বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেন অনেকেই, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও সময়মতো প্রস্তুতি না নেয়ায় অনেক প্রতিভাবান ছাত্রছাত্রীর স্বপ্ন ভেস্তে যায়। সঠিক সময়ে সঠিক প্রস্তুতি আপনাকে এগিয়ে রাখবে এক ধাপ আগে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়া মানে শুধু ভিসা ও টিকিটের ব্যবস্থা করা নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া যার জন্য কমপক্ষে এক বছর আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়া জরুরি। মনে রাখবেন, একটি সফল প্রস্তুতিই পারে আপনার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরিত করতে

ডকুমেন্ট প্রস্তুতি

পাসপোর্ট করা না থাকলে দ্রুত পাসপোর্ট করে ফেলুন। পাসপোর্ট করার সময় অবশ্যই সভ একাডেমিক সার্টিফিকেটের এবং সেই অনুযায়ী ন্যাশনাল আইডি কার্ডের সঙ্গে মিল রেখে নাম, পিতা-মাতার নাম, স্থায়ী ঠিকানা এবং অন্যান্য তথ্য নির্ভুল প্রদান করে পাসপোর্ট করুন। পাসপোর্ট করা থাকলে পাসপোর্টের মেয়াদ সম্পর্কে সচেতন হোন; ন্যূনতম দুই বছর মেয়াদ হাতে রেখে উচ্চশিক্ষার আবেদন প্রস্তুতি শুরু করুন। আপনার পাসপোর্ট, একাডেমিক সার্টিফিকেট, ন্যাশনাল আইডি কার্ড এবং জন্মসনদে সব তথ্য সবসময় একই রাখুন। উদাহরণস্বরূপ আপনার স্থায়ী ঠিকানা যদি কুমিল্লা হয়, তবে সব জায়গায় একই ঠিকানা ব্যবহার করুন। কোনো রকম ভুল থাকলে সেটি সংশোধন করে ফেলুন; দ্রুত। নাম কিংবা ঠিকানার গরমিল আপনার স্কলারশিপ পাওয়া থাকলেও ভিসা আটকে দিতে পারে।

নামবিভ্রাট দূর করা

জন্মসনদ, এসএসসি, এইচএসসি সার্টিফিকেটসহ সব একাডেমিক সার্টিফিকেট, ন্যাশনাল আইডি কার্ড এবং পাসপোর্টে নামের বানান একই রাখুন। কোথাও ভুল থাকলে হোক সেটা সামান্য দ্রুত সংশোধন করুন। চেষ্টা করুন পাসপোর্ট আর একাডেমিক সার্টিফিকেটের মাঝে যেটা সংশোধন করা দ্রুত ও সহজ হবে, সেটা দ্রুত সংশোধন করতে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুধু এফিডেভিট করলেই হয়তো সামান্য গরমিল থেকে মুক্তি দিতে পারে। ভিসা প্রক্রিয়ায় নামের অমিলে বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে। এসএসসি, এইচএসসি সার্টিফিকেট সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড থেকে ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন করে সার্টিফায়েড সার্টিফিকেট নিন। বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট ও ডিগ্রি সার্টিফিকেট রেজিস্ট্রার অফিস থেকে সিলমোহরকৃত মেইন কপি এবং সিলমোহরকৃত একাধিক ফটোকপি সংগ্রহ করুন। কিছু কিছু এম্বাসি সিলমোহরকৃত ফটোকপি জমা রেখে দিয়ে ভিসা দেবে।

ডকুমেন্ট সত্যায়ন

বিদেশে উচ্চশিক্ষায় সব ধরনের হয়রানি দূর করা এবং অর্থ ও সময়ের অপচয় রোধ করার জন্য বর্তমান বাংলাদেশ সরকার এ ডকুমেন্ট সত্যায়ন কাজটি অনলাইনে অল্প খরচে সর্বোচ্চ পাঁচদিনের মধ্যে করানোর ব্যবস্থা করেছে। এখানে অনলাইনে সত্যায়নের জন্য সেবাপ্রার্থীকে প্রথমে সনদগুলো স্ক্যান করে নিতে হবে। সরকারি মাইগভডটবিডি (https://www.mygov.bd/) ওয়েবসাইটে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সনদগুলো আপলোড করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের দ্বারা সত্যায়ন ও প্রত্যয়ন হয়ে গেলে সেবাগ্রহীতা তার মোবাইল ফোনে একটি এসএমএস পাবেন। এ বার্তা পাওয়ার পর তিনি সত্যায়ন ও প্রত্যয়ন হওয়া সনদটি ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করতে পারবেন।

একাডেমিক প্রস্তুতি

ভালো সিজিপিএ রাখতে চেষ্টা করুন। ফাইনাল ইয়ারে হলে ভালোভাবে ফোকাস করে সর্বোচ্চ গ্রেড নিশ্চিত করুন। প্রয়োজনে সুযোগ থাকা সাপেক্ষে বিভিন্ন কোর্সে ইমপ্রুভমেন্ট দিয়ে সিজিপিএ বাড়িয়ে নিন। রিসার্চ পেপার পাবলিকেশনের জন্যও প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রফেসরের সঙ্গে কথা বলে জার্নাল পেপার লিখুন। ন্যূনতম EEE/Springer কনফারেন্সে সাবমিশনের টার্গেট রাখুন এবং সেই অনুযায়ী সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করুন। বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যেকোনো সাবজেক্টের জন্য জরুরি টেকনিক্যাল স্কিল। যেমন ডাটা ভিজুয়ালাইজেশনের জন্য Tableau/Power BI, এক্সেলের অ্যাডভান্সড ফাংশন। এগুলো গবেষণা পেপার ও থিসিসে ডাটা প্রেজেন্টেশনের জন্য কাজে লাগবে। প্রোগ্রামিং বেসিকস সম্পর্কেও জেনে রাখা ভালো। ডাটা অ্যানালাইসিসের জন্য পাইথন/আর, MATLAB, ডাটাবেজ ম্যানেজমেন্টের জন্য SQL। টার্গেট করা দেশের স্থানীয় ভাষা শিখে নিতে পারেন। জার্মানির জন্য A2 লেভেল (Goethe-Institut কোর্স), ফ্রান্সের জন্য DELF A2।

রিসার্চ স্কিল

একাডেমিক রাইটিংয়ে ভালো করতে বিশেষ করে স্টেম ফিল্ডের শিক্ষার্থীদের জন্য LaTeX শেখা জরুরি। রেফারেন্স ম্যানেজমেন্টের জন্য Zotero/Mendeley শিখতে পারেন। রিসার্চ মেথডোলজির জন্য কোয়ালিটেটিভ কোয়ান্টিটেটিভ রিসার্চ টেকনিক, স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যানালাইসিসের জন্য SPSS/STATA শিখতে পারেন।

এছাড়া বিজনেস ই-মেইল রাইটিং, প্রেজেন্টেশন স্কিল (PowerPoint/Canva), প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের জন্য Trello/Asana ব্যবহার শেখা ও Agile মেথডোলজি বেসিকস জেনে নিতে পারেন।

ভাষা পরীক্ষা প্রস্তুতি

আইইএলটিএস বা টোফেল পরীক্ষার জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিল বা আইডিপি থেকে পরীক্ষার তারিখ বুকিং করুন। আইইএলটিএসের প্রস্তুতি নিতে শুরু করুন। যথাযথ সময় হাতে নিয়ে নিয়মিত আইইএলটিএস প্র্যাকটিস করুন। দৈনিক ৩-৪ ঘণ্টা প্র্যাকটিস রুটিন তৈরি করুন। কেমব্রিজ আইইএলটিএস বইয়ের সিরিজ অনুসরণ করুন। সপ্তাহে একটি ফুল লেংথ মক টেস্ট দিন। প্রয়োজন হলে জিআরই, জিম্যাট প্রস্তুতি নিতে পারেন। Magoosh বা Kaplan স্টাডি ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করতে পারেন। ম্যাথের জন্য “Nova’s GRE Math Bible বইটি ভালো। Toastmasters International বা স্থানীয় ইংরেজি স্পিকিং ক্লাবে জয়েন করুন।

আবেদন প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি

রিকমেন্ডেশন লেটার সংগ্রহ করুন। কমপক্ষে তিনজন রেফারি নির্বাচন করুন (দুজন একাডেমিক, প্রাসঙ্গিক হলে একজন প্রফেশনাল)। তাদের সঙ্গে মিটিং করুন। নিজের একাডেমিক পারফরম্যান্স সম্পর্কে জানান। একটি স্টেটমেন্ট অব পারপাস লিখুন। ৫০০-১২৫০ শব্দের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ও প্রাসঙ্গিক রাখুন। কাঠামোটি হবে ভূমিকা (১০%); একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড (২০%); কাজের অভিজ্ঞতা (৩০%); কেন এই প্রোগ্রাম? (৩০%) এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা (১০%)। সিভি বা রিজিউমে আপডেট করুন। কালানুক্রমিক ফরম্যাটে লিখুন, গবেষণা/প্রজেক্ট হাইলাইট করুন। সিভির জন্য ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের এনডোরস করা ইউরোপাস ফরম্যাট ফলো করতে পারেন, যা সারা বিশ্বের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় গ্রহণ করে।

