ভাবুন তো? তিনদিনের জন্য আপনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়ে গেলেন। নোবেলজয়ী শিক্ষকদের ক্লাস সশরীরে করছেন, তাদের সঙ্গে নৈশভোজে আড্ডা দিচ্ছেন কিংবা নিজের দেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষানুরাগীদের সামনে। কেমন হবে ব্যাপারটা? হার্ভার্ড কনফারেন্সে যোগ দিয়ে এমন কিছু অবিস্মরণীয় স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে ফিরে এলাম বাংলাদেশে।

হার্ভার্ড সম্মেলন ২০২৫: যেখানে নতুন প্রজন্ম পরিবর্তনের গল্প লেখে!

হার্ভার্ড কলেজ প্রজেক্ট ফর এশিয়ান অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস (এইচপিএআইআর), হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অলাভজনক ছাত্র সংগঠন। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ ছাত্র সংগঠন, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনার জন্য একটি প্লাটফর্ম তৈরি করেছে, যেখানে শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবীরা আন্তর্জাতিক ডেলিগেট হিসেবে অংশ নিতে পারে। বিগত ৩৪ বছর ধরে এইচপিএআইআর বিশ্বের ৩৪টি ভিন্ন দেশে ৪৯টি সম্মেলন আয়োজন করেছে, যেখানে ৪০,০০০-এর বেশি শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবী অংশ নিয়েছে। এইচপিএআইআর প্রতি বছর দুটি শিক্ষার্থী পরিচালিত সম্মেলন আয়োজন করে—একটি হার্ভার্ড ক্যাম্পাসে এবং আরেকটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে। এশিয়ার সম্ভাব্য আয়োজক শহরগুলো ছয় মাসের কঠোর বিডিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয় কনফারেন্স ক্যাম্পাস হিসেবে। এশিয়ান কনফারেন্স কোথায় অনুষ্ঠিত হবে তা হার্ভার্ড কনফারেন্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে ঘোষণা করা হয়।

‘Generational Transitions : Passing the Torch, Paving the Way’ এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ৭০টি দেশের ২৯৮ জন প্রতিনিধিকে নিয়ে এ বছর ৭-৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে হার্ভার্ড কনফারেন্স ২০২৫। কনফারেন্স ক্যাম্পাসের মতন আন্তর্জাতিক ডেলিগেট নির্বাচনও অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ। লিখিত পরীক্ষা, পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা এবং আগ্রহের ভিত্তিতে প্রাথমিক নির্বাচনের পর চূড়ান্ত পর্বে মৌখিক পরীক্ষা ও গভীর পর্যালোচনার মাধ্যমে ডেলিগেট নির্বাচন করা হয়। যেসব প্রতিযোগী ব্যতিক্রমী সম্ভাবনা ও কনফারেন্সে সর্বাধিক অবদান রাখার সক্ষমতা ও প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করতে পারে শুধু তাদেরই নির্বাচন করা হয়। এ বছর বাংলাদেশ থেকে মোট চারজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছে।

নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য পরামর্শ, নেটওয়ার্কিং ও দিকনির্দেশনার সুযোগ তৈরি করতে এইচপিএআইআর সম্মেলনগুলো বিশ্বমানের বক্তা ও গুণীজনদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। পূর্ববর্তী সম্মেলনগুলোয় বক্তা হিসেবে উল্লেখযোগ্যভাবে ছিলেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি-মুন, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সেথ শেলডেন, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড, Zipcar-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক সিইও রবিন চেজ, ডেলয়েট গ্লোবালের সিওও ফ্রাঙ্ক ফ্রাইডম্যান, McKinsey & Co.-এর সিইও, Zoom-এর সিওও, ফিলিপাইনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি, হংকংয়ের সাবেক প্রধান সচিব, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তারকা জেনিস কহ, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, অনুপম ত্রিপাঠিসহ আরো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। এ বছরের সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ বক্তা ছিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ স্যার অলিভার হার্ট, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাবেক চিফ টেকনোলজি অফিসার লেসলি গোহ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উইলিয়াম সি কিরবি, মিসেল ম্যাকেলরয়, রবার্ট ওয়াল্ডিংগার, ইয়েল স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের শিক্ষক মার্ক ফ্রেডম্যান, দুসান রোবোটিক্স আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আলেক্স লি, চায়নার সুপার এইট হোটেলসের প্রতিষ্ঠাতা মিসেল প্রিস্নিক, টুইটার ইন্ডিয়ার কান্ট্রিহেড মানিস মাহেশ্বারি, ঔপন্যাসিক জেনিকা অজাসহ বহুমাত্রিক গুণীজন। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক ভারপ্রাপ্ত মার্কিন শ্রম সচিব জুলি সু। বুঝতেই পারছেন শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি থেকে শুরু করে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প ও সংস্কৃতি—সব খাতে নেতৃত্ব দানকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের এক অপূর্ব মেলবন্ধন এ সম্মেলন। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংমিশ্রণ, উদ্ভাবন ও পরিবর্তনের মাধ্যমে কীভাবে আজকের এবং আগামী দিনের নেতৃত্বের সেতুবন্ধন গড়া যায়, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এ মহাযজ্ঞ।

