বহুবর্ষজীবী ধান—যেন নামকরণেই রয়েছে সার্থকতা। এ বিশেষ ধানের বৈশিষ্ট্য হলো একবার রোপণ করলে ধারাবাহিকভাবে পাঁচ বছর পর্যন্ত বছরে দুবার ফসল সংগ্রহ করা যাবে। নতুন করে চারা রোপণ ছাড়াই বহুবার ধান উৎপাদন সম্ভব। চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফেঞ্জাই হু বার্ষিক ধান (Oryza sativa) ও আফ্রিকান ধান বুনো বহুবর্ষজীবী (Oryza longistaminata) এর সংকরায়ণের মাধ্যমে বহুবর্ষজীবী ধানের উদ্ভাবন করেন। তবে এ ধানের জাতটি বাংলাদেশের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চাষাবাদের জন্য পাঁচ বছর গবেষণা শেষে সফলতা পেয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির একদল গবেষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের গবেষকরা চীনের ইউনান ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় বহুবর্ষজীবী ধানের যুগান্তকারী গবেষণা কার্যক্রমে সফল হয়েছেন।
বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। কৃষকদের প্রতি মৌসুমে জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ ও অতিরিক্ত শ্রম ব্যয় বহন করতে হবে না। ফলে কম খরচে, কম শ্রমে ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে অধিক উৎপাদন সম্ভব হবে।
আইইউবিএটি কৃষি গবেষণা স্টেশনে (IARS) পাঁচ বছরের সফল পরীক্ষা শেষে বহুবর্ষজীবী ধানের গবেষণা এখন কৃষকদের মাঠে সম্প্রসারিত পরীক্ষামূলকভাবে চাষ হচ্ছে। এ গবেষণার অর্থায়ন করছে আইইউবিএটির মিয়ান গবেষণা ইনস্টিটিউট। বহুবর্ষজীবী ধান চাষের ক্ষেত্রে প্রথম মৌসুমের ধাপগুলো সাধারণ ধান চাষের মতোই। তবে দ্বিতীয় মৌসুম থেকে ধানের চারা রাইজোম (ভূগর্ভস্থ কাণ্ড) থেকে জন্মায়। ফলে কৃষকদের বীজ কিনতে, বীজতলা প্রস্তুত করা বা চারা রোপণ করতে হবে না। প্রাথমিকভাবে অঙ্কুরোদ্গম শুরু করার জন্য হালকা সেচ প্রয়োজন। অনুকূল পরিবেশে তিন থেকে সাতদিনের মধ্যে গাছগুলো অঙ্কুরোদ্গম হয়। এরপর বাকি চাষ ব্যবস্থাপনা মৌসুমভিত্তিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাধারণ নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়।
প্রথম মৌসুমে বহুবর্ষজীবী জাতগুলো পরিপক্ব হতে ১৪০-১৪৫ দিন লাগে। পরবর্তী মৌসুমগুলোয় প্রায় ১১০-১২০ দিন সময় প্রয়োজন।
গবেষকরা জানান, বহুবর্ষজীবী ধান কেবল উৎপাদন বাড়াবে না, বরং শ্রম ব্যয় কমাবে ৫৮ শতাংশ এবং উৎপাদন খরচ সাশ্রয় করবে ৪৯ শতাংশ। এছাড়া পানি ব্যবহারে সাশ্রয় ঘটাবে, মাটির উর্বরতা ও গুণগত মান বৃদ্ধি করবে এবং গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করবে।
ইউনান বিশ্ববিদ্যালয় ও আইইউবিএটির মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি উপকরণ হস্তান্তর চুক্তির (Material Transfer Agreement) মাধ্যমে আইইউবিএটি পাঁচটি বহুবর্ষজীবী ধানের জাত গ্রহণ করে। ২০১৯ সালের আমন মৌসুমে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে আইইউবিএটিতে বহুবর্ষজীবী ধানের গবেষণা শুরু হয়, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। প্রাথমিক সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আইইউবিএটি কলেজ অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. ফারজানা সুলতানা ও অন্যান্য গবেষকের তত্ত্বাবধানে গাজীপুরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মাঠে ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়।
প্রধান গবেষক ড. ফারজানা সুলতানা বলেন, ‘বহুবর্ষজীবী ধান সামগ্রিকভাবে একটি টেকসই ফসল হিসেবে গণ্য হবে। যদিও গবেষণা পর্যায়ে বছরে দুই বার চাষ করেছি কিন্তু কৃষকদের মাঠে পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা গেছে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বছরে তিনবার ফসল সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে। তবে এটি সফল জোনাল পরীক্ষার পরই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব। এটি কৃষকদের জন্য খরচ কমাবে, শ্রম বাঁচাবে এবং পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মাটির ক্ষয় রোধ, উর্বরতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এটি একটি কার্যকর সমাধান।’
এ গবেষণার সহগবেষক অধ্যাপক ড. খন্দকার শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘বহুবর্ষজীবী জাতগুলো অত্যন্ত সম্ভাবনাময়, বিশেষ করে ফলনের দিক থেকে। পরবর্তী মৌসুমগুলোয় এদের কর্মক্ষমতা প্রায় স্থিতিশীল থাকে।রোগ ও কীটের আক্রমণ সাধারণত সহনীয় এবং কিছু ক্ষেত্রে এ জাতগুলো স্থানীয় উচ্চফলনশীল ধানের চেয়ে ভালো ফলাফল পেয়েছি।’
এ গবেষণা প্রকল্পটির সহগবেষক হিসেবে আরো ছিলেন আইইউবিএটির কলেজ অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফাহিম আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ হোসেন এবং গবেষণা সহকারী হাসান তারেক নাসিম। এছাড়া চীনের ইউনান ইউনিভার্সিটির স্কুল অব এগ্রিকালচার থেকে অধ্যাপক ড. ফেঞ্জাই হু, অধ্যাপক ড. শিলাই ঝাং ও ড. ইউজিয়াও ঝাং এ গবেষণার সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছেন।
গবেষকরা জানান, গবেষণায় সফলতার পর চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে মাঠ পর্যায়ে বহুবর্ষজীবী ধানের চাষ শুরু হয়। এটি চারটি ভিন্ন কৃষি-পরিবেশগত অঞ্চল (AEZ)—গাজীপুর, ফরিদপুর, রাজশাহী ও দিনাজপুরে চারজন কৃষকের তত্ত্বাবধানে চাষ হচ্ছে। বহুবর্ষজীবী ধানের বৃদ্ধি ও ফলন মূল্যায়নের জন্য প্রতিটি স্থানে ১৩ শতাংশ জমিতে তিনটি সম্ভাবনাময় স্থানীয় উচ্চফলনশীল ধানের সঙ্গে চাষ হচ্ছে। এরই মধ্যে বোরো মৌসুমের ধান কাটা হয়েছে এবং দ্বিতীয় মৌসুমের ফসল বর্তমানে ফ্লাওয়ারিং পর্যায়ে রয়েছে।
মাঠ পর্যায়ে ধানের কার্যকারিতা সম্পর্কে ফরিদপুরের কৃষক মো. মাতিনুর রহমান জানান, যেহেতু এটা একবার রোপণ করে একাধিকবার ফলন সংগ্রহ করা যায়, সেক্ষেত্রে চাষ এবং রোপণ খরচ ও শ্রম কমে যাবে, ফলে চাষীর অধিক লাভ নিশ্চিত হবে। একই জমি থেকে তিনবার ধান পাওয়া যাবে। কিছু এলাকায় বোরো-পতিত-বোরো ফসল বিন্যাস বিদ্যমান আছে। সেসব জমিতে এ ধান এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। বিশেষ করে গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট এলাকার জন্য অধিক উপযোগী।
বহুবর্ষজীবী ধানের সিড সার্টিফিকেট পেলে কৃষক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে চাষাবাদ শুরু করা যাবে জানিয়ে আইইউবিএটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুর রব বলেন, ‘গত পাঁচ বছর আমরা এ ধানটি চাষাবাদ করেছি। গবেষণা পর্যায়ে আমরা সফল। দেশের চারটি এলাকায় কৃষকরা এখন চাষ করছেন। এক সিজন চাষ হয়েছে, এখনো চলছে। কোন এলাকায় কতটুকু ফসল হলো এটি দেখার বিষয় রয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে উচ্চফলনশীল জাতের সঙ্গে ফসলের তুলনা করে ভালো ফল পেয়েছি। কৃষক পর্যায়ে নেয়ার জন্য আরো কিছু গবেষণা দরকার। তারপর সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে।’










