বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় রচনা করেছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রোবোটিকস দল ‘ইউআইইউ মেরিনার’। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন টেকনোলজি সোসাইটি আয়োজিত মেট রোভ কম্পিটিশন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৫-এ দেশের প্রথম দল হিসেবে অংশগ্রহণ করে। বিশ্বসেরা পাঁচ দলের তালিকায় স্থান করে নেয় তারা। এশিয়ার সেরা দলের সম্মান অর্জন করে বিশ্বের বুকে লাল-সবুজের পতাকাকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। এছাড়া দলটি টেকনিক্যাল ডকুমেন্টেশনে চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে মনোনীত হয়। প্রতিযোগিতার ফাইনাল রাউন্ড গত ১৭-২১ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের আলপেনার থান্ডার বে ন্যাশনাল মেরিন স্যাঙ্কচুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয়। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অ্যাডভান্সড আন্ডারওয়াটার রোবোটিকস অ্যান্ড অটোমেশন (এইউআরএ) ক্রু রোভ নির্মাণ করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রদর্শন করে। প্রতিযোগিতায় প্রতিটি দলকে আটটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। পণ্য প্রদর্শন, প্রকৌশল উপস্থাপনা, টেকনিক্যাল ডকুমেন্টেশন, বিপণন প্রদর্শন, সহযোগিতামূলক মিশন, কোম্পানির স্পেসিফিকেশন, করপোরেট রেসপনসিবিলিটি ও সেফটি। ‘ইউআইইউ মেরিনার’ দলটি পাইওনিয়ার ক্লাসের ১৩টি বিশ্বব্যাপী চূড়ান্ত দলের মধ্যে ৩৭৭ স্কোর পেয়ে সামগ্রিকভাবে পঞ্চম এবং এশিয়ায় প্রথম স্থান অর্জন করে।
প্রথম বাংলাদেশী দল
বিশ্বমানের গবেষণা, নিরলস প্রচেষ্টা ও শৃঙ্খলার সম্মিলনে গঠিত দলটি ছিল গত ২৫ বছরে প্রথম বাংলাদেশী দল, যারা এ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় কোয়ালিফাই করেছে। শুধু তা-ই নয়, এছাড়া প্রতিযোগিতায় ইউআইইউ টিম ১০০ স্কোরের মধ্যে ৮১ স্কোর করে সেরা টেকনিক্যাল ডকুমেন্টেশন চ্যাম্পিয়ন হয়, যা তাদের প্রকৌশল দক্ষতার স্বীকৃতি।

দল ‘ইউআইইউ মেরিনার’
রোবোটিকস দলের মূল সদস্যদের টিম লিড দিয়েছেন ইউআইইউর সিএসই বিভাগের শিক্ষার্থী আনিকা তাবাসসুম অরচি, প্রজেক্ট ম্যানেজার ছিলেন মো. ফারহান জামান, সফটওয়্যার ও কন্ট্রোল সিস্টেম লিড ও রোভ পাইলট মো. দারাইন খান, মেকানিক্যাল লিড দিয়েছেন মো. আলমগীর, লজিস্টিক লিড মো. মেহরাব হোসেন খান এবং মার্কেটিং লিড দিয়েছেন নাফিসা তাবাসসুম। এছাড়া ব্যাক এন্ড সাপোর্ট, টেস্টিং ও ডকুমেন্টেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন ইউআইইউ শিক্ষার্থী এএম জায়েদ আব্দুল্লাহ, ইফতেখারুল রিফাত, কুতুব আল বাকি, মুজাহিদুল ইসলাম, সাদিক হোসেন, শাহ মোহাম্মাদ সিম্যান, মুদ্দাসির ফাইয়াজ, শাকিল আহমেদ, মোহাম্মাদ জোবায়ের হোসেন, নুসরাত জাহান পিয়াল, অনিন্দিতা চাকমা, জেমস অ্যান্থনি, নাইমুল হক।
রোবট স্করপিয়ন
স্করপিয়ন নামে রোবটটির মূল কাজ ছিল পানির নিচে পাওয়ার কেবল সংযোগ করা, নির্দিষ্ট স্থানে পানির নমুনা সংগ্রহ করা, ডুবে যাওয়া জাহাজ শনাক্ত ও তার দৈর্ঘ্য পরিমাপ করা, জেলিফিশ ধরা এবং পানির নিচের সৌর প্যানেল পরিষ্কার করা। প্রতিযোগিতার মিশনগুলো অত্যন্ত জটিল ছিল জানিয়ে দলের নেতৃত্বে থাকা আনিকা তাবাসসুম অরচি বলেন, ‘প্রতিটি সাবসিস্টেম—থ্রাস্টার, সেন্সর, ক্যামেরা, ম্যানিপুলেটর—একসঙ্গে কোরিওগ্রাফির মতো কাজ করতে হয়েছে। আমরা আগেই প্রতিটি বিভাগকে সংহত করে এমন একটি সিস্টেম তৈরি করেছিলাম, যেখানে একটির পরিবর্তন অন্যটিকে প্রভাবিত না করেই সমন্বয় করত। যেকোনো সমস্যায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রস্তুতিও ছিল তাদের। আমরা পূর্বনির্ধারিত সংকেত, ব্যাকআপ অ্যাকশন পরিকল্পনা ঠিক করে রেখেছিলাম। এক সেকেন্ডও নষ্ট না করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।’ স্করপিয়ন নামে দলের রোবটটি তৈরি করা হয়েছে সম্পূর্ণ মডিউলার ডিজাইন অনুসরণ করে, যাতে প্রতিটি মিশনের জন্য আলাদা যন্ত্রাংশ সংযুক্ত করা যায়। রোভের প্রধান চালক ও সফটওয়্যার প্রধান মো. দারাইন খান বলেন, ‘পানির নিচে নিয়ন্ত্রণ একেবারেই ভিন্ন। একটা সামান্য ভুল কমান্ডে পুরো রোবট ব্যালান্স হারাতে পারে। তাই আমরা থ্রাস্টার কন্ট্রোলে সফট কার্ভ, ডেডজোন এবং হোভার-লক সিস্টেম তৈরি করেছি। এর মাধ্যমে রোবটকে নিখুঁতভাবে চলতে সাহায্য করেছে।’
পেছনের কারিগর
এ অসাধারণ সাফল্যের পেছনে দলে শুধু প্রতিভাবান শিক্ষার্থীরাই নন, ছিলেন অভিজ্ঞ ও দূরদর্শী মেন্টররাও। পুরো প্রকল্পে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এম রেজওয়ান খান এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. একেএম মুজাহিদুল ইসলাম (পরিচালক ও প্রধান মেন্টর), প্রভাষক ফাহিম হাফিজ (মেন্টর), প্রভাষক শেখ সাইফুর রহমান (মেন্টর)। প্রফেসর ড. এম রেজওয়ান খান বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীরা যেভাবে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে এবং সীমিত সম্পদের মধ্যেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। এটি শুধু ইউআইইউ নয়, বাংলাদেশের প্রযুক্তি শিক্ষার সামগ্রিক অগ্রগতির প্রমাণ।’ অধ্যাপক ড. একেএম মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘যেকোনো প্রতিযোগিতার সফলতা নির্ভর করে সংকল্প, একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, আত্মনিয়োগ, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা এ গুণাবলিগুলোর ওপর। ইউআইইউতে আমরা শিক্ষার্থীদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বিষয়ে গবেষণায় এবং হাতেকলমে প্রকৌশল শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে থাকি। ইউআইইউ মেরিনার তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।’