স্মৃতির পাতায় হার্ভার্ড

মাসব্যাপী বিভিন্ন যাচাইমূলক ধাপ পেরিয়ে আমি ও আমার জীবনসঙ্গী দুজনেই হার্ভার্ড সম্মেলনের জন্য চূড়ান্তভাবে মনোনীত হয়ে গেলাম। এরপর ভিসার জন্য আবেদন। ভিসার স্লট পেতে বেশ বেগ পেতে হলেও পাঁচ বছরের বি২ ভিসা পেয়ে গেলাম বেশ সহজেই। আমাদের ভিসা কনস্যুলেটর নিজেও হার্ভার্ডের শিক্ষার্থী। বললেন, ‘অবশ্যই বুট জুতো আর ওভারকোট সঙ্গে নিয়ে যেও, আমার কলেজে ওই সময়ে তুষারপাত হওয়ার সম্ভাবনা বেশ।’ বাক্স-পেটরা গুছিয়ে উড়াল দিলাম পৃথিবীর পথে পৃথিবীর পাঠশালায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে জনবহুল এবং রাজধানী শহর বোস্টনে নেমেই দেখি কনস্যুলেটরের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য। তাপমাত্রা ঋণাত্মক সংখ্যারেখায় হাঁটছে। হাড় কাঁপানো মাইনাস ৭ ডিগ্রিতেও সূর্য্যিমামার দেখা মিলল।

edt 5

প্রথম দিন বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কেমব্রিজ শহরে হার্ভার্ড বুকস্টোর, গুটম্যান লাইব্রেরি ও হার্ভার্ড ফগ মিউজিয়াম অব আর্টে ঘুরে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ভিনসেন্ট ভ্যান গখ, পাবলো পিকাসোর হাতে আঁকা বিখ্যাত সব ছবি, প্রাগৈতিহাসিক ভাস্কর্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কী নেই সেখানে। বোস্টন এমন এক শহর যার প্রতিটি অলিগলি একেকটা গল্প বলে এবং তার প্রতিটি জাদুঘর একেকটা ভিন্ন পৃথিবী ধারণ করে। এত চমৎকার একটা জাদুঘরের শহর দেখার জন্য বরাদ্দ মোটে চারদিন, ভাবতেই বেশ মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল।

