দেশে ডিজিটালাইজেশনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে সাইবার হুমকি। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে সব ধরনের প্রতিষ্ঠান কেউই এর বাইরে নয়। ভার্চুয়াল জগতে সাইবার নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে একটি। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এ ঝুঁকি দিন দিন আরো জটিল ও ব্যাপক হয়ে উঠছে। হ্যাকিং, ডাটা চুরি এবং অন্যান্য সাইবার নিরাপত্তা ব্যর্থতা বিশ্ব অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলছে। ব্যক্তি জীবন ও সামাজিক জীবন বিষিয়ে তুলছে। সাইবার নিরাপত্তা এখন প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশই কাটে সাইবার স্পেসে বা অনলাইনে। আবার প্রায় সব ধরনের কাজ ও পরিষেবাও এখন অনলাইননির্ভর। তাই ব্যক্তিগত তথ্য থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিংবা গ্রাহকের ডাটার সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় তৎকালীন গভর্নর বলেছিলেন সাইবার আক্রমণে এ বিপুল টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বড় ধরনের সাইবার হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাইরেও দেশের নানা সেক্টরে নিয়মিত সাইবার হামলার ঘটনা ঘটে। ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি ও সাম্প্রতিক সাইবার হামলার সতর্কতা প্রমাণ করে এ খাতে দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে।
সাইবার সিকিউরিটি ভেঞ্চারস অনুসারে বিশ্বব্যাপী সাইবার সিকিউরিটি চাকরির শূন্যপদ ৩৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বজুড়ে প্রায় সাড়ে তিন মিলিয়ন সাইবার নিরাপত্তায় চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। ডিজিটাল মুদ্রা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ চাহিদা বৃদ্ধির ফলে সাইবার নিরাপত্তা পেশাদারদের আয়ের সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বেশির ভাগ চাকরিজীবীর গড় বার্ষিক বেতন ছয় অংকের বেশি, যা এ ক্ষেত্রটিকে আর্থিক দিক থেকেও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। যদিও বাংলাদেশে একজন ফ্রেশার ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকেন।
অতীতে আইনজীবী, ডাক্তার, নার্স, ব্যাংকার এবং শিক্ষকতার মতো পেশাগুলো কর্মবাজারে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এ পেশাগুলোর প্রধান আকর্ষণ ছিল চাকরির নিরাপত্তা। বর্তমানে নতুন শিল্প খাতগুলোয় প্রায়ই অনিশ্চয়তা দেখা যায়, কিন্তু সাইবার নিরাপত্তা এখন ‘চাকরির নিরাপত্তা’-এর সমার্থক হয়ে উঠেছে। সাইবার নিরাপত্তা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম এবং এ চাহিদা আগামী দিনগুলোয় আরো বাড়বে। সাইবার নিরাপত্তা শিল্পে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য এখনই সঠিক সময়। বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি, আর্থিক সুবিধা, চাকরির স্থায়িত্ব এবং বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়ে সাইবার নিরাপত্তা ভবিষ্যতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও প্রভাবশালী পেশাগুলোর মধ্যে একটি।
যদিও দেশে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ে ডিগ্রি নেই। তবে বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি ডিগ্রি দেয়া হয়। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সাইবার সিকিউরিটির পাঠ্যক্রম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। আইটি ও নন-আইটি ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যক্রম আলাদা। আবার কিছু কোর্স রয়েছে যেগুলো বাধ্যতামূলক। ঐচ্ছিক যেসব কোর্স রয়েছে সেখান থেকে নিজের পছন্দ অনুযায়ী কোর্স নেয়ার সুযোগ রয়েছে।
সাইবার সিকিউরিটি ডিগ্রিতে আপনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পড়বেন, যেমন ডাটা বিশ্লেষণ, প্রোগ্রামিং বা স্ক্রিপ্টিংয়ের মৌলিক ধারণা, সাইবার ডিফেন্স, সাইবার থ্রেটস, নিরাপত্তার মৌলিক নীতি, তথ্য সুরক্ষা মৌলিকতা, ক্রিপ্টোগ্রাফির পরিচিতি, আইটি সিস্টেমের উপাদান, নেটওয়ার্কিং ধারণা, নীতি, আইন, নৈতিকতা, সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইত্যাদি।
এছাড়া আধুনিক নেটওয়ার্কিং পদ্ধতি, নেক্সট-জেনারেশন ইন্টারনেট, স্টেগানোগ্রাফি, ওয়েব সার্ভিস সিকিউরিটি, নেটওয়ার্ক পেরিমিটার সিকিউরিটি, ব্লক চেইন ও ক্রিপ্টো কারেন্সি, ক্লাউড সিকিউরিটি, সাইবার ক্রাইম ও সাইবার টেরোরিজম, সাইবার সিকিউরিটি স্ট্যান্ডার্ডস, গভর্ন্যান্স ও ম্যানেজমেন্ট, ক্লাউড কম্পিউটিং, অ্যাডভান্সড নেটওয়ার্ক সার্ভিসেস ও ম্যানেজমেন্ট, ইন্টারনেট আর্কিটেকচার ও প্রটোকল, ইন্টারনেট অব থিংস, বিগ ডাটা, নেটওয়ার্ক সিকিউরিটি মনিটরিং, সিকিউরিটি ইভ্যালুয়েশন ও অ্যাসেসমেন্ট মেথডোলজি, নেটওয়ার্ক ডিফেন্স ও কাউন্টার-মেজারস, অ্যাডভান্সড কম্পিউটার কমিউনিকেশনস ও নেটওয়ার্কস ইত্যাদি কোর্স পড়ানো হয়। মাস্টার্স ডিগ্রিতে ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং, ক্লাউড কম্পিউটিং, ক্রিপ্টোগ্রাফি ইত্যাদি জটিল বিষয়গুলোতেও দক্ষতা লাভ করবেন। ভালো দক্ষতা অর্জন করতে পারলে ডিগ্রি শেষে লুফে নিতে পারবেন ভালো চাকরিও। পড়াশোনা শেষে সাইবার সিকিউরিটি বিশ্লেষক, এথিক্যাল হ্যাকার/পেনিট্রেশন টেস্টার, কম্পিউটার ফরেনসিক ইনভেস্টিগেটর, আইটি সিকিউরিটি কনসালট্যান্ট, অ্যাপ্লিকেশন সিকিউরিটি ইঞ্জিনিয়ার, ক্লাউড সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট, ইনফরমেশন সিকিউরিটি অডিটর, নেটওয়ার্ক সিকিউরিটি ইঞ্জিনিয়ার, ইনসিডেন্ট রেসপন্স স্পেশালিস্ট, চিফ ইনফরমেশন সিকিউরিটি অফিসার (সিআইএসও), আইটি রিস্ক ম্যানেজার, আইটি কমপ্লায়েন্স অফিসার, সাইবার সিকিউরিটি গবেষণা বিশ্লেষক ইত্যাদি পদে চাকরির সুযোগ রয়েছে। অ্যাপল, লকহেড মার্টিন, জেনারেল মটরস, ক্যাপিটাল ওয়ান এবং সিসকোর মতো প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি সাইবার বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়েছে।
দেশে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে মেজর হিসেবেও পড়ানো হয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসসি ইন ইনফরমেশন অ্যান্ড সাইবার সিকিউরিটি নামে দেড় বছর মেয়াদি প্রফেশনাল মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) বিএসসি ইন সাইবার সিকিউরিটি প্রোগ্রাম রয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে সরাসরি এমএসসি ইন সাইবার সিকিউরিটি নামে প্রোগ্রাম রয়েছে। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে এমএসসি ইন সিএসই প্রোগ্রামে মেজর হিসেবে সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশে (এআইইউবি) বিএসসি ইন কম্পিউটার নেটওয়ার্ক অ্যান্ড সাইবার সিকিউরিটি প্রোগ্রাম অফার করা হয়। সাইবার সিকিউরিটি সম্পর্কিত কোর্সগুলো কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধীনে পড়ানো হয়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির ইনস্টিটিউট অব কন্টিনিউয়িং এডুকেশনের অধীনে সাইবার সিকিউরিটিতে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা (পিজিডি) প্রোগ্রাম রয়েছে। ইউনিভার্সাল কলেজ বাংলাদেশে (ইউসিবি) সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ল্যাঙ্কাশায়ারের (ইউসিএলএএন) সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে ইউসিবির আওতায় সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে তিন বছরের স্নাতক ডিগ্রি নেয়া যাবে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে, সেখানে কোর্সের বিষয়বস্তু, সময়কাল এবং ভর্তির শর্তাবলি ভিন্ন। তাই আপনার পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ভিজিট করে বা সরাসরি যোগাযোগ করে বিস্তারিত তথ্য জেনে নিতে হবে।










