দিদার এ হোসেইন। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান। সম্প্রতি আইইউবির সাফল্য অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম

৩২ বছর আগে যে লক্ষ্য নিয়ে আইইউবি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার কতটা অর্জন হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নটি দেখেছিল সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. আব্দুল মজিদ খান। তার স্বপ্ন ছিল দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে জ্ঞানের পরিবেশ করা। উন্মুক্ত চিন্তার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের জন্য গড়া। আইইউবিতে পড়াশোনা শেষে জ্ঞানার্জন করে যেন পুরো সমাজ, দেশের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে এবং আইইউবির পরিচয় বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়ে একজন সুনাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে। আইইউবির মোটো Teacheth man that which he knew not—এটি তারই দেয়া। কোরআনের একটি আয়াত থেকে নেয়া। যারা এখানে ট্রাস্টি তারা কখনই কোনো লাভ নেবেন না—এমন একটি সিদ্ধান্ত ছিল প্রতিষ্ঠাকালে। ব্যবসায়িক চিন্তা থেকে বিদ্যা হওয়া উচিত না। শুরু থেকেই ট্রাস্টিরা কোনো সুবিধা নেননি। শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা করার মোটিভ কখনো ছিল না। আমরা এটি বজায় রেখেছি, ভবিষ্যতেও রাখব। সব অর্থ এ বিশ্ববিদ্যালয়েই বিনিয়োগ হয়। যাতে আমরা ভালো শিক্ষা দিতে পারি। আমি মনে করি, আমাদের অর্জন মানুষই মূল্যায়ন করবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন করার আরো অনেক কিছুই রয়েছে। যেখানে পুরো বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর, সেখানে আমাদেরও একটি অবস্থান থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের সেভাবে গড়ে তুলতে হবে। আমরা বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছি, যেমন ডাটা সায়েন্স। চীন, ভারতের বিশ্বে যে অবস্থান, সেটি তাদের প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানের অর্জন। আমরা সেখানে পৌঁছতে পারিনি। আমরাও শিক্ষার্থীদের বিশ্বদরবারে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় শিক্ষিত করে ভালো অবস্থান তৈরি করতে চাই। সেই চেষ্টায় কাজ করে যাচ্ছি।

দেশে শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আইইউবি কীভাবে গুণগত শিক্ষার মান ধরে রেখেছে?

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে ট্রাস্টিদের কোনো বাণিজ্যিক স্বার্থ নেই। এখানে যা আয় হয় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্যয় হয়। আমরা চেষ্টা করি ভালো শিক্ষকদের নিয়ে আসতে। ভবিষ্যতে আরো ভালো শিক্ষক নিয়ে আসব। ভালো শিক্ষক থাকলে ভালো গ্র্যাজুয়েট তৈরি হবে। এ বিষয়টির প্রতি আমরা বেশি মনোযোগ দিয়েছি।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বলা হয়। কিন্তু শিক্ষা ব্যয় এতটা বেশি যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পক্ষে এ অর্থ জোগান দেয়া সম্ভব না। অনেকেই বলে থাকেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ধনিক শ্রেণীর বিশ্ববিদ্যালয়। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হলে শিক্ষা ব্যয় এত বেশি কেন?

আপনি হয়তো বলছেন এটি একটি বৈষম্য। আসলে প্রাইভেটে দুনিয়ার সব জায়গায় বড় বড় প্রতিষ্ঠানে খরচ বেশি। কারণ সরকারি অর্থায়ন নেই। ভালো শিক্ষক ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। তবে আইইউবিতে যেসব মেধাবী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, ঢাকার বাইরে থেকে এসেছে তাদের টিউশন ফি মওকুফসহ থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বারিধারায় ‘ সায়মা হল’ নামে আবাসিক একটি হল রয়েছে। সেখানে ৪০টি সিট আছে। সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের ছাত্রীদের জন‍্য সেখানে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব‍্যবস্থা আছে। সায়মা হলের ছাত্রীরা সবাই আইইউবিতে বিনা খরচে পড়াশোনা করে। সায়মা হলের পুরো দায়িত্ব নিয়েছেন আমাদের ট্রাস্টি মতিন চৌধুরী। ব্যয়ভার তিনি বহন করেন। আইইউবি এটি পরিচালনা করে। এ বছর সমাবর্তনে একজন ছাত্রী টপ অ্যাচিভার হিসেবে স্বর্ণপদক পেয়েছে। সে তার শিক্ষাজীবন শুরু করেছিল দিনাজপুরের একটি ব্র্যাক স্কুলে। আমরা যদি এ রকম আরো ১০ শিক্ষার্থীকে আলোকিত করতে পারি, সেটি আমাদের জন্য একটি বড় পাওয়া। এখনো আমরা অনেক স্কলারশিপ দিয়ে থাকি। অনেক শিক্ষার্থীকে ভর্তুকি দিই। আমরা চেষ্টা করি টিউশন ফি মিনিমাম রাখার জন্য। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় আইইউবির শিক্ষার্থীরা কম খরচে পড়াশোনা করে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ইউজিসি। আইইউবিতে পিএইচডি চালুর মতো অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

পিএইচডি চালুর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। আমাদেরও প্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরি হতে হবে। গবেষণা বাড়াতে হবে। তার জন্য আমরা সচেষ্ট। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা হতে হবে। আমাদের স্বীকৃতি যদি বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় না থাকে, তাহলে পিএইচডি সমাদৃত হবে না। আমাদের ভিত্তিটা আমরা ঠিক করব। অবশ্যই পিএইচডি চালু হবে। আমরা গবেষণায় অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আরো বেশি অর্থ বরাদ্দের ব্যাপারেও নজর দিচ্ছি। বর্তমানে আমরা বড় অংকই গবেষণায় ব্যয় করছি। নতুন করে একটা স্কিম নিয়েছি। যেখানে যেখানে বরাদ্দ কমানো দরকার বা বাড়ানো দরকার, সেভাবে এগোনোর পরিকল্পনা করছি। গবেষণায় অর্থ বরাদ্দের জন্য আগেও কার্পণ্য ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না।

আপনি নিজে একজন সফল ব্যবসায়ী। প্রায়ই আলোচনায় উঠে আসে শিল্প খাতের সঙ্গে শিক্ষা খাতের দূরত্বের কথা। বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিরা আপনার মতোই ব্যবসায়ী। তবুও ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার কোলাবরেশন ঠিকমতো হচ্ছে না কেন?

আমাদের সমাজে ব্যবসা এবং শিক্ষা কখনই একসঙ্গে ছিল না। এটি নতুন ধারণা। আমরা ব্যবসাও জানতাম না। স্বাধীনতার পর আমরা একটা পর্যায়ে এসেছি। ধীরে ধীরে এটি একটি পর্যায়ে পৌঁছবে। আমাদের প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। ১৯৮৩ সালে আমি কোরিয়ায় ছিলাম। একজন শিক্ষানবিশ হিসেবে আমি সেখানের একটি টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটে যেতাম। সেখানে দেখতাম শিক্ষকরা আন্তর্জাতিক এক্সিবিশন থেকে বিভিন্ন দেশের কাপড়ের স্যাম্পল এনে অ্যানালাইসিস করত। নিজেদের মতো ফর্মুলা তৈরি করত এবং ইন্ডাস্ট্রিতে বিক্রি করত। যিনি কাজটি করতেন, তিনি একটি লভ্যাংশ পেতেন। এতে প্রতিষ্ঠানও লাভ করত, আবার ইন্ডাস্ট্রিও। এতে করে একটি বিশ্ববিদ্যালয় শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। সবার জন্য উইন-উইন সিচুয়েশন। এ রকম একটি ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটি নতুন কিছু না। সবাই করছে। মানসিকতা বদলাতে হবে। জ্ঞান বিকিরণ না হলে সে জ্ঞানের মূল্য নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

আমরা স্বপ্ন দেখি এমন একটি ক্যাম্পাস, যেটি পাশ্চাত্যের মতো সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে। যেখানে শিক্ষকদের থাকার ব্যবস্থা থাকবে, ছাত্রাবাস থাকবে, মাঠ থাকবে, বাগান থাকবে। সব মিলিয়ে সর্বাধুনিক ক্যাম্পাস হবে এটি। আমরা এরই মধ্যে পূর্বাচলে ১০০ বিঘা জমি কিনেছি। আরো কিনব। আমাদের স্বপ্ন এমন একটি ক্যাম্পাস জাতিকে উপহার দেব, যেটি রোল মডেল হিসেবে সবাই প্রশংসা করবে। এ ক্যাম্পাস হবে ১৫০ বিঘা আয়তনের। বর্তমানে যে ক্যাম্পাস আছে সেটিও থাকবে। আশা করছি, ২০৩০ সাল নাগাদ নতুন ক্যাম্পাসটি চালু করতে পারব।

আপনার যদি কিছু বলার থাকে...

সবাই মিলেই জাতি। সবাইকে সুযোগ দিতে হবে। একে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা থাকা উচিত। সমাজের অনগ্রসরদের সহায়তা করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই করতে হবে। আমার যে অর্থ আছে এটি আমার একার না, সবার সঙ্গে শেয়ার করতে হবে, যারা সুবিধাবঞ্চিত। আমার কাছে ১০০ টাকা থাকলে ১০ টাকা অন্যের জন্য ব্যয় করতে হবে। আইইউবির সমাবর্তনে গ্র্যাজুয়েটদের একটি খাম দিয়েছিলাম। সেখানে ‘সহমর্মিতার’ কথা বলেছি। কিছু টাকা দেয়া হয়েছিল। একটা অংশ নিজের জন্য আরেকটি অংশ সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য, যারা এ গ্র্যাজুয়েটদের মতো সৌভাগ্যবান না। আমি একা নই, আমি স্বাবলম্বী হলে আশপাশে যারা আছে তাদেরও সহায়তা করতে হবে। সহানুভূতি ও সহমর্মিতা না থাকলে, গরিবের দুঃখ না বুঝলে আর মানবিক থাকি না আমরা। সমাজে যারা সৌভাগ্যবান না তাদের প্রতি যেন আমাদের সহানুভূতি ও সহমর্মিতা থাকে এ বার্তা ছড়িয়ে দিতেই এ উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এখনই যদি গ্র্যাজুয়েটরা এটি রপ্ত করতে পারে তাহলে ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগ তারাও নেবে। সমাজে বৈষম্য কমবে।