২০১৫ সালের ৫ মে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় গুটিকয়েক স্বপ্নবাজ তরুণের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি কুইজ সোসাইটি’। শুরুতে এটি ছিল একটি সাদামাটা গোষ্ঠী। তবে ইচ্ছার ছিল অসীম আকাশ। সেই ইচ্ছাশক্তির দ্বারাই একত্র হয়েছিল সৃজনশীলতা ও উদ্যোগের এক মনোমুগ্ধকর স্রোত। তাই মাত্র ২০ জন সদস্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটির বর্তমান সদস্য পাঁচ হাজারেরও অধিক। প্রায় এক দশকের পথচলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে দেশব্যাপী ৩০০ স্কুল-কলেজ এবং ৫৮টি কোলাবরেটর, করপোরেট এবং স্কিল ডেভেলপমেন্ট সংগঠনের সঙ্গে যৌথভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি, প্রতিযোগিতা, ইভেন্ট পরিচালনার মাধ্যমে নিজেদের প্রতিভা ও উদ্যমের প্রকাশ ঘটাচ্ছে, যা নিত্যদিন নতুন সদস্যদের জন্য জ্ঞানার্জনের দ্বার উন্মুক্ত করে চলেছে। এছাড়া এ অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের একমাত্র ক্লাব হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল কুইজ অ্যাসোসিয়েশনের নিবন্ধন পেয়েছে।

সময়ের পরিক্রমায় দক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে ক্লাবটি হয়ে উঠেছে সুসংগঠিত, সমৃদ্ধ, শক্তিশালী ও পরিণত। ২০১৬ সালে ক্লাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত হয়। আনুষ্ঠানিক সংবিধানও পাস হয় একই বছরেই। জিয়া হল কুইজ ক্লাবের মধ্য দিয়ে ওই বছরেই আটটি হলে কুইজ ক্লাবের হলভিত্তিক কার্যক্রম শুরু হয়। তখন থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি বুধবার হয়ে আসছে বিবিধ বিষয়ের ওপর সাপ্তাহিক সেশন, যেখানে ক্লাবের দক্ষ কুইজ মাস্টাররা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশ্ন উত্তর পর্বের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানচর্চার প্রতি আগ্রহ তৈরির চেষ্টা করে আসছেন। ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো ক্লাবটি ন্যাশনাল ফেস্টের আয়োজন করে, যা ছিল ক্লাবটির বিকাশের পথে একটি মাইলফলক। ২০১৯ সালে টিএসসিতে ক্লাবের কার্যালয় স্থাপন করা হয়। ২০২০ সালে শুরু হয় কুইজিং ওয়ার্কশপ, যেখানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর পরিণত কুইজার ও কুইজমাস্টার হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

সবকিছু বেশ গতিশীলতার সঙ্গে চললেও হঠাৎ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে কভিড-১৯ মহামারী। তবু থেমে যায়নি কুইজ সোসাইটি। সে সময় ক্লাবটির পুরো সেটআপ অনলাইনে ট্রান্সফার করা হয়। যদিও তা ছিল বিরাট এক চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার, তবে তৎকালীন সদস্যদের উদ্দীপনা ও কর্মতৎপরতায় অল্প সময়ের মধ্যেই তা সম্ভব হয়েছিল। ওই রকম পরিস্থিতির মধ্যেও সে বছর অক্টোবরে নামানো হয় ন্যাশনাল ফেস্ট, যা ছিল সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক একটি কার্যক্রম। এ বিপ্লবী উদ্যোগের মাধ্যমে ক্লাবটির কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।

২০২১ সালে দুবার রিক্রুটমেন্ট কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে একটি ছিল বিশেষ রিক্রুটমেন্ট। সে বছর ডিসেম্বরে টিএসসিতে প্রথম বিভাগভিত্তিক ইন্ট্রা-কুইজ ফেস্ট নামানো হয়। সময়ের সঙ্গে যেহেতু ক্লাবের পরিধি আরো বড় হতে থাকে তাই কার্যক্রমেও আসতে থাকে পরিবর্তন। ২০২২ সালে ফেব্রুয়ারিতে কুইজ সোসাইটি উইংভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করে, যেখানে ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন উইং তাদের নিজস্ব উইং মেম্বারদের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে ক্লাবের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে থাকে। ২০২৩ সাল থেকে নবীনদের কুইজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু হয়েছে নোবিশ কুইজ। সর্বশেষ চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর ব্যাপক পরিসরে এবং সফলভাবে আয়োজন করা হয় ‘শ্রাবণ বিপ্লব কুইজ’। ন্যাশনাল ফেস্ট ছাড়াও কুইজ সোসাইটি প্রতি বছর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, স্পোর্টস কুইজ, পপ ব্যাটেল প্রভৃতি।

এ বিশ্বে যত হতাশা, তত আলো, তত আশা—কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই আশার হাত ধরেই ক্লাবটির পথচলা শুরু হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সাধারণ সম্পাদক মোহতাসিন বিল্লাহ ইমন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের ক্লাবের রয়েছে অভূতপূর্ব এক যাত্রা, যেখানে বিভিন্ন কার্যক্রম যোগ করেছে নতুন মাত্রা, দিয়েছে দিশা, অন্ধকারের শেষে দেখিয়েছে সাফল্যের উজ্জ্বল প্রভা।’ নবীনদের উদ্দেশে ইমন বলেন, ‘আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে ক্লাবটি নতুন সদস্যদের অনুপ্রাণিত করবে। সদস্যদের উদ্যম, মেলবন্ধন ও নানাবিধ কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে আমরা একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও এবং উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাব।’