতিটি কাঁচামালের দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও বেকারিতে উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের দাম সেভাবে বাড়ানো যাচ্ছে না। কারণ, বেকারিতে উৎপাদিত পণ্য মানুষের আবশ্যকীয় কোনো পণ্য নয়। দাম বাড়লে এসব পণ্য মানুষ খাওয়া থেকে বিরত থাকে। তখন লোকসান আরো বেড়ে যায়। 

ফেনীতে বেকারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের কোনো সংগঠন না থাকায় দায়িত্বশীল কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলেন, ফেনীতে টানা লোকসানের ভার সইতে না পেরে এরই মধ্যে নিবন্ধিত ও স্বনামধন্য কয়েকটি বেকারি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফেনী শহরের শান্তি কোম্পানি সড়কের একরামুল হকের মালিকানাধীন গ্র্যান্ড ফুড, ফেনী-নোয়াখালী আঞ্চলিক সড়কের তেমুহনীতে নুরুল হকের মালিকানাধীন চিটাগাং বেকারি, শহরের ছাড়িপুর এলাকার পোড়া মসজিদের দক্ষিণ পাশে চৌ-রাস্তার মোড়সংলগ্ন আশরাব মিয়ার গ্রামীণ ফুড, পুলিশ কোয়ার্টার এলাকার আমবালা বেকারি। এছাড়া শহরের বাইরে গ্রামেগঞ্জে ও উপজেলা শহরে গড়ে ওঠা অন্তত শতাধিক বেকারির উৎপাদন বন্ধ করে মালিক-শ্রমিকরা পেশা পাল্টাতে বাধ্য হয়েছেন। 

মিজানুর রহমান নামের এক বেকারি মালিক বলেন, ‘২০১০ সাল থেকে আমি বেকারি চালাই। সবসময় দেখতাম একসময় একটি কাঁচামালের দাম বাড়ত। কিন্তু করোনা-পরবর্তী দেখছি একসঙ্গে সব উপকরণের দাম বাড়ানো হচ্ছে। এ দাম আর কখনো স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসছে না। বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে এশিয়ার অন্যান্য দেশে ময়দা-চিনি ও তেলের দাম যে হারে বেড়েছে, বাংলাদেশে তা সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ফলে উপকরণের সঙ্গে উৎপাদিত পণ্যের বাজার দামের সমন্বয় করতে না পেরে লোকসানের ভার নিয়ে ফেনীতে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আবার কেউ কেউ মালিকানা বিক্রি করে দিচ্ছেন। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সমন্বয় করতে না পেয়ে ফেনীর ঐতিহ্যবাহী মধুমেলা ফুড অ্যান্ড বেকারি সব পরিবেশককে পণ্য দেয়া বন্ধ করে চুক্তি বাতিল করেছে। এখন শুধু নিজস্ব কয়েকটি শো-রুমের মধ্যেই ব্যবসা সীমাবদ্ধ করে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।’

আবুল কাশেম নামের এক বেকারি ব্যবসায়ী বলেন, ‘বেকারিতে উৎপাদন কীভাবে নিয়মিত রাখব তা জানি না। যে পরিমাণ উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় টানা লোকসান দিয়ে যাচ্ছেন বেকারি মালিকরা। মানব খাদ্য উৎপাদনকারী এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে দ্রব্যমূল্যের বাজার স্থিতিশীল করে পণ্যের দাম কমাতে হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত বেকারি মালিকদের আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে। সরকার এ শিল্পকে রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নিতে না পারলে অচিরেই এ খাত ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’ 

এ বিষয়ে ফেনী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আইনুল কবির শামীম বলেন, ‘করোনাকালে বেকারি শিল্পে প্রথম ধাক্কা লাগে। ওই ধাক্কা সামলে নেয়ার আগেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে বাজার ব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এ অস্থিরতায় লোকসান গুনতে গুনতে ফেনীর অনেক বেকারি এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। তাই বেকারি শিল্পকে রক্ষায় প্রণোদনা ঋণ অথবা সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণদান ও বাজারে দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীল রাখতে হবে।’