বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তবে একসময় শুধু সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেই যুক্ত হতে দেখা যেত। ২০১৫ সালে প্রথমবারের মত ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনে নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তারা। সর্বশেষ ২০২৪ এর কোটা সংস্কার আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এ শিক্ষার্থীরা। বিশেষত ১৭ জুলাইয়ের পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কেন্দ্র করেই আন্দোলন সামনে এগিয়েছে। বণিক বার্তার কাছে নিজেদের আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী।
আমরা একটি বার্তা দিয়েছি যে শিক্ষার্থীদের রক্ত ঝরিয়ে কেউ ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না
১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ নির্মমভাবে হামলা চালায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সেসব রক্তাক্ত ছবি দেখে আমাদের মনে হয়েছিল আমাদের অবশ্যই তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। এর পরই ১৬ জুলাই থেকে আমরা সম্মিলিতভাবে আন্দোলনে নামি। প্রথম দুইদিন কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও ১৮ জুলাই থেকে আমাদের ওপর নির্বিচারে রাবার বুলেট, ছররা গুলি, টিয়ার গ্যাসের শেল এবং গুলি চালানো হতে থাকে। এমন বহুবার হয়েছে যে টিয়ার গ্যাসের শেল, রাবার বুলেটের জেরে আমরা থেমে গিয়েছি। কিন্তু কিছু সময় পর আবার এগিয়ে গিয়েছি। যখন পুলিশের গুলিতে শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটল তখন আমাদের মধ্যে আর কোনো ভয় ছিল না। তখন আমাদের মাথায় একটাই চিন্তা ছিল যে একটা সাধারণ কোটা আন্দোলনে তো এভাবে গুলি চালাতে পারে না, যেহেতু গুলি চালিয়েছেই এর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। চোখের সামনে আমরা সহপাঠী, বড় ভাই, ছোট ভাইদের গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছি, রক্তাক্ত হতে দেখেছি। সেসব ঘটনা আমাদের কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু প্রতিটি ঘটনা আমাদের ক্রোধ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে যখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হল বন্ধ হওয়ায় আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাচ্ছিল তখন আমরা আন্দোলনকে থেমে যেতে দিইনি। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ স্যাক্রিফাইস করেছি। অনেক শিক্ষার্থী মারা গেছেন, অনেকে আহত হয়েছেন, গ্রেফতার হয়েছেন। এসবের পরও আমরা থেমে যাইনি। শেষ পর্যন্ত এ আন্দোলন গণমানুষের আন্দোলন হয়ে উঠেছিল। আমরা সব স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করে দিয়েছি শিক্ষার্থীরা কখনো হারে না। শুধু এ সরকারই নয়, আগামীতে যারা আসবে তাদের জন্যও আমরা বার্তা দিলাম যে শিক্ষার্থীদের রক্ত ঝরিয়ে কেউ ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না
আমার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া গুলিটাই এক কলেজ ছাত্রের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল
আমরা ১৬ জুলাই থেকে আন্দোলন শুরু করলেও আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী জড়ো হয় ১৮ জুলাই। ওইদিনই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ভয়াবহ হামলা চালায় পুলিশ। ১৮ জুলাই নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি, নর্দার্ন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা যমুনার দিকটাতে ছিলাম। আর মেরুল বাড্ডার দিকে ছিল ব্র্যাক ও আশপাশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। প্রথমে হামলা হয় ব্র্যাকের শিক্ষার্থীদের ওপর। হামলার সংবাদ পেয়ে আমরা ব্র্যাকের দিকে যাই। পথে পুলিশের সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষ হয়। তখন পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট আর আমরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করছিলাম। একপর্যায়ে পুলিশের একটা দল কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটিতে আশ্রয় নেয়। আমরাও সংঘর্ষের একপর্যায়ে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির দিকে গেলে পুলিশ গুলি ছুড়তে শুরু করে। তখন একটি গুলি আমার পাশ থেকে গিয়েই ইমপেরিয়াল কলেজের একটি ছেলের শরীরে লাগে। সে সেখানেই মারা যায়। এ ঘটনা আমাকে ট্রমাটাইজড করে ফেলেছিল। তবে সেদিনই এটাও ঠিক করে নিয়েছিলাম যে এ ঘটনার শেষ দেখতে হবে। শিক্ষার্থীদের হত্যার বিচার নিয়েই ফিরতে হবে। পরবর্তী কয়েকদিন ইন্টারনেট না থাকায় এবং কারফিউ ও পুলিশের ধরপাকড়ের জেরে আন্দোলনে সরাসরি অংশ নিতে পারিনি। নিরাপত্তার স্বার্থে মিরপুর চলে আসতে বাধ্য হই। এর পরের কর্মসূচিগুলোয় মিরপুর ১০-এ অংশগ্রহণ করা হয়েছে। সর্বশেষ ৫ আগস্টও মিরপুর ১০ থেকেই গণভবনের উদ্দেশে রওনা হই। যখন আগারগাঁও পৌঁছাই তখনই মনে হচ্ছিল কিছু একটা অস্বাভাবিক, হয়তো কিছু ঘটছে। গণভবনে পৌঁছার পর যখন আমাদের প্রবেশে বাধা দিল না তখনই বুঝলাম আমাদের চাওয়া পূরণ হয়েছে, আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছেছি।









