গন্তব্যে পৌঁছানোর বাহন বাস। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে বাস শুধু পরিবহনই নয়, হাজারো স্মৃতির বাহন। ক্যাম্পাসে যাওয়া আর ফেরার মাঝে শিক্ষার্থীদের বাসই যেন হয়ে ওঠে গান, গল্প আর আড্ডার মঞ্চ। বাস নিয়ে যেমন তাদের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আর স্মৃতির শেষ নেই, তেমনি বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলোর নামকরণেরও রয়েছে ভিন্ন এক গল্প।
আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পক্ষে ডাকসু নেতারা রাষ্ট্রপতি বরাবর বাস চেয়ে আবেদন করেন। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮০ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ করতে সাতটি বাস উপহার দেন। বাসগুলো আনন্দ, তরঙ্গ, কিঞ্চিৎ ও ক্ষণিকা নামে ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী এলাকায় ১৯৮১ সালে চলতে শুরু করে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর বিভিন্ন রুটে ১৭টি নামে বাস চলাচল করছে। সাহিত্যকর্ম, বাংলায় বারো মাসের নামে, বরেণ্য ব্যক্তি, নদীর নামে নামকরণ করা হয়েছে এসব বাসের। ঢাবির বাসগুলো বৈশাখী, হেমন্ত, শ্রাবণ, চৈতালী, ফাল্গুনী, বসন্ত, মৈত্রী, ঈশা খাঁ, উল্লাস, ইদ্রাকপুর, শীতলক্ষ্যা, উয়ারী বটেশ্বর, মাওয়া ইত্যাদি নামে বিভিন্ন রুটে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছুটে চলে গন্তব্যে।

আশির দশকেই শিক্ষার্থীদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে রুট সংখ্যা বাড়াতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহন পরিষদ নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন, যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তৎকালীন ছাত্রনেতা অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া। তিনি বলেন, আমরা শুরুর চারটি রুটের নাম দিই। তবে এ অল্প কয়েকটি বাসে শিক্ষার্থীদের চাহিদা পূরণ হচ্ছিল না। তাই শিক্ষার্থীদের সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিতে আরো বেশি রুট ও বাসসেবা চালু করতে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় বরাবর দাবি উত্থাপন করতে থাকি। দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেশ কয়েকটি ব্যাংকের সৌজন্যে আরো কিছু রুট চালু হয়। পরবর্তী সময়ে পরিবহন পরিষদের উদ্যোগেই ১৯৮৯ সালে ডাকসুতে প্রথম পরিবহন সম্পাদক পদ সৃষ্টি করা হয় বলে তিনি জানান।
বলা হয়ে থাকে নামে কী আসে-যায়! নামে হয়তো খুব একটা আসে-যায় না। কিন্তু নামেই আবার অনেক কিছুই। একটি নির্দিষ্ট নামে এক চিত্র রূপায়িত হয় আমাদের মনে। বেসরকারি বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) বাসগুলোর নামকরণ বাংলাদেশের বিখ্যাত নদীগুলোর নামে, যা দেশের সমৃদ্ধ নদী ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রতিটি বাসের নামকরণ করা হয়েছে প্রধান নদীগুলোর নামানুসারে, যেমন— তুরাগ, সুরমা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলী, তিস্তা ইত্যাদি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়টি তুরাগ নদের তীরে অবস্থিত হওয়ায় এ নামকরণ আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তৈরি পোশাক খাতের বিশেষায়িত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে ৪০টি বাস। বাসগুলো গোমতী, আত্রাই, রূপসা, মধুমতী, সুগন্ধা, কর্ণফুলী, ধলেশ্বরী, মহানন্দা, করতোয়া, বুড়িগঙ্গা, তেঁতুলিয়া, কপোতাক্ষ, ইছামতী, শীতলক্ষ্যা, ভৈরব, চিত্রা, তিতাস, তিস্তা, মাতামুহুরী, কীর্তনখোলা, আড়িয়ল খাঁ, সন্ধ্যা, কাজলা ইত্যাদি নদীর নামে নামকরণ করা হয়েছে।

বিইউএফটির উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. ইঞ্জিনিয়ার আইয়ুব নবী খান বলেন, ‘এ নামকরণের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশের ভূগোল ও নদ-নদীর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং তাদের ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলা। নদীগুলো বাংলাদেশের পরিবহন, কৃষি, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।’
বিইউএফটির বাসগুলোর এ নামকরণ শিক্ষার্থীদের নানাভাবে দেশের নদীগুলোর তাৎপর্য অনুধাবন করতে সহায়তা করে। এ ঐতিহ্যবাহী নামকরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সংযোগ স্থাপন করেছে, যা বিইউএফটির পরিচয়কে আরো সমৃদ্ধ করেছে।
ধান-নদী-খাল এই তিনে বরিশাল। বরিশালের বুক চিরে বয়ে চলেছে অসংখ্য নদী। এ নদীর নামেই নামকরণ করা হয়েছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলো। বিশ্ববিদ্যালয় ও বরিশাল শহরের তীরঘেঁষে বয়ে যাওয়া কীর্তনখোলা নদীর নামে নামকরণ করা হয়েছে কীর্তনখোলা নামে একটি বাস। ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে’ জীবনানন্দের সেই ধানসিড়ি নদীর নামেও নামকরণ করা হয়েছে বাসের। বরিশাল-ভোলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ইলিশা নদীর নামে রয়েছে শিক্ষকদের জন্য একটি মিনিবাস। এছাড়া রয়েছে লতা, পায়রা, বৈকালি, চিত্রা, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, আন্ধারমানিক, আগুনমুখা, নয়াভাঙ্গানী প্রভৃতি। এগুলো সবই বরিশালের নদ-নদী।
দেশের সর্ববৃহৎ ফুল উৎপাদন কেন্দ্র যশোর। ফুলের রাজধানী হিসেবে খ্যাতি আছে জায়গাটির। ফুলের এ বিশেষত্বকে গুরুত্ব দিয়ে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বাসগুলোর নামকরণ করেছে শিমুল, টগর, চামেলি, গোলাপ ইত্যাদি ফুলের নামে। এছাড়া চিত্রা ও নবগঙ্গা নদীর নামেও রয়েছে দুটি বাস।
ঢাকার পূর্বাচলে অবস্থিত বেসরকারি স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলোর নামও ঠিক করা হয়েছে দেশীয় ফুলের নামে। কোস্টার বাস ছাড়া বাকি ৩১টি বাসের নামকরণই ফুলের নামে। এগুলো হলো শ্বেতকাঞ্চন, মহুয়া, নীলকণ্ঠ, স্বর্ণচাঁপা, করবী, গন্ধরাজ, জবা, শাপলা, চন্দ্রমল্লিকা, বেলী, নিশিন্দা, রঞ্জনা, মধুমঞ্জুরী, দোলনচাঁপা, দোপাটী, টগর, রজনীগন্ধ্যা, মালতী, শালুক, কাঠগোলাপ ও শিমুল। এছাড়া পদ্ম, মাধবীলতা, জুঁই, কৃষ্ণচূড়া, রঙ্গন, নয়নতারা, অপরাজিতা, হাসনাহেনা নামে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব বাস।
এসইউবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নওজিয়া ইয়াসমীন বলেন, ‘বিশ্বায়নের এ যুগে আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলতে বসেছি, যেমন- ফুল, ফল ইত্যাদির নাম আমরা ঠিকমতো বলতে পারি না। তাই আমরা আমাদের বাসের নামগুলো ঠিক করেছি ফুলের নামে। এতে আমাদের শিক্ষার্থীরা যেমন এ নামগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে, তেমনি আমরাও আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব বছরের পর বছর।’










