শিক্ষাজীবনে অসামান্য অবদানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের দেয়া হয় চ্যান্সেলরস গোল্ড মেডেল বা রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক। গত শনিবার অনুষ্ঠিত ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) ১১তম সমাবর্তনে ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জনের জন্য তিন শিক্ষার্থীকে দেয়া হয় চ্যান্সেলরস গোল্ড মেডেল। উচ্চশিক্ষায় অনন্য মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ শিক্ষার্থীদের স্বর্ণপদক জয়ের পেছনের গল্প শুনেছেন শফিকুল ইসলাম
অধ্যবসায়ী হলে জীবন এমনভাবে পুরস্কৃত করবে যা আপনি কল্পনাও করেননি
গাজী শাহবাজ মোহাম্মদ
বিবিএ, সিজিপিএ-৩.৯৯
ইউনিভার্সিটিতে যেদিন পা রেখেছিলাম সেদিনটির কথা আজও মনে পড়ছে। খুব নার্ভাস ছিলাম। এক অনিশ্চিত জীবন। সত্যি বলতে একটু হতাশ ছিলাম। আমি সংগীত ক্যারিয়ারের জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা আলোর মুখ দেখেনি। ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে অনিশ্চিত ছিলাম। এমন সময় আমি ইউএপিতে ভর্তি হই। কারণ আমার প্রাক্তন বান্ধবী এখানে পড়াশোনা করছিল। আর এখন সে আমার স্ত্রী। আমি বুঝতে পারিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়টি আমার জীবনের মুক্তির সূচনা করবে। যখন আমরা নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারি না সেই সময়টাতে দরকার সেই সব মানুষের অনুপ্রেরণা যারা আমাদের ওপর ভরসা করতে পারেন, বিশ্বাস করতে পারেন। আমার জীবনে তারা হলেন আমার বাবা-মা। তারা সবসময় আমার পছন্দকে সমর্থন করেছেন, এমনকি আমার ব্যর্থতার পরও। কখনো আমাকে কোনো কিছু নিয়ে চাপ দেননি। আমার মা আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। আমার ইন্টার্নশিপ ডিফেন্সের কয়েক দিন আগে আমি আমার বাবাকে হারাই; জীবনের এমন একটি মুহূর্ত যখন আমি হাল ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মা সবসময় আমাকে সাহসের সঙ্গে জীবন মোকাবেলা করতে বলতেন। তিনি প্রায়ই রবীন্দ্রনাথের ‘মনেরে আজ কহ যে, ভালো মন্দ যাহাই আসুক, সত্যেরে লও সহজে’ এই লাইনটি উদ্ধৃত করতেন, যা এখনো আমাকে অনুপ্রাণিত করে। এটি আমাকে মনে করিয়ে দেয় জীবনে যা-ই আসুক না কেন; ভালো বা খারাপ; আমরা তা সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করতে পারি। আমি ভাগ্যবান যে অসাধারণ শিক্ষকদের পেয়েছিলাম যারা কেবল শিক্ষকই নয়, ছিলেন পরামর্শদাতা, প্রেরণাদাতা ও পথপ্রদর্শক। আর অবশ্যই বন্ধুরা। কভিডের সময়টা ছিল সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি। নড়বড়ে ইন্টারনেটে অনলাইন ক্লাস, আটকে থাকা জুম স্ক্রিন, বিদ্যুৎবিহীন পরীক্ষা এবং বিছানায় শুয়ে থেকেও ক্লাসে যুক্ত হওয়ার ভান করা। কিন্তু আমরা সফল হয়েছি। এমনকি যখন পৃথিবী থেমে ছিল, আমরা চলতে থাকি। আমরা মানিয়ে নিয়েছি। এ যাত্রা কেবল সিজিপিএ বা সার্টিফিকেটের চেয়েও বেশি কিছু। এটি আমাদের নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করা, যা আমরা কখনো কল্পনাও করিনি। জীবন হয়তো আমাদের স্বপ্নের সবকিছু নাও দিতে পারে, কিন্তু আমি আপনাকে বলতে চাই: যদি আপনি অধ্যবসায়ী হন, তাহলে জীবন আপনাকে এমন কিছু দিয়ে পুরস্কৃত করবে যা আপনি কখনো কল্পনাও করেননি।
সবসময় চেয়েছি শেখার আনন্দ নিতে
বিদিতা সরকার দিবা
সিএসই বিভাগ, সিজিপিএ-৩.৯৯
রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। এটি শুধু একটি মেডেল না, প্রতি রাতের পরিশ্রম, চোখের জল, না বলা ভয় এবং আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প। ছোটবেলায় আমি শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম। আমার কাছে শিক্ষকতা মানে শুধু পড়ানো না, একজন মানুষের জীবনে আলো জ্বালানোর কাজ। আজ আমি সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। বর্তমানে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ বিভাগেরই একজন প্রভাষক। এটা ছিল আমার স্বপ্ন, নিজে যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিখেছি, আজ সেখানে শিক্ষকতা করছি।
