শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিষয়ে পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের অনেকেই জানতে চান এ বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে পেশাজীবী হিসেবে কাজ করছেন এমন কারো অভিজ্ঞতার কথা। একাডেমিক ও পেশাজীবনের অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন তারা—
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় দক্ষ পেশাজীবীর প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে
হৃত্বিকা বড়ুয়া
উন্নয়নকর্মী, লেবার মাইগ্রেশন ও সোশ্যাল ইনক্লুশন ইউনিট, আইওএম, জর্ডান
সাম্প্রতি ইরান-ইসরায়েল ১২ দিনের যুদ্ধে অনেকেই ভাবতে শুরু করেছিলেন এই বুঝি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল! মানব ইতিহাসের ধারায় সমস্যা যেমন দীর্ঘস্থায়ী, তেমনি তার সমাধানের পথও বিদ্যমান। এ কারণেই শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন আজকের পৃথিবীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ বিষয়টি পড়লে একজন শিক্ষার্থী যেমন যুদ্ধ, দমন-পীড়ন ও সহিংসতার অন্তর্নিহিত কারণ বিশ্লেষণ করতে পারেন, তেমনি শান্তি প্রতিষ্ঠার কৌশল, মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া, সমঝোতা বা পুনর্মিলনের পথও খুঁজে বের করতে শেখেন। বর্তমানে চাকরির বাজারে বিশেষ করে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন, শান্তি নির্মাণ, মানবিক সহায়তা এবং সংঘর্ষ প্রতিরোধমূলক কাজে অভিজ্ঞ ও দক্ষ পেশাজীবীর প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। জাতিসংঘ, আইওএম, ইউএনএইচসিআর, সেভ দ্য চিলড্রেন ও অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে এখন নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগ দেয়া হয়। বাংলাদেশের স্থানীয় এনজিও, মানবাধিকার সংস্থা কিংবা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে নীতিগত পর্যায়ে প্রভাব রাখা যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, রোহিঙ্গা সংকট, ভূমি বিরোধ কিংবা পরিবেশগত সংঘর্ষ বিভিন্ন সংকট মোকাবেলায় সামাজিক পুনর্মিলন, সচেতনতা বৃদ্ধি, সহনশীলতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে ‘শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়নে’ প্রশিক্ষিত শিক্ষার্থীরা দক্ষতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে পারেন।
নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে চাইলে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন আদর্শ বিষয়
মুহাম্মদ মাজেদুল হক
গবেষণা কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ
শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন একটি আন্তঃবিষয়ক ও সময়োপযোগী বিষয়। এ বিষয় থেকে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বিশ্লেষণ ও সেসবের শান্তিপূর্ণ সমাধান বিষয়ে শেখে। নীতিনির্ধারণ ও কূটনৈতিক পর্যায়ে এ দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে অধ্যয়ন একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির গভীরতর বিশ্লেষণ শেখায়, অন্যদিকে পরিসংখ্যান ও গবেষণামূলক পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেয়ায় শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণমূলক লেখার দক্ষতা বাড়ে। এর ফলে সরকারি-বেসরকারি চাকরির পরীক্ষায় ভালো ফল করার সম্ভাবনা বাড়ে। তবে সরাসরি চাকরির বাজার তুলনামূলকভাবে সীমিত। সাধারণত গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং এনজিওগুলোয় এ বিষয়ের দক্ষতা কাজে লাগে, বিশেষ করে যেখানে স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত রোধ, শান্তি প্রতিষ্ঠা বা সামাজিক সংহতি নিয়ে কাজ হয়।
যারা এ বিষয়ে পড়ে ভালো ক্যারিয়ার গড়তে চায় তাদের জন্য পরামর্শ হলো গবেষণা, আন্তর্জাতিক বা জাতীয় নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে চাইলে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন একটি আদর্শ বিষয়। এক্ষেত্রে সফল ক্যারিয়ার গড়তে হলে নীতি বিশ্লেষণ, কেস স্টাডি, আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, কূটনীতি এবং দ্বন্দ্ব নিরসন কৌশল বিষয়েও দক্ষতা অর্জন করা জরুরি। পাশাপাশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা কিংবা আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে ইন্টার্নশিপ বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেয়াও দরকার।
উন্নয়ন খাতে ক্যারিয়ারে আগ্রহীদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা উচিত
মো. আবদুল্লাহ বাশার
সিনিয়র ম্যানেজার, ডাটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালাইসিস, এমইএএল বিভাগ, ব্র্যাক
উন্নয়ন সংস্থাগুলো ‘প্রব্লেম ট্রি’ ও ‘থিওরি অব চেঞ্জ’ এর মাধ্যমে সমাজের জটিল সমস্যা চিহ্নিত করে তার মূল কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণের মাধ্যমে কার্যক্রম গ্রহণ করে। এসব বিষয়ে যাদের সুস্পষ্ট ধারণা থাকে, তাদের সবসময়ই উন্নয়ন খাতে ভালো করার সম্ভাবনা বেশি থাকে। শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগে অধ্যয়নের সময় আমরা ‘কনফ্লিক্ট ট্রি’ বিশ্লেষণের মাধ্যমে যেকোনো দ্বন্দ্বের মূল সমস্যা, অন্তর্নিহিত কারণ এবং এর প্রভাব বিশ্লেষণ করার পদ্ধতি শিখি। এ জ্ঞান পরবর্তী সময়ে আমাকে সমাজের সমস্যা বিশ্লেষণে বিশেষভাবে সাহায্য করেছে। শুধু তা-ই নয়, রিসার্চ মেথডোলজি, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান বিষয়ে এ বিভাগ থেকে অর্জিত জ্ঞান আমার পেশাগত দক্ষতাকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। পাশাপাশি ‘পজিটিভ পিস’ এর ধারণা উন্নয়ন কার্যক্রমের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে।
যারা উন্নয়ন খাতে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী তাদের উচিত বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকেই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা। বিভিন্ন সংগঠনে যুক্ত হওয়া এবং ইন্টার্নশিপে অংশগ্রহণ করা। ব্র্যাকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রদত্ত লিডারশিপ ও সফট স্কিল প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নিজেকে প্রস্তুত করলে এ খাতে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। ভলান্টারি কাজ ও ইন্টার্নশিপ পেতে নেটওয়ার্কিং অত্যন্ত জরুরি। যারা এ খাতে আগ্রহী, তাদের উচিত ছাত্রজীবনেই এসব কোর্স সম্পন্ন করে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকে উন্নয়ন খাতের জন্য নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলা। উন্নয়ন খাতে কাজ করা শুধু একটি পেশা নয়: এটি সমাজ পরিবর্তনের এক অনন্য সুযোগ। সচেতন প্রস্তুতি ও সদিচ্ছাই পারে একজন তরুণকে এ খাতে সফলতার পথে এগিয়ে নিতে।










