বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় সরকারি হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা অপ্রতুল। এখানে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে সরকারি হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা চারটিরও কম। অথচ দেশের অধিকাংশ রোগীর, বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের জন্য সবচেয়ে ভরসার স্থান বা সবচেয়ে সুগম চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র হলো এসব হাসপাতাল। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে যে পরিমাণ রোগী ভর্তি হন, তা শয্যা সংখ্যার তুলনায় ৫৩ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই এ বাড়তি রোগীর স্থান হয় মেঝেতে। তবে দেশের মাধ্যমিক ও টারশিয়ারি পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় এ অবস্থা থাকলেও ভিন্ন চিত্র দেখা গিয়েছে সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় প্রতিষ্ঠিত সর্বোচ্চ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে। রাজধানীর মহাখালীর এ হাসপাতালটিতে রোগী ভর্তির হার ৪০ শতাংশের নিচে। মূলত নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা ও সংকটের কারণেই রোগী পায় না এ হাসপাতাল।

সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি হাসপাতাল রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১০০ শয্যার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল সর্ববৃহৎ ও বিশেষায়িত চিকিৎসা দেয়। এছাড়া বিভাগীয় পর্যায়ে যক্ষ্মা হাসপাতালে সংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসা দেয়া হয়। তবে ঢাকা ছাড়া কোথাও পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল নেই। এ হাসপাতালটিতে কুকুর, বানর, বিড়াল, শেয়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর কামড়ে আহত রোগী, জন্ডিস, ধনুষ্টংকার, জলবসন্ত, ডিপথেরিয়া, এনফেলোকাইটিস, ভাইরাল হেপাটাইটিস, এইচআইভি পজিটিভ, নিউমোনিয়া, টাইফয়েড, হাম ও এআরভি ভ্যাকসিনের প্রতিক্রিয়াজনিত রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন।

যদিও অতি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত এ হাসপাতালে নেই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), অপারেশন থিয়েটার ও রোগ নির্ণয়ের পরিপূর্ণ সুবিধা। সাধারণ এক্স-রে মেশিনও দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। ৩০০ কিলোভোল্টের একটি জেনারেটর কেনা হলেও জ্বালানির বরাদ্দ না থাকায় তা চালু করা যায়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ হাসপাতাল ও পার্শ্ববর্তী হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা জানান, পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী নন। রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় সুবিধাও নেই। একই সঙ্গে রয়েছে চিকিৎসকের স্বল্পতা।

সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, প্রায় দেড় একর জায়গাজুড়ে প্রাচীর ঘেরা সাততলা ভবনের হাসপাতালে দেয়া হয় বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা, চলে প্রশাসনিক কার্যক্রম। নিচতলার জরুরি ও বহির্বিভাগের চিকিৎসা কার্যক্রমে ভিড় চোখে পড়ার মতো। তবে সে তুলনায় ভর্তিপ্রত্যাশী রোগীর সংখ্যা একেবারেই কম। জরুরি বিভাগ থেকেও যাদের ভর্তির জন্য বলা হয়, তারাও এ হাসপাতালে ভর্তিতে অনিচ্ছুক। দ্বিতীয় থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত ঘুরে বিভিন্ন রোগের ওয়ার্ডের প্রায় ৭০ ভাগ শয্যা ফাঁকা পাওয়া যায়। পঞ্চম তলায় আইসিইউ ও অপারেশন থিয়েটার স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। আর সপ্তম তলায় রয়েছে হাসপাতালে নিয়োজিত আনসার সদস্যদের আবাসিক ব্যবস্থা।

হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছর একদিনে সর্বোচ্চ ৪২ জন রোগী ভর্তি হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। গত রোববার হাসপাতালে ধনুষ্টংকার ওয়ার্ডে আটজন, এইচআইভি ওয়ার্ডে সাতজন, ডেঙ্গু রোগী ১১ জন, কুকুরের কামড়ে আহত একজনসহ মোট ৩৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। তবে ডিপথেরিয়া, ভাইরাল হেপাটাইটিস, জলবসন্ত, হাম, মামপস, পোলিও, এআরডি ওয়ার্ডে কোনো রোগী ভর্তি ছিলেন না।

