অধ্যাপক ড. এ বি এম শওকত আলী

উপাচার্য, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি

দেশের বাইরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন, কম্পিউটার বিজ্ঞানী হিসেবেও আপনার খ্যাতি রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বহির্বিশ্ব যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা নিজেদের তার সঙ্গে কতটা যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারছে?

প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য খুব বড় ল্যাব সুবিধার প্রয়োজন নেই। এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে কম বিনিয়োগ করে অনেক বেশি সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব। বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষা পরিপূর্ণ হয় যখন ল্যাবে পরীক্ষা হবে। কিন্তু কম্পিউটার এডুকেশনে বলা যায় এ ল্যাব চলে এসেছে ছোট ঘড়ি কিংবা মোবাইলে। এখনকার মোবাইলগুলো এত শক্তিশালী যে সেখানে এক্সপেরিমেন্ট করা যায়। কম্পিউটার এডুকেশনে দুটি অবস্থান রয়েছে। একটি ইনস্টিটিউশনাল রেডিনেস, আরেকটি ইন্ডিভিজুয়াল রেডিনেস। আমি মনে করি ইনস্টিটিউশনাল রেডিনেসে ঘাটতি থাকলেও ইন্ডিভিজুয়াল রেডিনেস তথা শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি অনেক বেশি চোখে পড়ছে। ইনস্টিটিউশনাল রেডিনেস নিশ্চিত করতে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ গুণগত একাডেমিশিয়ান। বাংলাদেশ এখানে অনেক পিছিয়ে আছে। এজন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। যেমন চীন ‘ওয়ান থাউজ্যান্ড প্রফেসর হান্টিং’ কর্মসূচি নিয়েছে। সারা পৃথিবীতে চীনের যারা ছড়িয়ে আছে তাদের জাতি পুনর্গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা যে যেখানে রয়েছে সেখানকার মতোই সম্মানী দেয়া হচ্ছে। এক হাজারের বিপরীতে এক লাখ আবেদন জমা পড়েছে। চীনের শিক্ষার্থীরা যাদের কাছে পিএইচডি নিতে বিদেশে যেত তারাই এখন চীনে। এতে একদিকে নিজেদের ভাষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার ব্যয় নির্বাহে যে পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যেত তা দেশেই থাকছে। আমাদের দেশে ফুটবলে এমন একজন হলো হামজা। ঠিক একইভাবে একাডেমিক ক্ষেত্রেও যদি এ রকম উদ্যোগ নেয়া হয়, বহির্বিশ্বের সঙ্গে আমরাও এগিয়ে যাব।

প্রযুক্তির পুরনো সব ধারণাও বদলে দিয়েছে এআই। তথ্য ও প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত যেসব সাবজেক্ট দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হয় তার একাডেমিক কারিকুলাম, পাঠদান পদ্ধতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

একটি মোবাইলের বছরে তিন-চারবার আপডেট ভার্সন আসে। তার মানে খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। বাটন ফোনের জগতে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য ছিল নকিয়ার। যখন স্মার্টফোন আসে তখন নকিয়াকে বলা হয়েছিল আপডেট করতে কিন্তু সেটা না করে তারা বলছে বাটন ফোনের বাজার দখল করে রাখবে। আজকে নকিয়ার অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। নকিয়ার মতো কোম্পানি নাই হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ায় নকিয়ার টাচ ফোনের মান অনেক উন্নত ফোনের কাছাকাছি কিন্তু গ্রাহকের কাছে জনপ্রিয় না। ঠিক একইভাবে আমরা একাডেমিশিয়ানরা যদি এআইয়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে কারিকুলাম আপডেট না করি আমাদের অবস্থাও ঠিক নকিয়ার মতো হবে।

বিইউবিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কোন দিক থেকে আলাদা। আর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষত্ব কী?

আমাদের প্রধান বিশেষত্ব হলো আমরা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে সাপোর্ট দিচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের যে পরিমাণ ওয়েভার ও স্কলারশিপ দেয়া হচ্ছে, তা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্মরণীয়। গত বছর আমরা ওয়েভার ও স্কলারশিপ দিয়েছি প্রায় ২৫ কোটি টাকা। ১০ হাজার শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে যে টাকা ওয়েভার দেয়া হয় এটিকে আমি অন্যতম বিশেষত্ব হিসেবে মনে করি। অন্যান্য অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বিইউবিটির টিউশন ফি অনেক কম। প্রায় সময়ই এটা বাড়ানোর চাপে পড়ি কিন্তু যখনই বাড়াতে চাই ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা বলেন এ বিশ্ববিদ্যালয় মুনাফার জন্য করা হয়নি, তারা ফি বাড়াতে দেয়নি। বিইউবিটি শুধু মিরপুরকেন্দ্রিক নয়, সব জেলার শিক্ষার্থী রয়েছে। এছাড়া উল্লেখযোগ্য আদিবাসী শিক্ষার্থী রয়েছে। আমার অফিসের তিনজন স্টাফের একজন আদিবাসী। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় আমাদের শিক্ষার্থীরা সুনাম বয়ে আনছে। গত মাসেও সপ্তম ওয়ার্ল্ড ইনোভেনশন কম্পিটিশন অ্যান্ড এক্সিবিশনে (ডব্লিউআইসিই) স্বর্ণপদক অর্জন করে বিইউবিটি শিক্ষার্থীদের প্রকল্প এগ্রো-ডক্টর। গ্র্যাজুয়েট এমপ্লয়মেন্টে আমরা এগিয়ে আছি। শুধু একটি বিভাগ থেকেই প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী ইউরোপে যাচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক পিছিয়ে। যেসব প্যারামিটার র‍্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখে সেগুলোয় আপনারা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন?

আমি ফিল্ড স্টাডি করে দেখেছি যেসব প্যারামিটারে মূল্যায়ন করা হয় সেখানে আমরা পিছিয়ে নেই। আমি একটি টিম তৈরি করেছি তারা এ বিষয়ে কাজ করছে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি আগামী বছর বিইউবিটি অন্তত তিনটি আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে জায়গা করে নেবে। র‍্যাংকিংয়ে আসার জন্য যেসব অর্জন থাকা দরকার সবই আছে আমাদের। এর মধ্যে একটি হলো কমপক্ষে ৫০০ পাবলিকেশন থাকতে হয়। আমাদের প্রায় ৮০০ পাবলিকেশন রয়েছে। নির্দিষ্টসংখ্যক পিএইচডিধারী শিক্ষকও আছেন। প্যারামিটারে যা যা থাকা দরকার সবই রয়েছে। র‍্যাংকিংয়ের জন্য আবেদন করার প্রয়োজন রয়েছে কিন্তু আগের যারা ম্যানেজমেন্ট ছিলেন তারা হয়তো সেটা করে উঠতে পারেননি। আশা করি আগামীতে র‍্যাংকিংয়ে বিইউবিটি ভালো অবস্থানে থাকবে।

বিইউবিটির গবেষণা কার্যক্রম নিয়ে জানতে চাই।

গবেষণার জন্য শিক্ষকদের রিসার্চ ইনটেনসিভ একাডেমিক ও টিচিং ইনটেনসিভ একাডেমিক এ দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছি। যারা রিসার্চ ইনটেনসিভ তারা গবেষণায় বেশি মনোযোগ দেবে, টিচিংয়ে কম সময় দেবে। কিন্তু আমি টার্গেট নির্ধারণ করে দিয়েছি বছরে নির্দিষ্টসংখ্যক পাবলিকেশন থাকতে হবে। যদি কেউ এটি করতে ব্যর্থ হয় তাকে টিচিং ইনটেনসিভ একাডেমিকে ফিরিয়ে নেয়া হবে। কেউ যদি হাই-ইমপ্যাক্ট জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করে সেখানে আমরা অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা করি। শিক্ষার্থীদেরও গবেষণায় যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছি। শিক্ষার্থীদের কাছে আমরা প্রজেক্ট প্রপোজাল আহ্বান করেছি। আমাদের নিজস্ব অর্থে এসব প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করব। আয়ের ২ শতাংশ গবেষণায় ব্যয় করছি আমরা। বিইউবিটি হাব নামে একটি ইউনিট চালু করেছি, যেটি বলতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি ইন্ডাস্ট্রি। আমাদের শিক্ষার্থীরা যেসব প্রডাক্ট উৎপাদন করবে হোক সেটা সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যার সেটি আমরা বাইরে বিক্রি করব। এরই মধ্যে আমাদের কয়েকটি প্রডাক্ট চলে এসেছে। আমরা নিজেরাও ব্যবহার করছি এবং শিগগিরই বাইরে বাজারজাত করা হবে। এখানের লভ্যাংশ পুরোটাই গবেষণায় ব্যয় হবে।

বিইউবিটি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই পূর্ণাঙ্গ হয় যখন কলা, বাণিজ্য, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যশিক্ষার সমন্বয় হবে। প্রত্যেক বিভাগ সমন্বিতভাবে জ্ঞানের আদান-প্রদান ও গবেষণা করবে। আমার দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরপরই বিইউবিটি মেডিকেল চালু হয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ। বর্তমান মিরপুরের ক্যাম্পাস একটি হসপিটাল হবে। আর অন্যান্য যে একাডেমিক ভবন আছে সেগুলো বিইউবিটির বেড়িবাঁধ ক্যাম্পাসে চলে যাবে। আমি পরিকল্পনা করে দিয়ে যাব। যদি সম্ভব হয় একটি ভবনও তৈরি করে যাব। পরবর্তী ম্যানেজমেন্ট বাকি কাজ এগিয়ে নেবে। সেখানে ফ্যাকাল্টিভিত্তিক ভবন তৈরি হবে। সেখানে যেমন কেন্দ্রীয় মসজিদ থাকবে, তেমনি বিভাগীয় এবং ফ্যাকাল্টির জন্য লাইব্রেরি থাকবে। শিক্ষকদের জন্য একটি পরিবেশবান্ধব সবুজ ছাদ থাকবে যেখানে তারা রিফ্রেশমেন্ট নেবেন। আগামী চার বছরে বিইউবিটি এমন অবস্থানে পৌঁছাব যারা জাতি গঠনে অবদান রাখবে।

সাক্ষাৎকার: শফিকুল ইসলাম