১১ জুন বৃহস্পতিবার আমাদের মিড টার্ম পরীক্ষা শেষ হলো। যেন এক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল সবাই। রাত ১১টায় ইউল্যাব অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের নতুন ও পুরনো ৮৪ জন সদস্য মিলে ধানমন্ডির পুরনো ক্যাম্পাসের সামনে জড়ো হলাম। যেকোনো ছুটি পেলেই আমরা অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় নতুন গন্তব্যের খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। এবার আমাদের গন্তব্য ছিল নাপিত্তাছড়া ট্রেইল, যা চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাইয়ে অবস্থিত। সবার পরনে ছিল একই রঙের টি-শার্ট। বাসে চড়তেই শুরু হলো আড্ডা, গান আর গল্পের ঝড়। আমাদের প্রথম স্টপেজ ছিল মিরসরাই উপজেলার নদুয়ারি বাজার। বাস কুমিল্লায় কিছুক্ষণের জন্য বিরতি দিয়ে আবার চলতে শুরু করে। চলমান পরিস্থিতির কারণে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে সকাল ৫টার পরিবর্তে সাড়ে ৮টা বেজে যায়। গন্তব্যে পৌঁছে কাদা-মাটির রাস্তা ধরে এক কিলোমিটার হাঁটতে হলো। পথের ধারে গ্রাম্য হোটেল দেখে সেখানে সকালের নাশতা সেরে নিলাম। তারপর কিছুদূর হেঁটে পৌঁছালাম নাপিত্তাছড়া ট্রেইলের প্রবেশমুখে। প্রবেশ টিকিট কেটে ট্র্যাকিং শুরু করলাম। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় ঝিরিপথ ধরে এগিয়ে চললাম। ইট-পাথরের আবদ্ধ ক্লাসরুম আর শহুরে যান্ত্রিক কোলাহল থেকে বেরিয়ে আমরা যেন অন্য এক জগতে এসে পৌঁছলাম। 

চারপাশে সবুজের সমারোহ, পাখির কিচিরমিচির ডাক, পাহাড়ের মাঝখানের ঝিরিপথের ছোট-বড় পাথরের ফাঁকে প্রবাহিত পানির শব্দ—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব অনুভূতি। ১ ঘণ্টা ট্র্যাকিং করার পর আমরা টিপরা খুমের দেখা পেলাম, এটি একটি ক্যাসকেড। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে পাশের রাস্তা ধরে পাহাড়ের ওপরে উঠতে শুরু করলাম এবং পৌঁছলাম কুপিকাটা খুমে। এখান থেকেই শুরু হলো কঠিন পথ। খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে, একটু এদিক-ওদিক হলেই বিপদ। প্রস্তুতি হিসেবে আমরা ঢাকা থেকে ক্লাইম্বিং রোপ এবং ট্র্যাকিং স্যান্ডেল নিয়ে এসেছি, যা আমাদের পাহাড়ি রাস্তায় পাথরের ওপর পথচলায় সহায়তা করবে। আমরা একে একে রোপ ধরে ওপরে উঠতে শুরু করলাম। ওপরে উঠে কিছুদূর এগিয়ে আবার ঝিরিপথের দেখা পেলাম, সেই পথ ধরে দলবেঁধে এগোতে থাকলাম। এবার ক্লাব থেকে গোলাপি রঙের টি-শার্ট বাছাই করা হয়েছিল। সবাই গোলাপি টি-শার্ট পরায়, সবুজ পাহাড় আর ঝিরিপথের মাঝে সবাইকে অনন্য লাগছিল। সেখানে অগণিত মানুষের নজর কেড়ে নিয়েছিলাম আমরা। আরো ৪০ মিনিটের ট্র্যাকিং শেষে আমরা এসে পৌঁছলাম আমাদের সর্বশেষ গন্তব্য মিঠাছড়া ঝরনায়। 

গত রাতের বৃষ্টির কারণে ঝরনা যেন তার পূর্ণ যৌবন নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হলো। এত দূর ট্র্যাকিং করার ক্লান্তি এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। ঝরনার পানি সবুজ অরণ্যবেষ্টিত পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ার শব্দে সবাই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। বেশ কিছুক্ষণ ঝরনার স্নিগ্ধতায় মুগ্ধ হয়ে থাকার পর ঘড়ির কাঁটায় দেখলাম সময় ৩টা। কখন এত বেলা হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। কারোরই ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিল না, কিন্তু ফিরতে তো হবেই। আবার দলবেঁধে ট্র্যাকিং শুরু করলাম। নামার রাস্তা আরো ভয়াবহ, পিচ্ছিল পথ সঙ্গে খাড়া আঁকাবাঁকা রাস্তা। ক্লাবের অভিজ্ঞ ট্র্যাকাররা বাড়িয়ে দিয়েছিল তাদের হাত, সবার মধ্যে যেন একতা জেগে উঠেছিল সেদিন। সেই ঐকতানে হাঁটতে হাঁটতে ২ ঘণ্টা পর খাবারের হোটেলে ফিরে এলাম। ঘড়িতে তখন বিকাল ৫টা। দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করি। রাত ১২টায় ঢাকায় পৌঁছে সবাইকে বিদায় জানিয়ে যার যার বাসায় ফিরে যাই, আবার শুরু হয়ে গেল  যান্ত্রিক শহরের ব্যস্ততা। এ ভ্রমণ শুধু পাহাড়-ঝরনা দর্শন ছিল না, এটি ছিল প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের আত্মার মেলবন্ধন। সবুজের মাঝে হারিয়ে গিয়ে ক্লান্তি ভুলে, নতুন উদ্যমে ফিরে এলাম আমরা। মন বলছে, এ রকম আরো অনেক অ্যাডভেঞ্চার আমাদের অপেক্ষায়।


আশিকুর রহমান

ভাইস প্রেসিডেন্ট, ইউল্যাব অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব