খাল হলো মানবসৃষ্ট উন্মুক্ত জলপ্রবাহ। কৃষিকাজের প্রয়োজনে পানি সংরক্ষণ বা পানিপ্রবাহের জন্যই মূলত খাল খনন করা হয়, যা শুষ্ক মৌসুমে সেচের চাহিদা মেটায়। ফসল উৎপাদনে সহায়ক হলেও ঝিনাইদহের বেশির ভাগ খাল দখল হয়ে গেছে। এসব খালপাড়ে নির্মাণ করা হয়েছে স্থাপনা। সরকারি এসব খাল দখল হয়ে যাওয়ায় সেচ ও পানি নিষ্কাশনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। খালগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ায় পানিপ্রবাহ ও নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেচ সুবিধাও পাচ্ছেন না কৃষক। এতে ব্যাহত হচ্ছে ফসল উৎপাদন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য বলছে, জেলায় ২১৪টি সেচ খাল ও ১৪২টি পানি নিষ্কাশন খাল রয়েছে। এসব খালের মোট দৈর্ঘ্য ৯৬৮ কিলোমিটার। প্রতিটি খালের দুই পাশে ৫০-১২০ ফুট সরকারি জমি রয়েছে। তবে বাস্তবে অন্তত ৯০ শতাংশ খালের পাড় বিভিন্নভাবে দখল হয়ে গেছে।
শৈলকুপা উপজেলার নিত্যানন্দনপুর বাঁওড়ের সঙ্গে সংযুক্ত ভবানীপুর থেকে সদরের বাকড়ি বাজারসংলগ্ন নবগঙ্গা নদীতে মিশেছে একটি খাল। এটি বিভিন্ন এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহৃত হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাঁওড়ে মাছ চাষের জন্য নিত্যানন্দনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক মফিজুল ইসলামসহ অন্যরা তিন বছর আগে খালে একটি বাঁধ নির্মাণ করেন। এতে পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। বাকড়ি বাজার এলাকায় নবগঙ্গা নদীর পাশে ২০ বছর আগে শাহেদ জোয়ারদার নামে এক ব্যক্তি খালের জমি দখল করে দুটি বড় পুকুর কাটেন। তার মৃত্যুর পর পুকুর দুটি দখল করছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও হরিশংকরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান খোন্দকার ফারুকুজ্জামান ফরিদ। অবশ্য ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে তিনি পলাতক।
ভবানীপুর গ্রামের কৃষক অমরেশ কুমার রায় বলেন, ‘মাছ চাষের সুবিধার্থে বাঁওড়ের ধারে আওয়ামী লীগের নেতারা বাঁধ দিয়েছেন। ফলে ঠিকমতো বাঁওড় ও মাঠের পানি নিষ্কাশন হয় না। জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।’
সরজমিনে হরিণাকুণ্ডু উপজেলার কুলবাড়িয়া বাজার ও আশপাশের এলাকায় গিয়ে খাল দখলের চিত্র পাওয়া গেছে। বাজার ও আশপাশের এলাকায় সেচ খালের দুই পাশে গড়ে উঠেছে শতাধিক স্থাপনা।
কুলবাড়িয়া বাজারের দোকানি সাজেদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘খালপাড়ের দোকানগুলো অনেক বছর আগে নির্মাণ করা। দখলদারদের অধিকাংশই দোকান ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। অনেকে নিজে ব্যবসা করেন না।’
উপজেলার শাঁখারীদহ বাজার এলাকায় পানি নিষ্কাশন খালের দুই ধারে ও ভেতরে সারিবদ্ধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে পাকা-আধাপাকা অসংখ্য স্থাপনা। প্রায় ২৫ বছরের বেশি সময় এভাবে বাজারের আশপাশে চলছে দখলদারত্ব। স্থানীয় লোকজন বলছেন, একজনের দেখাদেখি একে একে এমন স্থাপনা নির্মাণ করেছেন এলাকার প্রভাবশালী ও খালপাড়ের মানুষ।
শাঁখারীদহ বাজারে খালের জমিতে নজরুল ইসলামের দোকান রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাজারে জায়গা কম, তাই খালের জমিতে দোকান নির্মাণ করেছি। পাউবোর মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করে রেখেছি, যদি কখনো ইজারা পাওয়া যায়।’
২০২২ সালে হরিণাকুণ্ডু উপজেলার সাত ব্রিজ, শৈলকুপার কাতলাগাড়ী বাজার এবং ২০২১ সালে কোটচাঁদপুর এলাকার কয়েকটি খালপাড়ে থাকা শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে পাউবো। এর পরও এসব খালের পাড়ে প্রায় দুই হাজারের বেশি স্থাপনা রয়েছে। পাউবোর তথ্য বলছে, জেলার বিভিন্ন স্থানে খালের পাশে ৭ হাজার ৫০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা আছে। এর মধ্যে দুই হাজার একর জমিই দখল হয়ে গেছে।
সদর উপজেলার পরানপুর গ্রামের বাসিন্দা সাইফুল উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘সরকারি খালের জমিতে কেউ পুকুর কাটছেন, কেউ স্থাপনা নির্মাণ করছেন। এগুলো উচ্ছেদ করা জরুরি। স্থাপনা ও বাঁধের কারণে পানি নিষ্কাশন হয় না, সেচ সুবিধাও পাওয়া যায় না।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় খাল দখলের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ঝিনাইদহ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য আমিনুর রহমান টুকু। তিনি বলেন, ‘দখলের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষসহ সবাইকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এর সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উচ্ছেদ অভিযানও অব্যাহত রাখতে হবে।’
সার্বিক বিষয়ে ঝিনাইদহ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লোকবল সংকটসহ বিভিন্ন কারণে উচ্ছেদ অভিযানে কিছুটা সমস্যা হয়। বেশকিছু এলাকায় দখলদারের তালিকা করা হয়েছে। অচিরেই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।’










