বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মার্স রোভার টিম বিশেষ স্থান অর্জন করেছে। ২০২২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মার্স সোসাইটি কর্তৃক আয়োজিত ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে আসছে দলটি, যা বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রোবোটিকস ও মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা। চার বছর ধরে এশিয়ার সেরা রোভার দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করে তারা। ২০২৫ সালে বিশ্বে ষষ্ঠ স্থান, এছাড়া ‘বেস্ট সায়েন্স টিম’ পুরস্কার লাভ করেছে। ইউআইইউ মার্স রোভার টিম চার বছর ধরে এশিয়ার সেরা রোভার দল হিসেবে নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছে। ২০২২ সালে ১৩তম, ২০২৩ সালে নবম, ২০২৪ সালে পঞ্চম এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে ষষ্ঠ স্থান অর্জন করে।
রোভার এক্সিওস
এ বছর প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া রোভারটির নাম ছিল এক্সিওস (AXIOS)। এটি একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন, স্বয়ংক্রিয় ও অভিযোজ্য রোভার, যা বিভিন্ন ভূপ্রকৃতি, বাধা ও জটিল মিশনের মাধ্যমে কার্যকরভাবে চলাচল ও কাজ করতে পারে। রোভারটি মাটি ও পরিবেশ বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচল, নমুনা সংগ্রহ, রোবোটিক আর্ম দিয়ে নির্দিষ্ট টাস্ক সম্পন্ন করাসহ বহু অত্যাধুনিক কাজ করতে পারে। এতে ব্যবহৃত হয়েছে উন্নত সেন্সর সিস্টেম, জিপিএস ও সেন্সর ফিউশননির্ভর নেভিগেশন, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রোবোটিক আর্ম, শক্তিশালী আরএফ যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং নিজস্বভাবে নির্মিত সাসপেনশন সিস্টেম। এক্সিওস এ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের অনেক দিক রয়েছে। এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মডিউল সায়েন্স মিশনে নমুনা বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা রাখে। রোভারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাস্তা খুঁজে বের করতে পারে এবং ইনফ্রারেড ও মলিকিউলার সেন্সর ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান শনাক্ত করতে পারে।

এক্সিওস রোভার দল
এ ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনে ছিলেন ইউআইইউর একদল মেধাবী শিক্ষার্থী। দলের নেতৃত্বে ছিলেন মো. মোসফিকুর রহমান। কো-টিম লিডার হিসেবে কাজ করেছেন গাজী তাওসিফ তুরাবি। সায়েন্স টিমের নেতৃত্বে সাইফ আল সাদ, মেকানিক্যাল টিমের নেতৃত্বে মো. সিয়াম বিন রশীদ, অটোনোমাস টিম পরিচালনা করেছেন আহমেদ জেবাইল সৌখিন এবং কমিউনিকেশন ও এরিয়াল টিম পরিচালনা করেছেন ইফতা ফয়সাল। দলের অন্য সদস্যরা হলেন সায়মা আক্তার, নাজমুল হাসান আথিন, দিগন্ত কর্মকার ও মুনতাকিম আলী রাশফি। দলের সদস্যরা জানান, রোভারটি তৈরিতে প্রথমে টানা পাঁচ মাস চলে উন্নয়নকাজ, আরো দুই মাস সময় লাগে টেস্টিং ও চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে। পুরো প্রকল্পটি পরিচালিত হয়েছে ইউআইইউর সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রোবোটিকসের অধীনে।
টিম লিডার মোসফিকুর রহমান বলেন, ‘সাফল্যের পেছনে ছিল দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম, মিশনভিত্তিক প্রস্তুতি এবং ধাপে ধাপে টার্গেট পূরণের জন্য নিরলস প্রচেষ্টা। প্রতিটি সাব-টিমের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও সমন্বয় ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।’
সায়েন্স টিম লিডার সাইফ আল সাদ বলেন, ‘১০০-এর মধ্যে ১০০ স্কোর শুধু সংখ্যা নয়, এটা আমাদের পরিকল্পনা, গবেষণা ও দৃঢ়তার প্রতিফলন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ছিল এ অর্জনের পেছনে মূল চালিকাশক্তি।’
দলের পেছনে যারা
দলের মেন্টর সিএসই বিভাগের প্রভাষক আবিদ হোসাইন বলেন, ‘রোভার দলটি আমার কাছে শুধু একটি প্রযুক্তি প্রকল্প নয় বরং এটি একটি উদ্ভাবনী প্লাটফর্ম যেখানে ছাত্ররা বাস্তব দুনিয়ার সমস্যার সমাধানে নিজেদের তৈরি করে। আমি দলটির মধ্যে লক্ষ করেছি এক অসাধারণ পরিশ্রম, নেতৃত্ব ও গবেষণার নেশা।’
সিএসই অনুষদের ডিন ও দলের প্রধান উপদেষ্টা ড. হাসান সারওয়ার বলেন, ‘ইউআইইউ মার্স রোভার টিম আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা। এখানে শিক্ষার্থীরা গবেষণা, প্রকৌশল, ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্ব—এ চারটি স্তরে একসঙ্গে কাজ করে। প্রতিটি দলের সদস্যের ভেতরে আমি দেখেছি আত্মবিশ্বাস, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও একাগ্রতা।’










