‘এই অভিজ্ঞতা—একজন আলোকচিত্রী হিসেবে আমার যাত্রাকে সত্যিই নতুন রূপ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমার ছবি নির্বাচিত এবং প্রদর্শিত হওয়া একটি অসাধারণ সম্মানের বিষয়। কিন্তু প্রদর্শনীটি সরাসরি দেখার নেপাল ভ্রমণ ছিল আমার জন্য বিশেষ কিছু।’ ১৩তম আন্তর্জাতিক আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে (আইআইইউপিই) অংশ নিয়ে এভাবে অনুভূতি প্রকাশ করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইয়াসিন রহমান ইফতি।

এই আলোকচিত্রীর মতে, ফটোগ্রাফি কেবল আলো-ছায়ার খেলা নয়। এটি একটি গল্প, সময়ের এক টুকরো দলিল। মানুষের অনুভূতি, প্রকৃতির সৌন্দর্য, সমাজের অসংগতি কিংবা জীবনের ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত—সবকিছুকে একটি মুহূর্তের ভেতর ফ্রেমবন্দি করে রাখতে পারে এ শিল্প।
সৃষ্টিশীল ফটোগ্রাফারদের এক মঞ্চে নিয়ে আসতে প্রতি বছরের মতো এবারো আয়োজিত হলো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোকচিত্র প্রদর্শনী—১৩তম আন্তর্জাতিক আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় আলোকচিত্র প্রদর্শনী (আইআইইউপিই)।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি আর্ট অ্যান্ড ফটোগ্রাফি ক্লাবের (এনএসইউএপিসি) শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন বিশ্বের ৪৮টি দেশের ৩৫২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩৬ জন আলোকচিত্রী। প্রতিযোগিতায় মোট ১৭ হাজার ৭৫০টি ছবি জমা পড়ে।
মোট আট ক্যাটাগরিতে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। অ্যাস্ট্রো, আর্কিটেকচার, কনসেপচুয়াল, লাইফ, স্ট্রিট, প্রোর্ট্রেট, ল্যান্ডস্কেপ অ্যান্ড ন্যাচার, অ্যারিয়াল ও ফটোস্টোরি। আট ক্যাটাগরিতে যথাক্রমে চ্যাম্পিয়ন হন মাহমুদুর রহমান, মাশিয়াত ফাইরুজ মারিয়া, ইফতেখারুল ইসলাম, সাব্বির ইসলাম, সাদমান সাকিব অনিন্দ্য, পুলক শিকদার, ইমু খাতুন, সিফাত তানজিম রহমান ও মো. তাওহীদুর রশিদ।

প্রতিযোগীদের জমা দেয়া ছবিগুলো ছিল বৈচিত্র্যে ভরপুর। যার কোনোটিতে প্রতিফলিত হয়েছে জীবনের সরলতা, কোনোটিতে তুলে ধরা হয় সমাজের বাস্তবতা। আবার কোনোটিতে দর্শকরা মুগ্ধ হয় বিমূর্ত শিল্পের সংজ্ঞায়। প্রতিটি ছবির পেছনে লুকিয়ে ছিল শিল্পীর শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি, অনুভূতি আর সৃজনশীলতা। ফলে এ প্রতিযোগিতা গল্প বলার অনবদ্য এক উৎসব হয়ে ওঠে।
এ প্রতিযোগিতার অন্যতম বিশেষত্ব ছিল এটি একাডেমিক গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। বরং শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিভা প্রদর্শনের পাশাপাশি বিশ্বমানের ফটোগ্রাফারদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পান। এবারের আসরের মূল প্রদর্শনী বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের আরো চারটি দেশে অনুষ্ঠিত হয়।
নেপালের সিদ্ধার্থ আর্ট গ্যালারি, অস্ট্রেলিয়ার স্টুয়ার্ট ইউনিভার্সিটি, ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির এক্সিবিশন সেন্টারে প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি ভেন্যুতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় ছিল লক্ষণীয়। শিল্পের প্রতি ভালোবাসা, ফটোগ্রাফির প্রতি আকর্ষণ এবং ভিজুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের প্রতি মুগ্ধতা যেন মানুষের পদচারণায় স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
ক্লাবের সভাপতি জামিউর রহমান বলেন, ‘অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা সহজ ছিল না। আয়োজনটি দেশের বাইরে নিয়ে যেতে পেরে অত্যন্ত গর্বিত। এতে করে আন্তঃদেশীয় সংস্কৃতি বিনিময়ের সুযোগ আরো বেড়েছে। এ ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা থাকবে। সবার সমর্থনের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।’
এ বিশাল আয়োজনকে সফল করতে বিচারক প্যানেলে ছিলেন তিনজন বিশ্বমানের আলোকচিত্রী। তারা হলেন আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী আন্দ্রে বিরাজ, এপিএফ ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও লাইকা ক্যামেরার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর রোহিত বোহরা, টিটিএলের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বনামধন্য ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী সৌদ আল ফয়সাল। তাদের বিচক্ষণ দৃষ্টি ও অভিজ্ঞ মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগীদের ছবি বিচার করা হয় সৃজনশীলতা, টেকনিক্যাল দক্ষতা, গল্প বলার ক্ষমতা ও প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে।

ক্লাবের উপদেষ্টা স্থাপত্য বিভাগের প্রভাষক একেএম সালেহ আহমেদ অনিক বলেন, ‘এ অর্জন এনএসইউএপিসির সদস্যদের অটল নিষ্ঠা, আবেগ এবং অধ্যবসায়ের প্রমাণ। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা জাতীয় মঞ্চ থেকে এটাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে ভূমিকা রেখেছে। উপদেষ্টা হিসেবে, এ বিবর্তন প্রত্যক্ষ করা এবং সৃজনশীল সীমানা অতিক্রম করতে দেখা সৌভাগ্যের বিষয়।

সম্প্রতি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত গ্র্যান্ড ফাইনাল ছিল এ মহোৎসবের এক অনবদ্য সমাপ্তি। প্রতিযোগীদের উচ্ছ্বাস, দর্শকদের প্রশংসা আর বিচারকদের অনুপ্রেরণায় এবারের আইআইইউপিই হয়ে ওঠে ফটোগ্রাফির বিশ্বমঞ্চে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
গ্র্যান্ড ফাইনালে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এনএসইউ উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী বলেন, ‘ফটোগ্রাফি কেবল একটি শিল্প নয়, এটি একটি প্রতিবাদ, এটি একটি অনুভূতি, এটি সময়ের গল্প বলা।

ক্যামেরার লেন্স কেবল একটি যন্ত্র নয়; এটি একটি দৃষ্টি, একটি দর্শন, একটি চিন্তাধারা, যা সময়কে ধরে রাখতে পারে, সমাজকে প্রতিফলিত করতে পারে। মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে নাড়া দিতে পারে। ভবিষ্যতে আরো বৃহৎ পরিসরে আয়োজনের স্বপ্ন নিয়ে, আইআইইউপিই বিশ্ব ফটোগ্রাফির নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পথে এগিয়ে চলেছে।










