দেশে স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় আদিবাসীরা এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বছরজুড়ে বিভিন্ন সভা সেমিনারে এসব জনগোষ্ঠী নিয়ে কমবেশি আলোচনাও হয়। কিন্তু জাতীয় বাজেটে তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করার মত বড় কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। কিন্তু তাদের প্রতি নজর না দিলে দেশের সার্বিক উন্নয়নে কখনো ভারসাম্য আসবে না। আজ রোববার ‘বাংলাদেশের পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ ও ব্যয়ের অবস্থা’ শীর্ষক একটি সমীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। সমীক্ষাটি প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবুল বারাকাত। তার নেতৃত্বে আদিবাসীদের নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
আবুল বারাকাত বলেন, ‘২০২০-২১ অর্থবছরে ৪৩ দশমিক ২১ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩২ দশমিক ৬১ শতাংশ কম বরাদ্দ পেয়েছে এ জনগোষ্ঠী। সাম্প্রতিক জনশুমারি অনুযায়ী, মোট আদিবাসী মানুষের মধ্যে সমতলের আদিবাসী ৪০ শতাংশ। কিন্তু বিগত দুই অর্থবছরে আদিবাসীদের মোট বরাদ্দের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ (২০২০-২১) এবং ৩১ দশমিক ২ শতাংশ (২০২১-২২) পেয়েছেন সমতলে বসবাসকারী এসব আদিবাসীরা। পাহাড় ও সমতল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য বাজেট বরাদ্দ বিগত দুই অর্থবছরে ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ অর্থাৎ ১০৮ কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে। ২০২০-২১ এ বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা এবং ২০২১-২২ এ তা কমিয়ে আনা হয়েছে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়। বর্তমান মূল্যস্ফীতি অনুযায়ী এই বাজেট কমার পরিমাণ ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ দুই অর্থবছরের তুলনায় সমতল আদিবাসীদের বাজেট বরাদ্দ ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও পাহাড়ের আদিবাসীদের ক্ষেত্রে তা ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ হ্রাস করা হয়েছে। এ বরাদ্দের ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা তুলনামূলক বেশি বঞ্চিত।’
সমীক্ষায় বলা হয়, আদিবাসীদের জন্য কিছু জরুরি খাতও বাজেটে দেখা যায় না। সমতলের আদিবাসীদের খাদ্য সহায়তা দেয়া, দখলকৃত ভূমি উদ্ধারের জন্য আইনি ও অন্যান্য সহায়তা, মাতৃভাষায় শিক্ষা, ন্যায্য স্বাস্থ্য সুবিধা প্রাপ্তি, জীবিকানির্বাহের জন্য প্রশিক্ষণ, ঋণদানসহ বিভিন্ন অনুদান এবং আদিবাসী সংস্কৃতি ও জ্ঞানকে বর্ধিত করার ক্ষেত্রে অনেক ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। এতে ‘ক্রিটিক্যাল মিসিং’ হিসেবে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কাউন্সিল ভূমি কমিশনের জন্য যথাযথ বাজেট, পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা, জীব-বৈচিত্র্য এবং পরিবেশগত সুরক্ষা ইস্যুটি না থাকাকে’ উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের দেখা যায়, আদিবাসীদের জন্য বাজেট অপর্যাপ্ত হলেও অনেক প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত বরাদ্দ পুরোটা খরচ করা হয় না। ফলে কতটা কীভাবে তাদের উন্নয়নের জন্য খরচ করা হচ্ছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ তার সঠিক তথ্যও জানে না। আদিবাসী নারী সবচেয়ে অবহেলিত ও মানবাধিকার বঞ্চিত হলেও মোট জেন্ডার বাজেটের মাত্র এক শতাংশ রাখা হয়েছে আদিবাসী নারীর ক্ষমতায়নের জন্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন আন্দোলনের কারণে পার্বত্য আদিবাসীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নজরে ছিল। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ আমল থেকেই সমতলের আদিবাসীদেরও ভূমিকা ছিল। কিন্তু তারা সবসময় আড়ালেই রয়ে গেছে। গণমাধ্যমেও তাদের বিষয় খুব একটা আসে না। ফলে মানুষ না জানার কারণে তারা আরও সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছে।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘কাজ করতে গেলে অনেক কিছু আমাদের চোখে লাগে না। কিন্তু সরকার উন্নয়নে সবসময় সবার অংশীদারিত্বে বিশ্বাস করে। দেশের একটা জনগোষ্ঠী পিছিয়ে থাকলে কখনও দেশের প্রকৃত উন্নয়ন হবে না। এসময় এমন গবেষণা কমই হয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, যারা এটি করেছে তাদের সাধুবাদ জানাই। পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে আমরা এসব বিষয় অবশ্যই বিবেচনায় রাখব।’










