হামে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব কম (৫ থেকে ৮ শতাংশ), কিন্তু নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর হার ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, যা ডায়রিয়ার তুলনায় অনেক বেশি। তবে আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনলে নিউমোনিয়া সম্পর্কিত জটিলতায় মৃত্যুর হার অনেকাংশে কমানো সম্ভব। আজ শুক্রবার দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসকরা এসব বলেন। সংবাদ সম্মেলনটির আয়োজন করে বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন এবং চেস্ট এন্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর ডা. আসিফ মুজতাবা মাহমুদ (মহাসচিব, বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন), অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা, অধ্যাপক রুহুল আমিন (পেডিয়াট্রিক পালমোনোলজিস্ট ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন), অধ্যাপক ডা. আনোয়ারুল আনাম কিবরিয়া (ভাইস প্রেসিডেন্ট, চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন), অধ্যাপক ডা. কাজী সাইফুদ্দিন বেন্নুর (জয়েন্ট সেক্রেটারি, বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন) এবং অধ্যাপক ডা. গোলাম সরওয়ার লিয়াকত হোসেন ভুঁইয়া (সেক্রেটারি জেনারেল, চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন)। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বক্ষব্যাধী বিশেষজ্ঞ ডা. জিয়াউল হক।
সংবাদ সম্মেলনের মূল বক্তব্যে বলা হয়, বর্তমানে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব চলছে। হাম একটি ভাইরাসবাহিত রোগ। আমরা অনেকেই আমাদের জীবদ্দশায় হামে আক্রান্ত হয়েছি। কিন্তু সফল টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে হামে আক্রান্তের হার অনেকখানি হ্রাস করা সম্ভব হয়েছিল। দুঃখজনকভাবে গত দুই বছরে এ টিকাদান কর্মসূচিতে বাধা পড়ায় এবছর মার্চ মাস থেকে গতকাল ১৪ মে পর্যন্ত ৫৪ হাজার ৪১৯ শিশুর হাম এবং হাম সদৃশ উপসর্গ দেখা দিয়েছে। দুঃখজনক ভাবে এর মধ্যে ৭০ জন হামে এবং ৩৬৯ জন হাম সদৃশ উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।
এ সময় আরো বলা হয়, হামজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ শ্বাসতন্ত্র বিকল হয়ে পড়া। সে কারণে আমরা দেশের বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন করার উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা সরকারকেও বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে এ ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে উপদেশ দিয়েছি। যে চারটি মূল বিষয়ের ওপর আমরা গুরুত্ব দিয়েছি সেগুলো হলো- অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হামের টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখা, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, উপজেলা, জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো ফিভার কর্নার স্থাপনের মাধ্যমে হামপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা, হামের চিকিৎসায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত একটি চিকিৎসা নির্দেশিকা প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে পৌঁছে দেয়া এবং বক্ষব্যাধী বিষয়ক চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন এবং চেস্ট অ্যান্ড হাট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সক্রিয় সহায়তায় দেশব্যাপী হামের উপসর্গ শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে সবার মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। অপতথ্য সম্পর্কে সজাগ থাকার জন্য আমরা আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীকে অনুরোধ জানাচ্ছি। মনে রাখতে হবে, হাম একটি অতিমাত্রায় সংক্রমনযোগ্য রোগ, যা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে শতকরা ৯৯ শতাংশ রোগী সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে ওঠে।
আরো বলা হয়, শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার জটিলতা অনেক কারণে তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে যাদের ম্যালনিউট্রিশন বা অন্যান্য রিস্ক ফ্যাক্টর আছে। নিউমোনিয়া শুধু ফুসফুসকে প্রভাবিত করে না, কখনো কখনো এটি মস্তিষ্ক এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকেও আক্রমণ করতে পারে। অনেক শিশু নাড়িতে সংক্রমণ, ডায়রিয়া, বমি বা সিভিয়ার ডিহাইড্রেশন নিয়ে হাসপাতালে আসে, যা জটিলতাকে আরো বাড়িয়ে দেয়।
নিউমোনিয়ার চিকিৎসা দ্রুত করানোর ওপর জোর দিয়ে বলা হয়, নিউমোনিয়ার দুটি প্রধান বিষয় জরুরি— সঠিক সময়ে এন্টিবায়োটিক দেয়া এবং শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন নিশ্চিত করা। তবে দেশে ঢিলে চিকিৎসা এবং এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্টেন্সের কারণে কিছু শিশু রোগের বিস্তার ও মারাত্মক জটিলতার মুখোমুখি হয়। আমাদের মূল বার্তা হলো হাম আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে আর্লি ট্রিটমেন্টের আওতায় আনা, যাতে এন্টিবায়োটিক, অক্সিজেন ও অন্যান্য সহায়ক চিকিৎসা সময় মতো দেয়া যায়।
লিটারেচারে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব কম (৫ থেকে ৮ শতাংশ)। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, যা ডায়রিয়ার তুলনায় অনেক বেশি। রোগীদের রেসপিরেটরি সমস্যা আছে, যেমন শ্বাসকষ্ট, স্যাচুরেশন কমে যাওয়া বা জ্বর—তাদের দ্রুত শনাক্ত (আইডেন্টিফাই) করা এবং আর্লি ট্রিটমেন্টের আওতায় আনা। এ পদ্ধতির ফলে নিউমোনিয়া সম্পর্কিত জটিলতায় মৃত্যুর হার অনেকাংশে কমানো সম্ভব।










