সম্প্রতি ইরান-ইসরায়েলের মাত্র ১২ দিনের যুদ্ধ। কিন্তু স্বল্প সময়ের সংঘাত ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী ব্যাহত হয়েছে বাণিজ্য, উড়োজাহাজ চলাচলের পথ বদলাতে হয়েছে। এর কিছুদিন আগে উপমহাদেশের দুই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পূর্ণমাত্রার হামলা-পাল্টাহামলা ও সীমান্ত সংঘাতে বড় ধরনের সামরিক ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে দুই দেশ। অর্ধশতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষে জড়ায় ভারত ও পাকিস্তান। যুদ্ধ যে দেশেই হোক, উত্তেজনা ছড়িয়ে যায় বহির্বিশ্বে। স্বার্থের সংঘাতে পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন কূটনীতি থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্র, সমাজ থেকে ব্যক্তিজীবন—সর্বত্রই শান্তির সন্ধান চলে।

মানব ইতিহাসের পাতায় পাতায় লুকিয়ে আছে শান্তি ও সংঘর্ষের গল্প। কখনো অস্ত্রের ঝনঝনানি, কখনো বা মৈত্রীর মেলবন্ধন—দুইয়ের মধ্যেই মানবজাতির অস্তিত্বের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ পেয়েছে। শান্তি কি কেবল স্বপ্ন, নাকি তা অর্জনের পথে সংঘর্ষ অনিবার্য? সংঘাতের আগুনে পুড়ে পুড়েই কি শান্তির সুর সৃষ্টি হয়? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে শান্তি ও সংঘর্ষ নিয়ে অধ্যয়ন শুধু ইতিহাসের পাঠ নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধের এক গভীর অন্বেষণ। সবাই বলি, আমরা যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন এ শান্তি ও সংঘর্ষ নিয়েই কেউ কেউ স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমনকি পিএইচডি পর্যন্ত করছেন? হ্যাঁ, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্বতন্ত্র একাডেমিক ডিসিপ্লিন। এ বিষয়ে পড়াশোনা করে শিক্ষার্থীরা শুধু নিজের ক্যারিয়ারই গড়েন না, বরং সমাজ ও বিশ্বের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন একটি আন্তঃবিষয়ক প্রচেষ্টা, যার লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত প্রতিরোধ, উত্তেজনা হ্রাস এবং সমাধান করা। বর্তমান বিশ্বে নানা সংঘর্ষ ও সংকটে জর্জরিত অবস্থায় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশেও সাম্প্রদায়িকতা, রাজনৈতিক সহিংসতা, উদ্বাস্তু সমস্যা এবং সীমান্তে উত্তেজনার মতো সমস্যাগুলো প্রমাণ করে যে সংঘর্ষ কখনো হঠাৎ করে হয় না। এটি গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে, উপেক্ষিত সমস্যা থেকে। আর তার সমাধান হয় জ্ঞান, আলোচনার দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে।

শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের একটি আন্তঃবিষয়ক স্বতন্ত্র সাবজেক্ট। এখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, দর্শন, আইন, ভূগোল, অর্থনীতি, ইতিহাস, লিঙ্গ অধ্যয়ন এবং উন্নয়ন অধ্যয়নসহ নানা শাখার জ্ঞান একত্রিত হয়েছে। পাঠ্যক্রমে পড়ানো হয় সংঘর্ষের কারণ, সংঘর্ষ তত্ত্ব, সংঘর্ষ ব্যবস্থাপনা ও রূপান্তর, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক আইন, সহিংসতার প্রকারভেদ ও বিশ্লেষণ, মধ্যস্থতা ও আলোচনা কৌশল এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন ইত্যাদি। এ বিষয়ে পড়াশোনা করে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত প্রতিরোধ, উত্তেজনা হ্রাস এবং সমাধান করার দক্ষতা অর্জন করে।

বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়নে (পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ) স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল এবং পিএইচডি ডিগ্রি লাভের সুযোগ রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগেও এ বিষয়ে ৪ ক্রেডিটের একটি কোর্স রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে বিভিন্ন কোর্স চালু রয়েছে। বর্তমান সময়ে বিদেশে এ বিষয়ের চাহিদা ব্যাপক। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো যেমন নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ডে নানা ধরনের স্কলারশিপ প্রোগ্রামে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করে গ্র্যাজুয়েটদের সরকারি, বেসরকারি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কূটনৈতিক সংস্থা এবং মানবাধিকার সংস্থা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্র্যাক, বিআইএসএস, আশা বাংলাদেশ, কেয়ার বাংলাদেশ, প্রশিকা, অক্সফাম বাংলাদেশের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জাতিসংঘ এবং এর অঙ্গসংগঠন যেমন ইউএনডিপি, ইউনিসেফ, ইউএনএইচসিআর, ইউনিফেম, আইওএম এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে কাজের সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে পড়াশোনা করে একজন গ্র্যাজুয়েট বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞতা অনুসারে লাখ টাকার বেশি বেতনের চাকরি পেতে পারেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে ডলারে আয় করার সুযোগও রয়েছে।

আরুশা বিনতে আমির

শিক্ষার্থী, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়