এইচআইভি পজিটিভ ত্রিশোর্ধ্ব ছেলেকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য গত সপ্তাহে হাসপাতালে এসেছেন কুষ্টিয়ার সত্তরোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। তিন মাস আগে তার ছেলে এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হন। এরপর চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয় এ হাসপাতালে। তবে হাসপাতালে চিকিৎসায় সন্তুষ্ট নন তারা। হাসপাতালে ভর্তি অন্তত পাঁচজন রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ না থাকলেও প্রয়োজনীয় সেবা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া যায় না। রোগীকে সেবা দেয়ার চেয়ে নার্স থেকে শুরু করে অন্য দায়িত্বরতরা অলস সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী হাসপাতালে চিকিৎসকসহ কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং অন্যান্য লোকবল প্রশাসনে ৯৪ জন, প্যাথলজি ল্যাবে সাতজন, নার্সিং বিভাগে ৮৩ জন, আন্তঃবিভাগে ২৭ জন, জরুরি ও বহির্বিভাগে ১৫ জনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের লোকবল প্রয়োজন। তবে বর্তমানে এখানে রয়েছেন ৬১ জন নার্স, তিনজন শিশু, প্যাথলজি ও মেডিসিন কনসালট্যান্টসহ আন্তঃবিভাগে সাতজন চিকিৎসক ও বহির্বিভাগে আটজন মেডিকেল অফিসার। এ সংখ্যা অপ্রতুল। যে কারণে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেয়া যায় না।

স্বাধীনতার পর ৩৫ একর জমি নিয়ে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন বেদখলে ৩০ একর জমি। হাসপাতাল ঘিরে প্রাচীর ঘেঁষে সারি সারি বস্তিঘর। হাসপাতালের জমিতে গড়ে উঠেছে কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন ধরনের দোকান। এমনকি অবৈধ দখলে গড়ে ওঠা ঘর ও দোকানপাটের বিদ্যুতের মাসিক বিলও আসে হাসপাতালের মিটারে। চলতি মাসেই ৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকা বিল এসেছে। অথচ হাসপাতালটিতে ভারী কোনো যন্ত্রপাতি চলে না, নেই রোগীর আধিক্য।

জানা গিয়েছে, হাসপাতালে প্রয়োজন অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী না থাকার কারণে লিফটম্যান আবুল কাশেম শান্তি প্রশাসনিক কার্যক্রমে কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করেন। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে চাকরি করছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, এ দীর্ঘ সময়ে অবৈধ কার্যক্রমে হাত পাকিয়েছেন তিনি। হাসপাতালে বিদ্যুৎ বিলের নয়ছয় ও পাশের বস্তিতে ঘর ভাড়া দেয়া চক্রের সঙ্গেও তিনি জড়িত। এসব কাজে আরো জড়িত রয়েছেন ইলেকট্রিশিয়ান সালাহউদ্দিন ও সাবেক হেড ক্লার্ক আহমদ।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বিকাল বেলায় হাসপাতাল প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে পার্ক। রাতে হয় মাদকের অভয়ারণ্য। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের পার্শ্ববর্তী এ হাসপাতালের মূল প্রাচীর ঘিরে রয়েছে ময়লার স্তূপ। হাসপাতাল ভবনের প্রতিটি ফ্লোরই স্যাঁতসেঁতে। ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি চোখে পড়ার মতো। ভারি বর্ষণে পানিতে প্লাবিত হয় হাসপাতাল এলাকা।

এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের সংকট রয়েছে, তবে এর মধ্যে সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি। এটা ঠিক যে এখানে রোগী ভর্তির সংখ্যা কম। তবে চিকিৎসকেরও সংকট রয়েছে। আরো অন্তত ১৫ জন চিকিৎসক প্রয়োজন, সিনিয়র কনসালট্যান্ট প্রয়োজন। জ্বালানি বরাদ্দের অভাবে জেনারেটর চলছে না। বিদ্যুৎ বিল কেন বেশি আসছে তা পর্যবেক্ষণের জন্য আমরা কমিটি করে দিয়েছি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ) ও মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকার হাসপাতালটিতে ব্যবস্থাপনার কারণে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। তবে রোগীদের যে সেবা পাওয়া উচিত তারা সেসব সেবা পায়। হাসপাতালের বেশির ভাগ জায়গা এখনো অবৈধ দখলদারদের দখলে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের পক্ষে জমি উদ্ধার করা সম্ভব নয়। জমি উদ্ধারের বিষয়ে উচ্চ মহলের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

তিনি জানান, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। এক্ষেত্রে আক্রান্ত রোগী সারা বছর তেমন একটা পাওয়া যায় না বলে রোগীর চাপ কম। ওইসব রোগ কমে যাওয়ায় আক্রান্ত রোগীরা কম আসছেন। ২০-২৫ বছর আগেও অনেক রোগী ছিল। এখানে এইচআইভি এইডসের কিছু রোগী আসছেন। তবে অন্যান্য যে সংকট, অব্যবস্থাপনা রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।