স্বাস্থ্যবিজ্ঞান-ভিত্তিক একটি বিশেষায়িত পেশা হলো ফার্মেসি। ওষুধ আবিষ্কার, গবেষণা, উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে রোগীর কাছে ওষুধের সঠিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রতিটি ধাপ এর অন্তর্ভুক্ত। ফার্মেসি বিভাগে অধ্যয়নের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধনে কাজ করার সুযোগ পান। এর মূল ভিত্তি হলো একটি ওষুধ কীভাবে সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করা হয় এবং রোগীর জন্য তা কতটা নিরাপদ ও কার্যকর হবে, সে সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করা। এ পেশার কর্মক্ষেত্রও অত্যন্ত বিস্তৃত; যার মধ্যে রয়েছে ওষুধ শিল্প, হাসপাতাল, ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এসব ক্ষেত্রে একজন ফার্মাসিস্ট তার জ্ঞান ও দক্ষতার মাধ্যমে মানুষের জীবন রক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। তাই ফার্মেসি শুধু একটি পেশা নয়, বরং মানবকল্যাণে নিবেদিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রত।

বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে ওষুধ শিল্প ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ফার্মেসি গ্র্যাজুয়েটদের চাহিদা অত্যন্ত ব্যাপক ও ক্রমবর্ধমান এবং এর মূল কারণ হলো তাদের অদ্বিতীয় দক্ষতার সমন্বয়। দেশের ৩০০-এর অধিক ওষুধ কোম্পানিতে গবেষণা ও উন্নয়ন, নতুন ফর্মুলেশন তৈরি, উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের পেশাদারত্ব অপরিহার্য। একইভাবে স্বাস্থ্যসেবা খাতে হাসপাতাল ফার্মাসিস্ট হিসেবে রোগীর ওষুধের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, কমিউনিটি ফার্মাসিস্ট হিসেবে জনগণের মধ্যে নিরাপদ ওষুধ ব্যবহারে সচেতনতা তৈরি এবং ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট হিসেবে চিকিৎসকের সঙ্গে সমন্বয় করে রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনা করায় তাদের গুরুত্ব অপরিসীম। শুধু দেশেই নয়, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও হাসপাতাল ও কমিউনিটি ফার্মাসিস্টদের ব্যাপক চাহিদা থাকায় বাংলাদেশী গ্র্যাজুয়েটদের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কাজের সুযোগ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। দেশ-বিদেশে বিভিন্ন ওষুধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালে রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট হিসেবে কর্মরত থাকার মাধ্যমে নিষ্ঠা ও সফলতার সঙ্গে নিজেদের দায়িত্বে আছেন।

24

স্বাস্থ্যসেবা খাতে ফার্মেসি গ্র্যাজুয়েটদের ভূমিকা বহুমাত্রিক ও অপরিহার্য। ওষুধ শিল্পে ওষুধের গবেষণা, উৎপাদন, নতুন ফর্মুলেশন তৈরি ও মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা প্রতিটি ওষুধের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। আবার হাসপাতাল বা ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট হিসেবে তারা সরাসরি রোগীর সেবায় যুক্ত থেকে সঠিক ওষুধ নির্বাচন, ওষুধের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ, ব্যবহারবিধি সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান এবং ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রোধে চিকিৎসকদের সহায়তা করেন। এর পাশাপাশি সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোতে কাজ করে তারা নকল ও ভেজাল ওষুধ প্রতিরোধ এবং বাজারে মানসম্মত ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া জনস্বাস্থ্য খাতে টিকাদান কর্মসূচি ও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতেও তারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন। ওষুধের আবিষ্কার থেকে শুরু করে এর যৌক্তিক ব্যবহার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ফার্মাসিস্টরা আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছেন।

চার বছর মেয়াদি ফার্মেসি স্নাতক প্রোগ্রাম সাধারণত আটটি সেমিস্টারে বিভক্ত, যেখানে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের মৌলিক শাখা থেকে শুরু করে ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সের বিশেষায়িত ক্ষেত্র পর্যন্ত একটি সমন্বিত পাঠ্যক্রমের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর ভিত্তি তৈরি হয় রসায়ন, জীববিজ্ঞান, অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি ও মাইক্রোবায়োলজির মতো মৌলিক বিজ্ঞান দিয়ে। মূল ফার্মেসি বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ফার্মাসিউটিক্স (ওষুধ প্রস্তুতি), ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি (ওষুধের রসায়ন), ফার্মাকোলজি (শরীরে ওষুধের ক্রিয়া), ফার্মাকোগনসি (প্রাকৃতিক উৎস থেকে ওষুধ) এবং ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পেশাগত জীবনের জন্য প্রস্তুত করতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফার্মেসি, বায়োটেকনোলজি, রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স, ফার্মাসিউটিক্যাল মার্কেটিং এবং আইন ও নৈতিকতার মতো বিষয়গুলোও পড়ানো হয়। পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রয়েছে নিয়মিত ল্যাবরেটরি অনুশীলন, ইন্ডাস্ট্রি বা হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ এবং চূড়ান্ত বর্ষে গবেষণামূলক থিসিস, যা একজন শিক্ষার্থীকে ওষুধ তৈরির বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের পাশাপাশি রোগীকে সঠিক পরামর্শ দেয়ার মতো পেশাগত দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে।

ফার্মেসি একটি বহুমুখী পেশা, যেখানে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী কাজের সুযোগ অত্যন্ত বিস্তৃত। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কেটিং বিভাগে বিপুল কর্মসংস্থান রয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট হিসেবে রোগীর সঠিক ওষুধ নিশ্চিত করা, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও গবেষণা এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাতেও কাজের সুযোগ দিন দিন বাড়ছে। ফার্মাসিস্টরা আরো যুক্ত হতে পারেন নতুন ওষুধ আবিষ্কারের মতো অগ্রগামী গবেষণামূলক ক্ষেত্রে, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের দেশগুলোতে রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট, ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট ও ড্রাগ রিসার্চার এবং মধ্যপ্রাচ্যে উচ্চ বেতনে হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ফাইজার, নোভার্টিস, রোচের মতো শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক কোম্পানিতে গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ থাকায় এ পেশাটি শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণার এক অনন্য সমন্বয়।

ফার্মেসি গ্র্যাজুয়েটদের জন্য বিদেশে স্নাতকোত্তর, পিএইচডি ও পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা করার সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি, ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেস, রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স ও ড্রাগ ডেভেলপমেন্টের মতো যুগোপযোগী বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিদ্যমান। বিশেষ করে জার্মানি, সুইডেন ও নেদারল্যান্ডসের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোতে স্বল্প টিউশন ফি বা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়ার ব্যবস্থা থাকায় এটি শিক্ষার্থীদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। ফুলব্রাইট, কমনওয়েলথ, ইরামাস+ এবং ডিএএডির মতো স্বনামধন্য স্কলারশিপগুলো এ পথকে আরো সহজ করে দেয়। শিক্ষার্থীরা সেখানে ড্রাগ ডিসকভারি, বায়োটেকনোলজি ও ন্যানোমেডিসিনের মতো অত্যাধুনিক বিষয়ে বিশ্বের সেরা ল্যাবগুলোতে গবেষণার সুযোগ পান, যা পড়াশোনা শেষে আন্তর্জাতিক ওষুধ কোম্পানি, হাসপাতাল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থায় একটি সফল ক্যারিয়ারের দ্বার উন্মোচন করে।

ফার্মেসি শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ গবেষণা। ওষুধের নকশা ও আবিষ্কার, প্রাকৃতিক উৎস থেকে নতুন উপাদান অন্বেষণ, ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি এবং ফার্মাকোকাইনেটিকসের মতো ক্ষেত্রে গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো ওষুধের কার্যকারিতা, নিরাপত্তা ও গুণগত মান বৃদ্ধি করে স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও ওষুধ শিল্পে জেনেরিক ওষুধের মানোন্নয়ন, নতুন ফর্মুলেশন তৈরি এবং রোগীর নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণার সুযোগ ক্রমেই বাড়ছে, যা শিক্ষার্থীদের পুঁথিগত বিদ্যার বাস্তব প্রয়োগে সহায়তা করে। অন্যদিকে বিদেশে পার্সোনালাইজড মেডিসিন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও বায়োটেকনোলজির মতো অত্যাধুনিক বিষয়ে বিশ্বমানের ল্যাবে গবেষণার সুযোগ পাওয়া যায়। এ গবেষণাগুলো শিক্ষার্থীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় যুগান্তকারী আবিষ্কারের অংশীদার হওয়ার সুযোগ করে দেয়, যা বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।

ড. মোহাম্মদ হুসেন শাহরিয়ার: অধ্যাপক ও চেয়ার, ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেস বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি