শিক্ষাজীবনে অসামান্য অবদানের জন্য আচার্য বা রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক পেয়েছেন দেশের স্বনামধন্য বেসরকারি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উত্তরা ইউনিভার্সিটির দুই কৃতী শিক্ষার্থী। গত শনিবার অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির নবম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা এ স্বর্ণপদক পান। উচ্চ শিক্ষায় অনন্য মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ শিক্ষার্থীদের স্বর্ণপদক জয়ের পেছনের গল্প ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা শুনেছেন শফিকুল ইসলাম
সিলেবাসের বাইরেও নানা বিষয়ে শেখার চেষ্টা করেছি
আশিকুর রহমান, শিক্ষার্থী, এমবিএ
গত অক্টোবরে আমার বাবা মারা গেছেন, খবরটা শুনলে তিনি সবচেয়ে খুশি হতেন। আমার পরিবার, বিশেষ করে আমার স্ত্রীর অবদান ছাড়া এ অর্জন সম্ভব ছিল না। আমি যখন পড়াশোনায় ব্যস্ত ছিলাম, তখন স্ত্রী পরিবারের হাল ধরেছেন। আমি মনে করি, এ স্বর্ণপদকপ্রাপ্তি মহান আল্লাহ তায়ালার আশীর্বাদ। আরো অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছেন, যারা এ পুরস্কার পেতে পারতেন। তবে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি এ পুরস্কার পেয়ে। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ। এটি আমার জীবনের একটি মাইলফলক। আমি নতুন বিষয় শিখতে খুব উৎসাহী। আমি পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার চেয়ে একটি বিষয়ে গভীরভাবে শিখতে পছন্দ করি। আমি মনে করি, এটি আমাকে পরীক্ষায় অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে ও মুখস্থ না করে ধারণা থেকে উত্তর লিখতে সহায়তা করেছে। এটা ভালো ফলাফল পেতেও বড় ভূমিকা রেখেছে। আমি শুধু কোর্স সম্পর্কিত জ্ঞানই নয়, সিলেবাসের বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে শেখার চেষ্টা করেছি। এছাড়া একটি ভালো শিক্ষার পরিবেশ এবং বিভাগের শিক্ষকদের সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ ও সাহায্য করার মানসিকতা আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করেছে। আমি যে চাকরি করি, সেখানে শেখা অনেক বিষয়ই আমার পড়াশোনায় সাহায্য করেছে। আমার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে আমার শিক্ষক ও পরিবার। শিক্ষকদের মধ্যে বিশেষ করে আফসার কামাল, ডা. গোলাম ফারুক, অভিজিৎ ব্যানার্জি স্যার আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন, উৎসাহ জুগিয়েছেন। এমবিএ ডিগ্রি অর্জনের জন্য কিছুটা কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। চাকরির পাশাপাশি ক্লাসের শিডিউল মেলাতে পারিবারিক কিছু দায়িত্বও অনেক সময় ঠিকভাবে পালন করতে পারিনি। সময় বের করা কঠিন ছিল।
যারা ভালো ফলাফল অর্জন করতে চান, তাদের জন্য আমার পরামর্শ হলো কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায় করতে হবে। কৌতূহলী হোন, পেশাদার কোর্সে আপনাকে বাস্তব জীবনের মুখোমুখি হতে হবে। যদি আপনি না শেখেন, তবে বাস্তব জীবনে ব্যর্থ হবেন। ছোট ছোট টার্গেট ঠিক করুন এবং নিয়মিত সে টার্গেট পূরণ করার অভ্যাস তৈরি করুন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি আজ একটি অধ্যায় শেষ করার টার্গেট নিলেন, এটি শেষ না করা পর্যন্ত টেবিল থেকে উঠবেন না। শিক্ষকদের সঙ্গে খুব ভালো যোগাযোগ রাখুন, কোনো কিছু বুঝতে না পারলে সংকোচ ছাড়াই জিজ্ঞাসা করুন। বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ ডিসকাশন করুন। তাদেরও নিজের শেখা বিষয়গুলো শেখানোর চেষ্টা করুন। যদি আপনি তাদের শেখাতে না পারেন, তার অর্থ হলো আপনি এটি ভালোভাবে বুঝতে পারেননি। প্রযুক্তির সাহায্য নিন, স্কলারদের আর্টিকেল পড়ুন। চাইলে এআইয়ের সহায়তাও নিতে পারেন। এটি পরীক্ষায় সঠিকভাবে লেখার জ্ঞান ও সক্ষমতা বাড়াবে।
ছোটবেলা থেকে আমি একজন পদার্থবিদ হতে চেয়েছিলাম। সারা জীবন গবেষণায় ব্যয় করতে চেয়েছি। কিন্তু এখন একজন প্রকৌশলী হয়েও এমবিএ সম্পন্ন করেছি। আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দেশের একজন কনস্ট্রাকশন প্রজেক্ট ম্যানেজার হওয়া। জাতিসংঘের উচ্চ পদে কাজ করে মানুষের জীবন মান পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা।
হার না মানার দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে
ফারহানা চৌধুরী, শিক্ষার্থী, বিবিএ
আলহামদুলিল্লাহ। যেকোনো প্রাপ্তিই আনন্দের ও প্রশান্তিদায়ক। আল্লাহ্ রব্বুল আল আমীনের রহমত ও দয়াই আমাকে যোগ্য করেছে। আমাকে এত বড় গ্রহণযোগ্যতা পাইয়েছেন। স্বর্ণপদক পেয়ে আমি আবেগ আপ্লুত ও কৃতজ্ঞ। আল্লাহর দেয়া মনোবল, আমার মায়ের ভূমিকা, আমার প্রতি শিক্ষকদের বিশ্বাস, তাদের পাঠদান, আমার নিজের চেষ্টা, স্বপ্ন, সাহস, পরিশ্রম, আমার কখনো হতাশ না হওয়া ও হার না মানার দৃঢ় সংকল্পই এ অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। আমার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা আমার মায়ের। এখানে অতিরঞ্জিত কিছু নেই। তিনি আমার জন্য যা করেন আর করেছেন, সেটা নিয়ে বলার ভাষা আমার নেই। আমি একটা ট্রাভেলড চাইল্ডহুড অতিবাহিত করেছি। বস্তুতই আমার জীবনে আমার মা সবকিছু। শিক্ষা জীবনে আমি উল্লেখযোগ্য কোনো বাধার সম্মুখীন হইনি। আমার পরিবার, আমার মা সবাই খুব সুন্দর মন মানসিকতা সম্পন্ন ও সাপোর্টিভ।
যারা ভালো ফলাফল অর্জন করতে চান, তাদের জন্য আমার পরামর্শ হলো নিজেকে সময় দেয়ার পাশাপাশি গল্পের বই পড়ার অভ্যাস করতে হবে। তাহলে আমাদের পড়ালেখায় হুট করে যে অমনোযোগী ভাব বা একঘেয়েমি আসে, এসব আমাদের প্রভাবিত করবে না। পড়াশোনায় আগ্রহ বাড়বে। আমি ১০-১২ ঘণ্টা পড়ায় অভ্যস্ত নই। নিজে দিনে সর্বোচ্চ ২-৩ ঘণ্টার বেশি পড়তে পারি না। কারণ আমার মনে হয়, নিজের মনও সতেজ রাখা উচিত। আসলে শিক্ষা অর্জন নিজের কাছে। আমি কীভাবে নিজেকে তৈরি করতে চাই কিংবা ভবিষ্যতে নিজেকে কোন পর্যায়ে দেখতে চাই, এ ধরনের মনোভাবও আমাদের শিক্ষা অর্জনে একটা বড় প্রভাব ফেলে। নিজের মধ্যে এ বোধ তৈরি করতে পারলেই ভালো ফলাফল করার আগ্রহ এমনিতেই প্রস্ফুটিত হবে। ছোটবেলায় ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পছন্দ বা আগ্রহ বদলায়। আমারও ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছাটা বদলে যায়। তাই সেটা নিয়ে আর ভাবিনি। বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্য পরিশ্রম করব, ইনশা আল্লাহ্। তবে সেটা একটু দীর্ঘ প্রক্রিয়া, তাই এ প্রস্তুতির পাশাপাশি কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জয়েন করার ইচ্ছা আছে। অভিজ্ঞতা অর্জনের বিকল্প নেই।










