বিশ্ববিদ্যালয় জীবন মানেই নতুন স্বপ্ন আর সম্ভাবনার হাতছানি। কিন্তু এ যাত্রাপথে শিক্ষার্থীদের সামনে আসে নানা ধরনের মানসিক চ্যালেঞ্জ। পড়ালেখার চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, পারিবারিক ও সামাজিক চাপ—সব মিলিয়ে অনেক শিক্ষার্থীই মানসিকভাবে ভীষণ চাপের মধ্যে পড়ে যান। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর একজন কোনো না কোনো মাত্রার মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। উদ্বেগ, হতাশা, অনিদ্রা, আত্মবিশ্বাসের অভাব—এসব সমস্যা তাদের শিক্ষাজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কর্মক্ষেত্রের নানা চাপ ও দুশ্চিন্তার সম্মুখীন হন। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উত্তরা ইউনিভার্সিটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। তারা চালু করেছে একটি বিশেষ মেন্টাল হেলথ ইউনিট, যা শিক্ষার্থী শিক্ষক ও কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য কেবল ভালো ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িত সবার সামগ্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে সেই সাফল্য পূর্ণতা পায়। একজন মানসিকভাবে সুস্থ শিক্ষকই ভালোভাবে পাঠদান করতে পারেন, সুস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দক্ষতার সঙ্গে প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করতে পারেন, আর মানসিকভাবে শক্তিশালী শিক্ষার্থীরাই ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা রাখেন। উত্তরা ইউনিভার্সিটির এ মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিটটি সবার জন্য একটি নিরাপদ ও সহানুভূতিপূর্ণ প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। এখানে অভিজ্ঞ সাইকোলজিস্টরা অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি সেবা প্রদান করেন।

উত্তরা ইউনিভার্সিটির মেন্টাল হেলথ ইউনিটটি বহুমুখী কার্যক্রমের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যের সেবা নিশ্চিত করছে। এসব কার্যক্রমের অন্যতম হলো কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি, যেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যক্তিগত কাউন্সেলিং সেশন দেয়া হয়।

সচেতনতা বৃদ্ধিতে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন সেমিনার ও ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন। এছাড়া পিয়ার কাউন্সেলিং এবং সাপোর্ট গ্রুপ কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা একে অন্যের কাছ থেকে সমর্থন পান। পাশাপাশি জরুরি মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সহায়তা ও সঠিক দিকনির্দেশনাও দেয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান, পারিবারিক ঝগড়া ও প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তিনি আত্মহত্যার মতো খারাপ চিন্তা করতেন। মেন্টাল হেলথ ইউনিটের কাউন্সেলিং তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করেছে। আরেক শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমি অল্পত্বেই খুব রেগে যেতাম। রেগে গেলে গালাগালি থেকে শুরু করে যেকোনো খারাপ কাজ করতে পারতাম। কাউন্সিলরদের কাছ থেকে পরামর্শ শোনার পর জীবনে পরিবর্তন এসেছে ও কয়েকটি ব্যায়াম নিয়মিত করার পর এখন আমি অনেকটা স্বাভাবিক আছি। রাগ উঠলেও নিজে নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।’

উত্তরা ইউনিভার্সিটির মেন্টাল হেলথ ইউনিটের অ্যাসিস্ট্যান্ট কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট আফসানা নাজনীন জিছিয়া বলেন, ‘এ উদ্যোগটি একটি শক্তিশালী ও সুস্থ শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ইউনিটটি শুধু মানসিক সমস্যা সমাধানই করে না, বরং সুস্থ ও ইতিবাচক মানসিকতা গঠনেও সাহায্য করে। মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নের মাধ্যমে একটি বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে তারা শুধু একাডেমিক দিক থেকেই সফল হবে না, বরং ব্যক্তিগত জীবনেও আত্মবিশ্বাসী ও সুখী হয়ে উঠবে।’