অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং (পিএমই) বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। সম্প্রতি পিএমই বিভাগে পড়াশোনা, উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ারের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়

বাংলাদেশে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে শাবিপ্রবি পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে (পিএমই) স্নাতক ডিগ্রি চালু করে। প্রতিষ্ঠার শুরুর গল্প জানতে চাই।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ২০০৪ সালে পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ চালু করে। দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, খনিজ সম্পদ এবং জ্বালানি খাতকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগানোর জন্য বিশেষজ্ঞ জনবল তৈরির তীব্র প্রয়োজন ছিল। সে সময় বাংলাদেশে এ খাতে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী খুব সীমিত ছিল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদেশী বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে হতো। এ প্রেক্ষাপটে শাবিপ্রবিতে এ বিভাগ খোলা হয়, যাতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও খনিজ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় বিশেষজ্ঞ তৈরি হয় এবং বিদেশীনির্ভরতা কমে।

পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং কী?

পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং হলো তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অন্যান্য ভূগর্ভস্থ জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান, উত্তোলন এবং সঠিকভাবে ব্যবহারযোগ্য করার প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করা। সহজভাবে বললে, একজন পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার প্রথমে ভূতত্ত্ব এবং ভূ-পদার্থবিজ্ঞান ব্যবহার করে কোথায় তেল বা গ্যাসের সম্ভাবনা আছে তা নির্ণয় করেন। এরপর প্রযুক্তি ব্যবহার করে কূপ খনন ও উত্তোলনের ব্যবস্থা করেন। শুধু তা-ই নয়, উত্তোলিত সম্পদকে সর্বোচ্চ দক্ষতায় ব্যবহারের পথ খোঁজা এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে কাজ করা সবই এর আওতায় পড়ে।

পড়াশোনার জন্য কী কী যোগ্যতা লাগে?

এ বিভাগে পড়াশোনা করতে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে দৃঢ় ভিত্তি থাকা জরুরি। কারণ কূপ খনন বা রিজার্ভার বিশ্লেষণের মতো কাজে উন্নত গণনা ও তাত্ত্বিক জ্ঞান লাগে। তাই উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হতে হবে এবং ভর্তি পরীক্ষায় ভালো ফল করতে হবে। এছাড়া বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, গবেষণামুখী মানসিকতা এবং প্রযুক্তি শেখার আগ্রহও দরকার।

পাঠ্যক্রমে কী কী পড়ানো হয়?

পাঠ্যক্রম বেশ বৈচিত্র্যময়। এখানে ভূতত্ত্ব ও ভূ-পদার্থবিজ্ঞান পড়ানো হয়, যাতে মাটির নিচের স্তরগুলো বোঝা যায়। ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রডাকশন টেকনোলজি পড়ানো হয় কূপ খনন ও গ্যাস, তেল উত্তোলনের কৌশল শেখার জন্য। রিজার্ভার ইঞ্জিনিয়ারিং শেখায় কীভাবে তেল-গ্যাস ক্ষেত্রের ভেতরে জমে থাকা সম্পদ সঠিকভাবে হিসাব করতে হয়। পাশাপাশি তাপগতি, তরল গতি বিজ্ঞান, খনিজ প্রক্রিয়াকরণ, জ্বালানি অর্থনীতি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পড়ানো হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা কেবল প্রযুক্তি নয়, অর্থনীতি ও পরিবেশগত দিকও বোঝে। ল্যাবরেটরি কাজ এবং বিশেষায়িত সফটওয়্যার ব্যবহার করে হাতে-কলমে দক্ষতা অর্জনের সুযোগও থাকে।

পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার কী কী কাজ করেন?

একজন পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারের কাজ শুরু হয় জ্বালানি সম্পদের সম্ভাব্য ক্ষেত্র খুঁজে বের করার মাধ্যমে। এরপর কূপ খননের নকশা তৈরি, নিরাপদভাবে ড্রিলিং পরিচালনা, রিজার্ভার থেকে কতটা সম্পদ উত্তোলন সম্ভব তা বিশ্লেষণ করা, উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরো কার্যকর করার পদ্ধতি তৈরি করা—এসবই তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা, ব্যয় কমানো এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একজন দক্ষ পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার হতে হলে কী কী দক্ষতা ও জ্ঞান প্রয়োজন?

পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং একটি আন্তঃবিষয়ক ক্ষেত্র, তাই বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা লাগে। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও ভূতত্ত্বে শক্তিশালী জ্ঞান থাকা দরকার। জটিল সমস্যা সমাধান করার ক্ষমতা, ডাটা বিশ্লেষণ করার দক্ষতা এবং আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহারে পারদর্শিতা থাকতে হবে। তাছাড়া এটি দলগতভাবে করা কাজ, তাই নেতৃত্বগুণ ও যোগাযোগ দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে হয়, তাই ধৈর্য ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাও দরকার।

দেশে-বিদেশে কাজের ক্ষেত্র কী কী?

দেশে পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়াররা বাপেক্স, পেট্রোবাংলা, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড, গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, পেট্রোকেমিক্যাল প্রতিষ্ঠান, তেল শোধনাগার, এলপিজি ও এলএনজি প্লান্টে কাজ করছেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক কোম্পানি যেমন শেভরন বাংলাদেশেও আমাদের স্নাতকরা কাজ করছেন। বিদেশে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে, রাশিয়া ইত্যাদিতে তেল-গ্যাস কোম্পানি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে প্রচুর সুযোগ রয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে আমাদের প্রায় ৪০ শতাংশ স্নাতক বর্তমানে বিদেশে পড়াশোনা ও কাজ করছেন, যা আমাদের প্রোগ্রামের আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতিও বহন করে।

একজন পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারের আয়-রোজগার কত?

আয় নির্ভর করে অভিজ্ঞতা, কাজের ক্ষেত্র এবং দেশে বা বিদেশে কাজের ওপর। দেশে প্রাথমিকভাবে একজন পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারের মাসিক আয় ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে। অভিজ্ঞতা ও পদোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এ আয় বাড়তে থাকে। তবে বিদেশে আয়ের সুযোগ অনেক বেশি। প্রাথমিক পর্যায়েই মাসে গড়ে ৩ থেকে ৬ হাজার মার্কিন ডলার পাওয়া যায় এবং সিনিয়র পর্যায়ে তা আরো কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফলে এটি একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার।