চট্টগ্রামের সমুদ্রবন্দর যেখানে ঢেউ এসে প্রতিদিন বন্দরের বুকে রেখে যায় ক্লান্তির জলছাপ, সেখানে একদিন ভোরের আবছা আলোয়, এক কিশোর দাঁড়িয়ে থাকে আপন মনে। সে তাকিয়ে থাকে দিগন্তে, যেখানে আকাশ আর সমুদ্রের দেখা মেলে, আর গুনগুন করে ওঠে আপন সুরে যেন সে-ই সেই ঢেউয়ের গোপন ভাষা বোঝে, শুনে, আর গানে রূপ দেয়। এ তরুণ হলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আওয়াল খান শাহীন। চট্টগ্রামের বন্দর এলাকার পোর্ট ইস্ট কলোনিতে বেড়ে ওঠা শাহীন বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত শিল্পী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের ফোক শিল্পী, গিটার ও সুরে দক্ষ প্রশিক্ষক এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এক মিউজিক আইকন।
শাহীন শুধু গায়ক নন—একাধারে গায়ক, গীতিকার, সুরকার ও বহু বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী মিউজিশিয়ান। হারমোনিয়াম, গিটার, ইউকেলেলে, ম্যান্ডোলিনা, ব্যাঞ্জো, কাজন—তার আঙুল যেন মাটি ছুঁয়ে সুর তোলে, বাতাস ছুঁয়ে সৃষ্টি করে ছন্দের মায়া। তার ইউটিউবে প্রকাশিত ‘পোড়া মোন’ গানটি এরই মধ্যে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। তবে এ পথ ছিল না মসৃণ। তার সুরযাত্রার প্রতিটি বাঁকে ছিল কাঠিন্য, ছিল নির্ঘুম রাত, ছিল চোখের জলে লেখা অধ্যায়। ছিলেন একজন মা, যিনি নিজে না খেয়ে সন্তানের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছেন। ছিলেন এক বাবা, যিনি নিজের সবকিছু উৎসর্গ দিয়ে সন্তানের পাশে থেকেছেন ছায়ার মতো। আর ছিলেন নানু, যার দোয়া যেন প্রতিটি গানে হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার পাথেয়।
২০২১ সালে প্রথম জাতীয় পুরস্কার পাওয়া, তারপর ২০২২ সালের স্বর্ণপদক, ২০২৩ সালের জাতীয় শিশু-কিশোর মেলা পুরস্কার এবং ২০২৫ সালের লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল লিও ইয়ুথ ক্যাম্প সং কম্পিটিশন অ্যাওয়ার্ড একে একে জয়ের পালকে জড়িয়েছে সাফল্যের ধ্বনি। শুধু জাতীয় পর্যায় নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও রেখেছেন আলোড়ন। চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড মিউজিক অ্যান্ড আর্ট ফেস্টিভ্যাল ২০২৩ এবং ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক ফেস্টিভ্যাল ২০২৪-এ অংশগ্রহণ করে আন্তর্জাতিক দর্শক-শ্রোতার মন ছুঁয়ে যান। বিশ্ব সংস্কৃতির এ মিলনমেলায় এক তরুণের মুখে বাংলার গান যেন হয়ে উঠেছিল চট্টগ্রামের কণ্ঠস্বর।
বর্তমানে শাহীন ‘কবি নজরুল একাডেমি চট্টগ্রাম’-এর গিটার প্রশিক্ষক, ‘ড্রিমস অব আর্টিস্ট’-এর সংগীত প্রশিক্ষক এবং ‘চিলড্রেন ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজ’-এর সংগীত শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তার নিজের গড়া ব্যান্ড ‘তরঙ্গ (Toronggo)’ পরিচালনা করছেন। শাহীন বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় আজ এতটুকু এসেছি। নানু, মা, বাবা এদের ছাড়া কিছুই হতাম না। বিশেষ করে মা ও নানুর ভালোবাসা আর ত্যাগ আমাকে গড়েছে। জানি না তাদের আশা কতটা পূরণ করতে পেরেছি, তবে চেষ্টা করে যাব যতদিন নিশ্বাস আছে, ইনশা আল্লাহ।’ শাহীনের স্বপ্ন একদিন দেশের অন্যতম সুরকার ও সংগীতশিল্পী হবেন তিনি।