এ অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন, নিজের প্রতি বিশ্বাস, কঠিন পরিশ্রম এবং শিক্ষকদের গাইডলাইন। আমি সবসময় চেয়েছি বুঝে পড়তে, শেখার আনন্দ নিতে। নিজেকে প্রশ্ন করেছি, ভুল করেছি, আবার শিখেছি। প্রতিটি ধাপে নিজেকে আরো ভালো করতে চেয়েছি। আমার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন আমার মা এবং বাবা। আমার আসল হিরো। যখন সবকিছু কঠিন মনে হতো, মা বলতেন, ‘তুমি সবসময় ভালো করেছ, এখনো করবে।’ এই কথাটাই প্রতিদিন শক্তি জোগাত। কোনো সমস্যায় পড়লে বাবার একটাই ডায়ালগ ছিল, ‘টেনশন করো না, দেখছি আমি’। বাবার স্থির মানসিকতা ও ভাবনা আমাকে বারবার টেনে তুলেছে।
শিক্ষাজীবনে শুরুটা অনেক চ্যালেঞ্জের ছিল। অন্য শহর থেকে এসে মানিয়ে নিতে ভীষণ কষ্ট হয়েছে। চারপাশে সবাই অনেক মেধাবী, পরিচিত মুখ নেই, ভাষা বা আত্মবিশ্বাস কিছুই সহজ ছিল না। মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্ন করতাম, আমি কি পারব? কিন্তু ধীরে ধীরে বন্ধুরা, শিক্ষকরা আর পরিবারের সমর্থন আমাকে সামনে এগিয়ে দিয়েছে। যারা ভালো ফলাফল অর্জন করতে চায় তাদের বলব, ভালো ফল শুধু ট্যালেন্টে হয় না, ধারাবাহিক চেষ্টা দরকার। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো। পড়াশোনা বুঝে শেখো, রুটিন ফলো করো, প্রশ্ন করো এবং নিজেকে আপডেট রাখো। শুধু মার্কস নয়, শেখাটাই হোক মূল লক্ষ্য। গ্রুপ স্টাডি, টাইম ম্যানেজমেন্ট আর রিভিশন এগুলো আমাকে অনেক সাহায্য করেছে।
আত্মবিশ্বাসই যেকোনো সাফল্যের প্রথম ধাপ
রিপা রাণী বিশ্বাস
সিএসই বিভাগ, সিজিপিএ-৩.৯৮
রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক পাওয়ার অনুভূতি সত্যিই অসাধারণ। এটি শুধু আমার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং আমার পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের সম্মিলিত অবদানের ফল। এ সম্মান আমাকে ভবিষ্যতে আরো বড় কিছু করার জন্য অনুপ্রেরণা জোগায়। এ অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আমার বাবা-মায়ের নিরন্তর উৎসাহ ও আস্থা। তারা সবসময় আমাকে মানসিকভাবে সমর্থন দিয়েছেন এবং কখনই হতাশ হতে দেননি। পাশাপাশি আমার বন্ধুদের সহযোগিতা ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ—আমরা নিয়মিত গ্রুপ স্টাডি করতাম, একে অন্যকে সহযোগিতা করতাম। এছাড়া বিভিন্ন প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা, হ্যাকাথন, ওয়ার্কশপ ও ক্লাব কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ আমার চিন্তাধারাকে আরো প্রসারিত করেছে, যা একাডেমিক ও বাস্তব জ্ঞানকে সমন্বয় করতে সাহায্য করেছে। এ সম্মিলিত চেষ্টাগুলোই এ অর্জনের মূল ভিত্তি। শিক্ষাজীবনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল যাতায়াত। আমি নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় থাকতাম, সেখান থেকে প্রতিদিন নদী পার হয়ে ঢাকার পথে রওনা দিতে হতো। দীর্ঘ রাস্তা, যানজট এবং ৬-৭ ঘণ্টার যাতায়াত আমার প্রতিদিনের অংশ ছিল। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সময়মতো ক্লাসে উপস্থিত হওয়াটা ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয়গুলোর একটি।
আমার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন আমার বাবা ও মা। মা প্রতিটি মুহূর্তে আমাকে মানসিকভাবে শক্তি জুগিয়েছেন। যখনই কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি, মা ছিলেন আমার পাশে সাহস জোগাতে। শিক্ষকেরা ছিলেন পথপ্রদর্শক। সবসময় সঠিক দিকনির্দেশনা, উৎসাহ দিয়েছেন। যারা ভালো ফলাফল অর্জন করতে চায় তাদের জন্য আমার পরামর্শ হলো—কেবল বই মুখস্থ করলেই হবে না, বরং বুঝে পড়া এবং শেখার প্রতি আন্তরিকতা থাকতে হবে। গ্রুপ স্টাডি অত্যন্ত কার্যকর—আমি নিজেও বন্ধুদের সঙ্গে মিলে অনেক কিছু শিখেছি এবং শিখিয়েছি, এতে বিষয়গুলো আরো আত্মস্থ হয়। সিজিপিএ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই সবকিছু নয়। বাস্তব জীবনে দক্ষতা আরো বেশি দরকার হয়—তাই কোডিং, প্রজেক্ট, সমস্যা সমাধান এবং টিমওয়ার্কের অভ্যাস গড়তে হবে। সবশেষে, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো। ‘আমি পারব’—এ মানসিকতা থেকেই আত্মবিশ্বাস জন্মায়, আর আত্মবিশ্বাসই যেকোনো সাফল্যের প্রথম ধাপ।