বিশ্ববিদ্যালয় শর্টলিস্ট করুন

ন্যূনতম ১০টি ইউনিভার্সিটি/ স্কলারশিপ প্রোগ্রাম সিলেক্ট করুন। তিনটি ভাগে বাছাই করুন। সাবজেক্ট, টিউশন ফি, স্কলারশিপ সুযোগ বিবেচনা করুন। যেকোনো প্রোগ্রামে কিংবা স্কলারশিপে আবেদনের জন্য ইউনিভার্সিটি/ স্কলারশিপের স্পেসিফিক পোর্টাল ঘাঁটাঘাঁটি করুন; নিজেকে ওই প্রোগ্রাম আবেদনের সঙ্গে পরিচিত করুন; বেশি বেশি। জানুন এবং শিখুন কীভাবে সঠিক নিয়মে আবেদন করতে হয়।

আর্থিক প্রস্তুতি

বিদেশে উচ্চশিক্ষায় স্কলারশিপ অপশন চেক করুন এবং সেই অনুযায়ী প্রিপারেশন শুরু করুন। ব্যাংক স্টেটমেন্ট প্রস্তুত করে রাখতে হবে। কিছু কিছু দেশের ভিসা আবেদনে এবং সেলফ ফান্ডিংয়ে পড়ালেখা করতে চাইলে ন্যূনতম ছয় মাসের ট্রানজেকশন হিস্ট্রি রাখুন। ট্রানজেকশন হিস্ট্রি যত স্ট্রিং, ভিসা তত দ্রুত হবে। স্কলারশিপ পেলে ব্যাংক স্টেটমেন্ট দরকার হয় না, তবে দুই-তিনটি দেশে ভিসা চেকলিস্টের অংশ হিসেবে অবশ্যই জমা দিতে হবে। বাড়তি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে যেই দেশে উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন সেই দেশের সেই প্রোগ্রামের রিলেভ্যান্ট টিউশন ফি, লিভিং কস্ট, ইন্স্যুরেন্স খরচ হিসাব করুন এবং রিলেটেড স্কলারশিপ অথবা অন্য অর্থ উপার্জনের অপশন নিয়ে গভীর পরালেখা করুন।

ভিসা প্রস্তুতি

ভিসা রিকোয়ারমেন্ট চেক করুন কী কী দরকার হতে পারে। টার্গেট দেশের এম্বাসি ওয়েবসাইট থেকে ভিসা আবেদন চেকলিস্ট চেক করে মানসিকভাবে ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় শর্ত অনুযায়ী স্বাস্থ্য বীমা সম্পর্কে জানুন। মেডিকেল চেকআপ/ মেডিকেল রিপোর্ট সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট সংগ্রহ করার সম্পর্কে যথাযথ ধারণা নিন।

জীবন দক্ষতা উন্নয়ন

আপনি যদি রান্না করতে না পারেন তাহলে এক বছর আগে থেকেই রান্না শেখা শুরু করুন। ১০টি বেসিক রেসিপি শিখে নিতে পারেন (ভাত, ডাল, সবজি ভাজি)। বিদেশে মায়ের হাতের রান্না না খেতে পারলেও যেন কিছু একটা খেয়ে বেঁচে থাকতে পারেন, সেই প্রস্তুতি থাকা উচিত। ড্রাইভিং শিখে নিতে পারেন। ড্রাইভিং শিখলে অবশ্যই লাইসেন্স নিয়ে নেবেন। আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং লাইসেন্সও করে নিতে পারেন, যা বিদেশে গাড়ি চালাতে কাজে লাগতে পারে।

আজকের ছোট প্রস্তুতিই আগামীকালের বড় সাফল্যের ভিত্তি। ধৈর্য ও পরিশ্রমে আপনার স্বপ্ন অবশ্যই সফল হবে। এ চেকলিস্ট অনুসরণ করে আপনি একটি স্ট্রেস-ফ্রি অ্যাপ্লিকেশন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে পারবেন। প্রতিটি ধাপে ধৈর্য ও সতর্কতা অবলম্বন করুন।

ড. আশিকুর রহমান

রিসার্চ ফেলো, স্প্যানিশ ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল