খুদে স্যাটেলাইট ডিজাইন করে উৎক্ষেপণের পর নির্ধারিত মিশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করে বিশ্বে সপ্তম, এশিয়ায় দ্বিতীয় এবং বাংলাদেশে প্রথম স্থান অর্জন করেছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ)। ইউআইইউ প্রতিযোগী দল ‘UIU ASCEND’ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্যানস্যাট (CanSat) প্রতিযোগিতা ২০২৫-এ অংশ নিয়ে এ অর্জন করে। গত ৫-৮ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় অনুষ্ঠিত হয় এ প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন দেশের ৬৭টি দলের মধ্য থেকে বিশ্বব্যাপী শীর্ষ ৪০টি দল ফাইনাল রাউন্ডে নির্বাচিত হয়। যেখানে ইউআইইউ শিক্ষার্থীদের দল সফল উৎক্ষেপণ এবং নিখুঁত মিশন সম্পাদনের মাধ্যমে এ সম্মানজনক স্থান অর্জন করে। UIU ASCEND দল মোট ৯৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ নম্বর অর্জন করে। এর মধ্যে এনভায়রনমেন্টাল টেস্টে শতভাগ নম্বর অর্জন করে। ইউআইইউ ক্যানস্যাট টিম ২০২৪ সালে প্রথমবার ক্যানস্যাট প্রতিযোগিতায় ফাইনাল রাউন্ডে অংশ নেয় এবং বিশ্বে ১১তম, এশিয়ায় তৃতীয় এবং বাংলাদেশে প্রথম স্থান অর্জন করে। ওই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ২০২৫ সালের প্রতিযোগিতায় দলটি আরো পরিণতভাবে অংশগ্রহণ করে বড় সাফল্য অর্জন করে। একমাত্র বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দুই বছর ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক ক্যানস্যাট প্রতিযোগিতার ফাইনালে স্থান করে নেয় ইউআইইউ।
ক্যানস্যাট প্রতিযোগিতা
আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনটিক্যাল সোসাইটি প্রতি বছর আয়োজন করে ক্যানস্যাট প্রতিযোগিতা। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একটি সোডা ক্যানের আকৃতির ক্ষুদ্র স্যাটেলাইট ডিজাইন করে, সেটি উৎক্ষেপণের পর নির্ধারিত মিশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে হয়। এটি প্রকৃত মহাকাশ মিশনের একটি ক্ষুদ্রাকৃতির অনুশীলন, যেখানে বাস্তব সমস্যা সমাধানে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও দলগত সমন্বয় যাচাই করা হয়। উৎক্ষেপণ থেকে অবতরণ পর্যন্ত সর্বদা ভূমিতে অবস্থিত নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের সঙ্গে তারবিহীন যোগাযোগ অক্ষুণ্ন রাখতে হয়। এবারের প্রতিযোগিতায় চ্যালেঞ্জ ছিল অবতরণের সময় প্যারাসুট ও অটো জাইরো (Auto Gyro) প্রযুক্তির মাধ্যমে গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং মিশনের পুরো সময়টা ক্যামেরার ভিউ একটি নির্দিষ্ট দিকে স্থির রাখা।
দল ‘ইউআইইউ অ্যাসসেন্ড’
প্রতিযোগিতায় অংশ নেন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) ও কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের ১৩ জন শিক্ষার্থী। তাদের দলের নাম ‘ইউআইইউ অ্যাসসেন্ড’ (UIU ASCEND)। পুরো দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন ইইই বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আব্দুল্লাহ আল সাদ। মেকানিক্যাল সিস্টেমের ডিজাইনারও তিনি। ইলেকট্রিক্যাল সাবসিস্টেম দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন মো. সামসুজ্জামান, কমিউনিকেশন সাবসিস্টেম দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন মো. রাহাত হাসান এবং সফটওয়্যার সাবসিস্টেম দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন মো. মাহফুজ হাসান। এছাড়া দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন নূরে আলম প্রতীক, প্রভাত কুণ্ডু শাওন, রাইয়ান বিন সিরাজ মাহি, বদিউজ্জামান শিকদার ও এম আব্দুল্লাহ খান। দলের অধিনায়ক মো. আব্দুল্লাহ আল সাদ বলেন, ‘দেহের প্রত্যেকটি অংশ যেমন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে, আমরা দল হিসেবেও সেভাবে কাজ করেছি যেন ভালো করতে পারি। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা ভালো করেছি।’ শিক্ষার্থীদের এ সফলতার পেছনে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে প্রধান পরামর্শক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ইইই বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এম রেজওয়ান খান। সার্বক্ষণিক দল পরিচালনা এবং মেন্টরশিপের ভূমিকায় ছিলেন একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাদিদ মুনীর।
স্যাটেলাইট তৈরির না বলা গল্প
একটি প্রজেক্টকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে যেমন দরকার নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করা, তেমনি দরকার বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সহায়তা। টিম লিডার মো. আব্দুল্লাহ আল সাদ বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্ট নেই। তবু আমরা নিজেরা শিখে পুরো ডিজাইন করেছি এবং একটি সুন্দর ক্যানস্যাট বানিয়েছি।’ প্রযুক্তিগত রিসোর্স নিয়ে মো. সামসুজ্জামান বলেন, ‘দেশে ভালো মানের সেন্সর এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ পাওয়া দুরূহ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সহায়তা অনেক কম। যেটা আমাদের চ্যালেঞ্জকে আরো বাড়িয়ে দেয়।’ দেশে পিসিবি ম্যানুফ্যাকচারিং একটি বড় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মো. রাহাত হাসান বলেন, ‘আমরা থেমে না গিয়ে নিজেরাই হাতে সার্কিট বোর্ড বানিয়েছি, যেটা খুব ভালো কাজ করেছে।’
দলের মেন্টর ড. সাদিদ মুনীর বলেন, ‘এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে সঠিক পরিকল্পনা, নিয়মিতভাবে কাজ করে ছোট ছোট অর্জনের মাধ্যমে মূল লক্ষ্য অর্জন করা এবং শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও হার না মানার মানসিকতা। আমাদের শিক্ষার্থীরা এ প্রতিযোগিতার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য অনেক আউট অব দ্য বক্স সমাধান বের করেছে।’