Statue of Three Lies

পরদিন কনফারেন্স শুরু হওয়ার আগে সকাল সকাল দুটো চমৎকার জাদুঘর ঘুরে দেখলাম। হার্ভার্ড মিউজিয়াম অব দ্য এনসিএন্ট নিয়ার ইস্ট এবং হার্ভার্ড কালেকশন অব হিস্টোরিক্যাল সায়েন্টিফিক ইনস্ট্রুমেন্টস। কনফারেন্সের শুরুতেই ডেলিগেটদের জন্য প্রতি ২০ মিনিট পর পর গাইডেড ক্যাম্পাস ট্যুরের ব্যবস্থা ছিল। শ্বেতশুভ্র বরফ আচ্ছাদিত হার্ভার্ড ক্যাম্পাসের মাঝ দিয়ে শীতে জবুথবু উৎসুক চোখের এ তরুণ ঢল ছিল দেখার মতন। প্রথমেই আমরা দেখলাম হার্ভার্ড ইয়ার্ডের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ জন হার্ভার্ডের ভাস্কর্য। পুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সব থেকে বেশি ছবি তোলা হয় যেসব ভাস্কর্যের সামনে, তার মাঝে এটি অন্যতম। প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা ক্লাসে যাওয়ার পথে তার পা স্পর্শ করে এ বিশ্বাসে যে এতে তাদের কঠিন পরীক্ষা ভালো হবে কিংবা হার্ভার্ডে পড়ার সুযোগ মিলবে। মজার বিষয় হচ্ছে এ ভাস্কর্যকে বলা হয় "Statue of Three Lies অর্থাৎ তিনটি মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে এ ভাস্কর্য।

edt 3

প্রথমত, ভাস্কর্যের নিচে যদিও"জন হার্ভার্ড নামটি খোদাই করা রয়েছে, কিন্তু এটি আসলে জন হার্ভার্ডের প্রকৃত প্রতিরূপ নয়। প্রকৃতপক্ষে, জন হার্ভার্ডের কোনো জীবন্ত প্রতিকৃতি নেই। ১৮৮৪ সালে ড্যানিয়েল চেস্টার ফ্রেঞ্চ এ বিখ্যাত ভাস্কর্যটি তৈরি করেন এবং শেরম্যান হোয়ার ছিলেন এর মডেল। পরবর্তী সময়ে শেরম্যান হোয়ার মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য ও একজন জেলা অ্যাটর্নি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

দ্বিতীয়ত, জন হার্ভার্ড এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নন। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। ফলকে "প্রতিষ্ঠাতা" শব্দটি লেখা থাকলেও তা সত্য নয়। জন হার্ভার্ড কখনো এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নও করেননি। বরং তিনি হার্ভার্ডের প্রথম বড় দাতা ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তার সম্পত্তির অর্ধেক এবং একটি বৃহৎ গ্রন্থাগার (যার মধ্যে ৪০০টির বেশি বই ছিল) দান করেছিলেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ম্যাসাচুসেটস বে কলোনির গ্রেট অ্যান্ড জেনারেল কোর্টের ভোটের মাধ্যমে। এবং

তৃতীয়ত, হার্ভার্ড ১৬৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ১৬৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ার সম্মান অর্জন করেছে। হার্ভার্ডের প্রাথমিক নাম ছিল নিউ কলেজ এবং এর মূল লক্ষ্য ছিল ধর্মীয় নেতাদের প্রশিক্ষণ দেয়া। ১৩ মার্চ ১৬৩৯ সালে হার্ভার্ড তার বিখ্যাত নাম পায়, যা এ মহান দাতার নামে রাখা হয়। এ ভাস্কর্য প্রতিদিন এত বেশি মানুষের ছবি তোলার কেন্দ্রে থাকে যে এটি অনেক সেলিব্রিটিকেও ছাড়িয়ে গেছে!

যে লাইব্রেরিতে রোজ ফোটে তাজা ফুল

এরপর আমরা দেখলাম হ্যারি এলকিন্স উইডেনার মেমোরিয়াল লাইব্রেরি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ফ্ল্যাগশিপ লাইব্রেরি এলিনর এলকিন্স উইডেনারের অনুদানে নির্মিত হয়, যিনি এটি তার পুত্র হ্যারি উইডেনারের স্মৃতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। হ্যারি হার্ভার্ডের ১৯০৭ সালের ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। হার্ভার্ডে পড়াকালীন হ্যারি বিরল ও মূল্যবান বই সংগ্রহ করতে শুরু করেন। ১৯০৭ সালে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি তার বইয়ের সংগ্রহ আরো সমৃদ্ধ করতে থাকেন এবং একদিন হার্ভার্ডে এ সংগ্রহ দান করার পরিকল্পনা করেন। ১৯১২ সালের এপ্রিলে হ্যারি তার বাবা-মায়ের সঙ্গে টাইটানিকে যাত্রা করেন। জাহাজটি ডুবে যাওয়ার সময় তার মা এবং তাদের গৃহপরিচারিকা বেঁচে গেলেও হ্যারি, তার বাবা এবং তাদের ভৃত্য প্রাণ হারান।

