নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনের এক বছর পূর্ণ হলো। এ সময়ের মধ্যে আপনার নেয়া উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ সম্পর্কে বলুন।
নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেজারার হিসেবে আমার দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্ণ হলো। আমার যোগদানের কিছুদিন পূর্বে আমাদের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. খন্দকার মোহাম্মদ আশরাফুল মুনিম যোগদান করেন। উপাচার্যের নেতৃত্বে বর্তমান প্রশাসন ভালো কিছু উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যখন যোগদান করি তখন মাত্র ১৩ জন শিক্ষক দিয়ে চারটি বিভাগে পাঠদান চলছিল। এই প্রবল সংকট মোকাবিলার লক্ষ্যে আমরা শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেই। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। আরো কয়েকজন শিক্ষক স্বল্প সময়ের ব্যবধানে যোগদান করবেন। এরই মধ্যে প্রতিটি বিভাগে শিক্ষার্থী সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে বিভাগের সংখ্যা বর্তমান সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি হবে বলে আশা করছি। চলতি বছরে নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষাকার্যক্রম নিজস্ব ক্যাম্পাসে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভেঙে স্থায়ী ক্যাম্পাসে নতুন কয়েকটি ভবনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
আপনাদের অ্যাকাডেমিক উদ্যোগগুলো কী?
আমরা দেশের প্রথিতযশা শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তকদের নিয়ে সিরিজ সেমিনার, কর্মশালা ও বক্তৃতার আয়োজন করছি। আমরা চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ের চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে সক্ষম হোক। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ (প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক) কাজে শৃঙ্খলা আনয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি আমরা।
নথির কাজ ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে উৎসাহিত করেছে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা কয়েক হাজার বৃক্ষ রোপণ করেছি। শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনেও গুরুত্ব দিয়েছি আমরা।
নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য কী? লক্ষ্যসমূহ অর্জনে বর্তমান প্রশাসন কীভাবে কাজ করছে?
নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম লক্ষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞানচর্চা, জ্ঞানের বিকাশ বিতরণের মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। দক্ষতাসম্পন্ন মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাইকৃত শিক্ষার্থী ভর্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক মান বজায় রাখাসহ নানামুখী কার্যক্রম এ লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে। আমরা খুব জোরেশোরে চেষ্টা করছি প্রাথমিকভবাবে বিশ্বের অন্তত ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আন্তঃসহযোগিতামূলক কার্যক্রম চালু করতে। যাতে শিক্ষার্থীরা সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নানাভাবে প্রবেশাধিকার লাভ করে। আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয় স্থানিক ও আঞ্চলিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিকতার সীবাবদ্ধতা অতিক্রম করে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক।
জেলা শহরে অবস্থিত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?
প্রান্তিক জনপদের মানুষকে নানামুখী সংকট মোকাবিলা করে সম্মুখে অগ্রসর হতে হয়। প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরাও এ ধরনের বহুবিধ সংকট অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। তবে এসব সংকটকে আমরা বড় করে দেখতে চাই না, বরং স্থানিক ও আঞ্চলিক সম্ভাবনাগুলোকে খুঁজে বের করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশে সেগুলোকে কাজে লাগাতে চাই। এমনিতে ভাটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাবনা বিপুল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পাটাতন তৈরিতে এই সম্ভাবনা নিশ্চিতভাবে কাজে লাগবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও শৃঙ্খলা সম্পর্কে বলুন।
এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন অবকাঠামো প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বহুবিধ কার্যক্রম জোরদার করতে হলে নতুন অবকাঠামোর তৈরির বিকল্প নেই। আর উন্নয়ন কাজের মন্থর গতি সার্বিক অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এখনো তলানিতে। প্রতিটি বিভাগে যেখানে অন্তত ১২ থেকে ১৫ জন শিক্ষক প্রয়োজন সেখানে ৬-৭ জন শিক্ষক দিয়ে প্রতিটি বিভাগের কাজ চলছে। প্রশাসনিক দফতরগুলোতেও কর্মকর্তা-কর্মচারীর তীব্র সংকট বিদ্যমান। ফলে প্রায় প্রত্যেককেই অতিরিক্ত দায়িত্বের বোঝা বইতে হচ্ছে। কোনো কোনো দফতরে জনবলের অভাবে অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। যাইহোক, একথা সত্যি যে, শিক্ষার্থীদের এখনো ক্যাম্পাসে কাক্সিক্ষত পরিবেশ দেয়া সম্ভব হয়নি। যেহেতু অল্পকিছুদিন হয় ক্যাম্পাসে শিক্ষাকার্যক্রম চালু হলো, আশা করি একটি পরিপূর্ণ পরিবেশ পাবে নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্ববিদ্যালয়, ইউজিসি ও মন্ত্রণালয় — এই তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করেন? এ কাজের চ্যালেঞ্জগুলো বলুন।
এই তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় সাধন সত্যিই কষ্টসাধ্য। তবু প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে সেটি আমাদেরকে করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক অগ্রগতিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও মন্ত্রণালয়ের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও জনবল সংখ্যা ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মঞ্জুরী কমিশনের প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে। আবার এসংক্রান্ত কাজে মন্ত্রণালয়েরও সমন্বিত ভূমিকা রয়েছে। এই দুটি উইংয়ের সঙ্গে ‘সাকসেসফুল নেগোসিয়েশন’ সত্যি চ্যালেঞ্জিং। তারা যেহেতু অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়ে একসঙ্গে কাজ করেন সেহেতু তাদেরকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবিক পরিস্থিতি অনুধাবন করানো প্রয়োজন হয় — এই কাজে বিপুল ধৈর্য প্রয়োজন।
জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় — ধারণা দেশে উচ্চশিক্ষা স্তরে কেমন ভূমিকা রাখছে? একজন শিক্ষক ও প্রশাসক হিসেবে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক বিস্তার, গুচ্ছ ভর্তিপরীক্ষা পদ্ধতি ও শিক্ষার মান সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় — ধারণাটি যেহেতু বিগত সরকারের রাজনৈতিক ইশতেহারের অংশ অতএব রাজনীতিকরাই এই আলাপ ভালো করতে পারবেন। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি উচ্চশিক্ষায় সংখ্যাগত দিকের চেয়ে গুণগত দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি না করেও উচ্চশিক্ষার স্কোপ বৃদ্ধি করা যায়। এক্ষেত্রে আমরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে কীভাবে উচ্চশিক্ষার পরিধি ও কলেবর বিস্তৃত হয়েছে, সেসকল দৃষ্টান্ত গ্রহণ করতে পারি।
গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার অনেক সুফলের পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও আছে তবে বাংলাদেশী বাস্তবতায় পদ্ধতিটি আরো কিছু বছর চলতে পারে। এই পদ্ধতি এখনই ভেঙে না দিয়ে চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্ণিত করে সেগুলো সমাধানে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।
আর শিক্ষার মান বৃদ্ধি একটি সামগ্রিক প্রচেষ্টার অংশ। এখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-প্রতিষ্ঠানের যেমন ভূমিকা আছে তেমনি প্রয়োজন আছে যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের, রাষ্ট্রেরও। এটি একপাক্ষিক কোনো বিষয় নয়, চিরকাল-ই বহুপাক্ষিক। উচ্চশিক্ষা যেহেতু একটি বৈশ্বিক বিষয়, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে বৈশ্বিক তাগিদ ও বোধ তৈরি হওয়া প্রয়োজন।
অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোভিড-১৯ পরবর্তী ‘লার্নিং গ্যাপ’ এখনো বিদ্যমান। সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অনেকক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থী দূরত্বের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসকল সঙ্কট কীভাবে মোকাবিলা করা যায়?
কোভিড-১৯ আমাদের শরীর, মন ও বোধের অনেক ক্ষত স্পষ্ট করে দেখিয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে এই ক্ষতি ও ক্ষত বিপুল। শিক্ষার্থীরা হয়তো সনদ হাতে বেরিয়ে গেছে তবে ‘লার্নিং গ্যাপ’ এখনো পূরণ হয়নি। সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কর্তব্য হলো নিজেদের অভাবের স্থানগুলো চিহ্ণিত করে সেগুলো রিপেয়ারে মনোযোগী হওয়া। আর শিক্ষকদের তো বিপুল দায় আছে এই গ্যাপ পূরণে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই অভ্যুত্থান একটি বড় ঘটনা। যেহেতু শিক্ষার্থীরাই এতে নেতৃত্ব দিয়েছে, প্রাণ দিয়েছে, অনেকের অঙ্গহানি হয়েছে। ফলে তাদের মনে-প্রাণে নতুন গতি, সাহস ও আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা ভাবছে, আমরা তো অনেক বড় ঘটনার অনুঘটক। তবে তাদের এটিও স্মরণ রাখতে হবে যে, শ্রেণিকক্ষ তাদের সবচেয়ে আদর্শ স্থান। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক চিরকালীন ও মূল্যবান। এই মূল্যবান সম্পর্ক উভয়পক্ষকে যত্ন ও পরিচর্যার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হবে।










