কোটা সংস্কার আন্দোলনের জেরে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর সরকারবিহীন সময়ে আশার আলো জ্বালিয়েছেন তরুণরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ আন্দোলনের শুরু হলেও জাতীয় পর্যায়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক অংশগ্রহণ ছিল এক বিস্ময়কর চিত্র। সংসদ ভবন পরিষ্কার, শহরের পরিচ্ছন্নতা, দেয়ালে রঙিন গ্রাফিতি ও ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়া—সব কাজেই ছিল তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন সড়কে যখন ট্রাফিক পুলিশ নেই তখন ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণে অন্যতম মুখ্য ভূমিকায় দেখা দেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। শুধু তারাই নয়, এ কাজে অংশ নিয়েছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কলেজ, ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরাসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। শহরে যান চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে রাস্তায় ছিলেন শিক্ষার্থীরা। তাদের কেউ কেউ যানবাহনগুলোকে নির্দেশনা দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ লোকজনকে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহারের অনুরোধ জানাচ্ছেন। কাজ করছেন জনসচেতনতায়।
ঢাকার কুড়িল বিশ্বরোড থেকে বাড্ডা-নতুন বাজার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫০ জন শিক্ষার্থী। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেসের শিক্ষার্থীরা নিয়ন্ত্রণ করছেন এ এলাকার ট্রাফিক।
কুড়িল বিশ্বরোড থেকে বাড্ডা-নতুন বাজার পর্যন্ত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে কাজটি করেছেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল ইমরান। তিনি জানান, ‘সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কাজ করছি। ট্রাফিক রুলস, ফুটপাথ ব্যবহার মানুষকে বোঝাতে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। অনেকেই বিষয়গুলো ভালোভাবে নিচ্ছেন, আবার অনেকে খারাপ ব্যবহারও করেছে। মানুষ যে যার মতো করে আমাদের পানি ও শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করছে, আবার আমরা নিজেরাও নিজেদের খাবারের ব্যবস্থা করেছি। এটি একটি সম্মিলিত প্রয়াস।’ নতুন বাজার থেকে রামপুরা এরিয়ায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি, ইমপেরিয়াল কলেজসহ কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা।
ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করা ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ বলেন, ‘গত মঙ্গলবার থেকে রামপুরা বনশ্রী, হাতিরঝিল, মধ্য বাড্ডা, আফতাবনগর এলাকায় আমরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি। আমরা চেষ্টা করেছি ট্রাফিকের বিভিন্ন নিয়ম সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে। সবার কাছ থেকে ভালো সাড়া পেয়েছি।’
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, পান্থপথ, ফার্মগেট এলাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক ও সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা। সঙ্গে ছিলেন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবকরা। এসব এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কাজের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের সমন্বয় করেছেন এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির বিবিএর শিক্ষার্থী সাদাত। তিনি বলেন, ‘ট্রাফিক, ক্লিনিং ও গ্রাফিতি এ তিনটি ভাগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবী হয়ে কাজ করেছেন। আমি ট্রাফিকের কাজটিতে সমন্বয় করেছি। প্রচলিত নিয়মে চলতে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গেছে। রিকশা, বাইক, প্রাইভেট কার সঠিক লেনে চলছে না। আমরা এ ব্যাপারে সচেতনতার কাজ করেছি।’
কারওয়ান বাজার, পান্থপথ, ফার্মগেট এলাকা ছাড়াও বাংলা মোটর, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শহীদ মিনার এলাকা, নীলক্ষেত মোড়, পান্থপথ ও ধানমন্ডি-২৭, বিজয় সরণি, ডেমড়া কোনাপাড়া এলাকায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির ২০টি টিম। এছাড়া ক্লিনিং ও গ্রাফিতির জন্যও কাজ করেছে আলাদা তিনটি টিম।
কারওয়ান বাজারে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী যুবায়ের ভূঁইয়া যুবরাজ বলেন, ‘সবার অংশগ্রহণে আমরা কাজগুলো করছি। সাধারণ মানুষও আমাদের সহায়তা করেছে। কেউ মাস্ক, ছাতা, পানি, জুস ও অন্যান্য খাবার দিয়ে যাচ্ছে। সবাই আমাদের এ কাজে উৎসাহ দিচ্ছেন।’ মহাখালী এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে পরিচ্ছন্নতা, যানবাহনের চলাচলে শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করেন ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি, আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ পাঁচটি কলেজের শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের এ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কাজটি কতদিন চলবে জানতে চাইলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস কার্যক্রম শুরু হলে আর রাস্তায় থাকা যাবে না। ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব নিলে হয়তো আর দু-একদিন রাস্তায় থাকা হতে পারে। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেবেন শিক্ষার্থীরা। দেশের প্রয়োজনে যেকোনো সময়ে রাজপথে নেমে আসতে চান তরুণরা।