মা এলিনর উইডেনার হার্ভার্ডে তার ছেলের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য উইডেনার লাইব্রেরি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। অবশেষে ১৯১৫ সালে হ্যারি এলকিন্স উইডেনার মেমোরিয়াল লাইব্রেরি উদ্বোধন করা হয়। আজও হ্যারির বইয়ের সংগ্রহ উইডেনার লাইব্রেরির অংশ হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে এবং প্রতিদিন সকালে তাজা ফুল দিয়ে হ্যারিকে স্মরণ করা হয়। হার্ভার্ড ক্যাম্পাসের সবচেয়ে বড় ও শৈল্পিক এ লাইব্রেরিটি ৫৭ মাইল দীর্ঘ শেলফ স্পেস নিয়ে গঠিত এবং তিন মিলিয়নের বেশি বই ধারণ করতে পারে। লাইব্রেরিতে দুটি প্রধান তলা রয়েছে, যেখানে সম্পূর্ণ নীরব পরিবেশে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো লকার রিডিং রুম। এছাড়া লাইব্রেরির নিচে পাঁচতলা বিশিষ্ট ভূগর্ভস্থ সংগ্রহশালা রয়েছে, যেখানে লাইব্রেরির অধিকাংশ বই সংরক্ষিত থাকে। উইডেনারের অভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি শুধু হার্ভার্ডের আইডিধারী শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য সংরক্ষিত। তবে ভার্চুয়াল ট্যুরের মাধ্যমে কেউ চাইলে লাইব্রেরির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে। শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে, হার্ভার্ড কলেজের চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থীরা তাদের সিনিয়র থিসিস সম্পন্ন করতে বছরের বেশির ভাগ সময় উইডেনারে কাটায়। বছরের শেষে গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরা থিসিস হাতে নিয়ে উইডেনারের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে তাদের সাফল্য উদযাপন করে। উইডেনার শুধু একটি গ্রন্থাগারই নয়, এটি হার্ভার্ডের ঐতিহ্য ও শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায়ের এক প্রতীক। এখানে ৪৫০টির বেশি ভাষায় বই সংরক্ষিত আছে। ছয় মিলিয়নের বেশি বই ডিজিটাইজ করা হয়েছে এবং বিশ্বখ্যাত গুটেনবার্গ বাইবেলের এক কপি এ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। আছে দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, দুষ্প্রাপ্য ছবি আর বিরল সব মানচিত্র। এছাড়া আছে অনেক নোবেল পুরস্কারসহ অমূল্য সব পদকের সমারোহ। চারিদিকে যেন স্বীকৃতি আর অর্জনের দ্যুতি ছড়াচ্ছে।

পথে হলো দেখা

বরফের মাঝে কাঠবিড়ালী আর হাঁসের খেলা দেখতে দেখতে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দেখা হয়ে গেল। হার্ভার্ড শপে আমাদের জন্য ছিল বিশেষ ছাড়। সেখান থেকে কিছু বই আর স্মারক কিনতে কিনতে সবার সঙ্গে আলাপ ও বন্ধুত্ব হচ্ছিল। রাস্তার দুই পাশের রেস্তোরাঁ, কফি হাউজ, আর্ট গ্যালারি, বইয়ের দোকান সবাই মিলে ঘুরতে ঘুরতে ঠিক করলাম হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলটা দেখে আসা যাক। যেই বলা সেই কাজ। চার্লস নদীর কোল ঘেঁষে হৈহৈ রৈরৈ করতে করতে যাওয়ার পথে পেছন থেকে তিনজন ডেকে বললেন আপনারা বাংলাদেশী? আমাদের ব্যাগের লেখা দেখে এ প্রশ্ন। পৃথিবীর অপর প্রান্তে গিয়ে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত তিন তরুণের সঙ্গে আলাপ হলো। তারা হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলেরই ছাত্র। তাদের পিছু পিছু দেখে এলাম হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল। এ যেন আরেকটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়।

আমি বাংলার গান গাই

এরপর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফায়ারসাইড চ্যাটে অতিথি ছিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ স্যার অলিভার হার্ট এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাবেক চিফ টেকনোলজি অফিসার লেসলি গোহ। অত্যন্ত প্রাণবন্ত আলোচনা ও জম্পেশ খাওয়া-দাওয়া শেষে শুরু হলো আন্তর্জাতিক নাইট। কনফারেন্সে ডেলিগেট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পরও রীতিমতো অডিশন দিয়ে i-night-এ পারফর্মার হিসেবে সুযোগ পেতে হয়।

edt 4

বাংলাদেশের সংস্কৃতি তুলে ধরতে আমরা সেদিন মঞ্চে উঠেছিলাম। কণ্ঠে লালন সাঁইজির গান, হাতে বাংলার একতারা, খঞ্জনি আর পরনে দেশীয় তাঁতির খাদি কাপড়। মঞ্চ কতটা মাতিয়ে এলাম তা দর্শকরা ভালো বলতে পারবেন। তবে মঞ্চে দাঁড়িয়ে যতদূর চোখ যাচ্ছিল সবার চোখে মুগ্ধতা আর করতালি খেলা করতে দেখেছি। আর আমরাও মুগ্ধ হয়েছি এতগুলো দেশের চমৎকার সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দেখে।

দেখা হবে জাপানে

এ সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো Impact Challenges পর্ব। এটি মূলত একটি কেস সলভিং-প্রতিযোগিতাধর্মী কর্মশালা। বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, সেসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে তার মাঝে একটা বাস্তবিক সমস্যা প্রতিযোগীদের দল ভাগ করে দিয়ে সমাধান করতে বলা হয়। অতীতে এইচপিএআইআর বিশ্বব্যাংক, শোয়ার্জম্যান স্কলার্স এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে কাজ করেছে। Impact Challenges-এর মাধ্যমে নতুন স্টার্টআপ তৈরি হয়েছে, ইন্টার্নশিপ ও ভ্রমণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং করপোরেট অংশীদারদের সঙ্গে পরামর্শমূলক ইভেন্ট আয়োজন করা হয়েছে। দ্বিতীয় দিন হার্ভার্ডের বিভিন্ন ক্লাসরুম ও সেমিনার কক্ষে আমন্ত্রিত বক্তাদের বক্তব্য শেষে যে যার দল নিয়ে সমস্যা সমাধানে লেগে পড়ি। দলীয় কাজের মাধ্যমে আন্তঃদেশীয় এ বন্ধুত্ব আরো জোরদার হতে থাকে। তৃতীয় দিন একইভাবে সেমিনার ও পাশাপাশি কেস প্রেজেন্টেশন চলতে থাকে। সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল শেষে সেরা দলকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। সবশেষে এশিয়ান কনফারেন্সের ভেন্যু ঘোষণা করা হয়। এ বছর খুব শিগগিরই জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত হবে HPAIR ASIAN CONFARANCE.

edt 2

সব মিলিয়ে এইচপিএআইআর ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতার প্যাকেজ—বন্ধুত্ব, নতুন দেশে স্বপ্নের বিদ্যাপীঠে ভ্রমণ, বিভিন্ন বয়সের এবং বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে এক দলে কাজ করার দারুণ অভিজ্ঞতা, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির আদান-প্রদান, জ্ঞান সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়ার হাতছানি—সবকিছু মিলিয়ে এটি ছিল অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। প্রতিটি মুহূর্ত নতুন কিছু শেখার, নিজেকে চ্যালেঞ্জ করার এবং বিশ্বকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার সুযোগ যেন পরতে পরতে সাজিয়ে রাখা ছিল। এইচপিএআইআর শুধু একটি কনফারেন্স নয়, এটি এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা, যা আত্মোন্নয়ন ও অনুপ্রেরণার এক অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। প্রতিটি অভিজ্ঞতা, প্রতিটি আড্ডা, প্রতিটি হাসিমুখ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে আমরা একসঙ্গে বড় স্বপ্ন দেখতে পারি এবং সেগুলো বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারি।

আফরিদা জিননুরাইন উর্বী: সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, বাংলাদেশ বেতার, বরিশাল