মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি বিভাগে পড়লে শিক্ষার্থীরা নানাবিধ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে নিজেকে বহুমাত্রিক দক্ষতায় যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারে এবং বিস্তৃত ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পায়—সরকারি, বেসরকারি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থায়। এছাড়া তারা নীতিনির্ধারণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত, সমুদ্র জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সহায়তা করতে সক্ষম হয়

একাডেমিকভাবে মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি বলতে কী বোঝায়?

বিষয়টি বুঝতে হলে দুটি অংশ আলাদাভাবে দেখতে হবে। প্রথমত, মেরিন ফিশারিজ হলো সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলের মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক জীবসম্পদ নিয়ে পড়াশোনা। এখানে শেখানো হয় তাদের জীববিদ্যা, প্রজনন, অভিবাসন, রোগবালাই, আহরণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা। দ্বিতীয়ত, ওশানোগ্রাফি হলো সমুদ্রবিজ্ঞান, যেখানে সমুদ্রের ভৌত, রাসায়নিক, জীব ও ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করা হয়। যেমন—স্রোত, ঢেউ, জোয়ার-ভাটা, পানির লবণাক্ততা, সামুদ্রিক পরিবেশ, দূষণ, পুষ্টি উপাদান, প্ল্যাঙ্কটন থেকে শুরু করে বড় সামুদ্রিক প্রাণীর জীবনচক্র, এমনকি সমুদ্রতলের খনিজ সম্পদ। অর্থাৎ, সমুদ্র কীভাবে কাজ করে, কোন কোন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটে তা জানার বিজ্ঞান হলো ওশানোগ্রাফি।

মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি হলো সাগর ও উপকূলভিত্তিক মাছ ও সামুদ্রিক জীবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ, সামুদ্রিক পরিবেশ ও ইকোসিস্টেম গবেষণাবিষয়ক একটি বহুমাত্রিক শাস্ত্র। সহজভাবে বললে, সমুদ্র, সামুদ্রিক পরিবেশ এবং মৎস্য ও সামুদ্রিক জীবগুলো নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক পড়াশোনাই হলো মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি। বিষয়টি শিক্ষার্থীদের শেখায় কীভাবে সমুদ্র, সামুদ্রিক পরিবেশ এবং তার মৎস্য ও জীবসম্পদকে একসঙ্গে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝা, ব্যবহার ও টেকসইভাবে সংরক্ষণ করতে হয়।

কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশ একটি সমুদ্রসীমাবিশিষ্ট দেশ, যার প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক জলসীমা রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলভাগে রয়েছে প্রচুর মৎস্যসম্পদ, গ্যাস-তেল, খনিজ ও পরিবেশগত সেবা। এ সম্পদকে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যবহার, সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য দক্ষ জনবল প্রয়োজন। মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি বিশেষজ্ঞরা সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ, খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ব্লু ইকোনমি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও পরিবেশ দূষণ মোকাবেলায়ও এ জ্ঞান অপরিহার্য।

এ সাবজেক্টে পাঠ্যক্রমে কী কী পড়ানো হয়?

মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি অত্যন্ত বহুমাত্রিক শাস্ত্র। এখানে শিক্ষার্থীরা সমুদ্র, জীবসম্পদ, পরিবেশ ও প্রযুক্তির বিস্তৃত ক্ষেত্র নিয়ে পড়াশোনা করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো ফিশারিজ ওশানোগ্রাফি—সমুদ্রের ভৌত ও পরিবেশগত প্রক্রিয়া কীভাবে মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর বণ্টন, অভিবাসন ও প্রজননকে প্রভাবিত করে তা বিশ্লেষণ। মেরিন ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবহার, স্টক অ্যাসেসমেন্ট, কোটা নির্ধারণ, ওভারফিশিং প্রতিরোধ। সমুদ্র দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, তেল দূষণ ও তার পরিবেশগত প্রভাব। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, খাদ্যশৃঙ্খল, ইকোসিস্টেম ডায়নামিকস। ওশানোগ্রাফির মধ্যে চারটি পার্ট রয়েছে—ফিজিক্যাল, কেমিক্যাল, বায়োলজিক্যাল ও জিওলজিক্যাল ওশানোগ্রাফি। এখানে স্রোত, ঢেউ, জোয়ার-ভাটা, সমুদ্র তাপমাত্রা, পানির লবণাক্ততা, পিএইচ, পুষ্টি উপাদান ও গ্যাস, প্ল্যাঙ্কটন, শৈবাল, মাছ ও অন্যান্য জীবের জীবনচক্র ইত্যাদি সম্পর্কে পড়ানো হয়।

এছাড়া সমুদ্রতলের গঠন, খনিজ সম্পদ, নৌ-পরিবহন, জাহাজ চলাচল ও সমুদ্রপথে অপারেশনাল প্রযুক্তি, আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অভিযোজন ও ঝুঁকি হ্রাস, স্যাটেলাইট ডাটা ব্যবহার করে সমুদ্র পর্যবেক্ষণ ও মডেলিংয়ের মাধ্যমে পূর্বাভাস তৈরি, দূষণকারীর প্রভাব মূল্যায়ন, ঝুঁকি নিরূপণ ও নিয়ন্ত্রণ কৌশল, সামুদ্রিক সম্পদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, উদ্ভাবন ও উদ্যোগ, আধুনিক জিনতত্ত্ব, জেনোমিকস, প্রোটিওমিকস ও বায়োটেকনোলজির প্রয়োগ ইত্যাদি বিষয়ে চার বছরের কোর্সে পড়ানো হয়।

একজন শিক্ষার্থী কেন এ বিষয়ে পড়াশোনা করবে?

বিষয়টি পড়লে শিক্ষার্থীরা নানাবিধ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে নিজেকে বহুমাত্রিক দক্ষতায় যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারে এবং বিস্তৃত ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পায়—সরকারি, বেসরকারি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থায়। এছাড়া তারা নীতিনির্ধারণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত, সমুদ্র জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সহায়তা করতে সক্ষম হয়। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মেরিন ইকোলজি, মেরিন বায়োটেকনোলজি, ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ফিশারিজ, পরিবেশ দূষণ ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষায়িত হতে পারে।

চাকরির ক্ষেত্র কোথায় কোথায়?

মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি বিষয়ে পড়াশোনা করে সরকারি-বেসরকারি বহুমুখী চাকরির সুযোগ রয়েছে। সরকারি চাকরির মধ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, ব্লু ইকোনমি সেল, বিসিএস মৎস্য ক্যাডার, বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, মৎস্য অধিদপ্তর ইত্যাদি। শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বিশ্ববিদ্যালয় ও সামুদ্রিক গবেষণা কেন্দ্রে কাজের সুযোগ রয়েছে। বেসরকারি খাতে মৎস্য শিল্প, প্রসেসিং প্লান্ট, হ্যাচারি ইত্যাদিতে অনেক দক্ষ জনবলের প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, ওয়ার্ল্ড ফিশ, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়ন, ইউএনডিপিতে বৈচিত্র্যময় ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে।

কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে পড়ানো হয়?

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি অথবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডিতে অধ্যয়ন করার সুযোগ রয়েছে।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ কেমন?

বিদেশে মেরিন সায়েন্স, ফিশারিজ ও ওশানোগ্রাফি বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ অত্যন্ত বিস্তৃত। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইউরোপ, জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সরকারি ও বেসরকারি স্কলারশিপ এবং গবেষণা তহবিল অর্জন করে উচ্চশিক্ষা লাভ করা যায়।

জাকির হোসেন

চেয়ারম্যান, মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি বিভাগ

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়