ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঢাকা ছিল বিশ্বের অন্যতম সুন্দর পরিবেশের শহর। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে শহরের সামগ্রিক পরিবেশের দ্রুত অবনতি হয়েছে। ঢাকা শহর এখন প্রায় ‘লাইফ সাপোর্টে’ চলে গেছে। এর দ্রুত ও জরুরি চিকিৎসা বেশ জরুরি। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, বাংলাদেশের সব মহানগরীর নাগরিক সমস্যা যখনই চরম পর্যায়ে রূপ নেয় তখনই টক শো কিংবা লেখালেখিতে দেখা যায় সমাধান হিসেবে পরিকল্পিত ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ার কথা। তাই বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিষয়ের গুরুত্ব দিন দিন কীভাবে বাড়ছে এবং পরিকল্পিত ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে পরিকল্পনাবিদদের গুরুত্ব অপরিসীম, এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ মহল বিশেষত পলিসি মেকিং লেভেলে যারা আছেন তারা ঠিকই উপলব্ধি করতে পেরেছেন।
কারণ নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিষয়টি বহুমাত্রিক। ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিত্য, কৃষি, স্থাপত্য কত রকম বিষয়ে পড়াশোনা করা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু কোন বিষয়ে একজন শিক্ষার্থী পড়বেন, সেই সিদ্ধান্ত নেয়াই একজন শিক্ষার্থীর জন্য বেশ কঠিন কাজ।
নগর পরিকল্পনা কেন বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। একটি দেশের সার্বিক অবস্থা মাথায় রেখেই নগর পরিকল্পনা করতে হয়৷ আর সেই পরিকল্পনায় জনসংখ্যা, মাটির ধরন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনীতিসহ আরো অনেক কিছু বিবেচনায় রাখতে হয়৷। এছাড়া দেশের গ্রামীণ অংশে ব্যালান্স ডেভেলপমেন্ট, শহুরে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হয়। যে কারণে নগর, অঞ্চল কিংবা গ্রামীণ পরিকল্পনায় কাজের সুযোগ দিন দিন বাড়ছে।
বাংলাদেশে নগর পরিকল্পনার ইতিহাস নেহাত কম দিনের নয়, অর্ধশতাব্দীর বেশি সময়কালের। যদিও পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ও পরিকল্পিত নগরায়ণে সাফল্য উল্লেখযোগ্য নয়। ষাটের দশকের শুরুতে চারটি বিভাগীয় শহরে বিদেশী উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানের সাহায্যে মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুত করা হয়। যদিও ১৯১৭ সালে স্যার প্যাট্রিক গেডিস ঢাকা শহরের জন্য একটি প্ল্যান করেছিলেন। ১৯৫৯ সালে ঢাকা, ১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম, ১৯৬৬ সালে খুলনা এবং ১৯৮৪ সালে রাজশাহী শহরের জন্য মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা হয়। ২০ বছর মেয়াদি এসব মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী বেশকিছু অবকাঠামো, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা তৈরি করা হলেও সমগ্র পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আশির দশকে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে দেশের ৫০টি জেলা ও ৩৯২টি উপজেলা শহরের ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত লোকবল না থাকার কারণে এসব জেলা-উপজেলা শহরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়নি। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে শুরু হয় নতুন প্রজন্মের নগর পরিকল্পনা। এ দশকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ তাদের বিভাগীয় শহরগুলোয় শহরের কাঠামো পরিকল্পনা ও বিশদ এলাকা পরিকল্পনা নামে দ্বিস্তরবিশিষ্ট নগর পরিকল্পনা করতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে এলজিইডি আড়াই শতাধিক পৌরসভার পরিকল্পনা তৈরির কাজ করেছে।
চলার পথে একটি শহরের নানা সমস্যা আমাদের চোখে ধরা দেয়, পাশাপাশি সমাধানগুলোও স্বপ্নের মতো মনের আকাশে ভেসে বেড়ায়। নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা তাদের জন্যই, যারা নিজের জ্ঞানকে প্রয়োগের মাধ্যমে এমন সমস্যাগুলোর সমাধান বাস্তবে পরিণত করতে আগ্রহী। ছোটবেলা থেকেই আমরা অনেক সময় ভাবি—আমাদের চারপাশ, আমাদের শহর কিংবা আমাদের দেশটা যদি এমন না হয়ে অমন হতো! এ ভাবনাগুলোর সঙ্গে বাস্তবতার যোগসূত্র যারা দেখতে চায়, তাদের জন্যই এ বিষয়। অনেকেরই ক্লাসরুমের গণ্ডিতে বদ্ধ না থেকে জ্ঞানের পরিধি আরো বড় করার ইচ্ছা হয়। চারপাশ থেকে পাওয়া ধারণাগুলো নিয়ে অনেকে জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে চায়। কেউ কেউ চায় নিজের গ্রাম, নিজের শহরটাকে জেনে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে। এক্ষেত্রে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিষয়টি একটি সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে।
দেশের নগর পরিকল্পনাবিদদের জন্য রয়েছে জাতীয় পেশাজীবী সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে বিআইপি পরিকল্পনা শিক্ষার বিস্তৃতি, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে গবেষণাকর্ম পরিচালনাও পেশাগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধিসহ পরিকল্পিত নগরের দেশের নগর পরিকল্পনা সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশে পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনাবিদদের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রতিটা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যেমন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন অধিদপ্তর (সিডিএ), রাজশাহী উন্নয়ন অধিদপ্তর (আরডিএ), খুলনা উন্নয়ন অধিদপ্তর (কেডিএ), সব সিটি করপোরেশন, প্রতিটি পৌরসভা এবং পরিকল্পনা কমিশনে নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে যোগদান করতে পারেন। এছাড়া নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, ঢাকা ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন অথরিটি, ঢাকা/চট্টগ্রাম ওয়াসা, এলজিইডিসহ বিভিন্ন সেবাদানকারী সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ রয়েছে। আবার বিভিন্ন কনস্ট্রাকশন ফার্ম, কনসালট্যান্সি ফার্ম, এনজিওতে রয়েছে কাজের সুযোগ। প্রতিটি কনস্ট্রাকশন ফার্ম ও কনসালট্যান্সি ফার্মে স্বীকৃত প্ল্যানার থাকাটা এখন অনেকাংশেই বাধ্যতামূলক। এছাড়া বিভিন্ন রিয়েল এস্টেট এজেন্সি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় চাকরি ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। বর্তমান সময়ে নগর পরিকল্পনাবিদদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বেশকিছু আইএনজিও ও এনজিওর সঙ্গে যুক্ত থেকে বেশ সফলতার সঙ্গে কাজ করছে। এছাড়া দেশের গণ্ডি পার হয়ে দেশের পরিকল্পনাবিদরা উন্নত দেশগুলোতে বিভিন্ন গবেষণা ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছেন।
নগর পরিকল্পনায় উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশে ও বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ও প্রতিষ্ঠানে বেশ ভালো সুযোগ রয়েছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি শেষে গড়ে ৩০-৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান। অনেকাংশই উচ্চশিক্ষা শেষে বিদেশে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি চাকরির সুযোগ পেয়ে থাকেন। নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি হওয়ায় শিক্ষার্থীরা এর পাশাপাশি স্থাপত্য ও পুরকৌশলের মতো সম্পর্কিত বিষয়েও উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পেয়ে থাকেন।
দেশের যেকোনো দুর্যোগে, নাগরিক সমস্যায় কিংবা দুর্ঘটনায় টক শো, লেখালেখি কিংবা গল্পের টেবিলে আলোচনায় একটি সমাধানই বেশি শোনা যায় পরিকল্পিত ও টেকসই নগরী গড়ে তুলতে হবে এবং পরিকল্পিত বাংলাদেশই পারে সব নাগরিক সমস্যা সমাধানের। সেই পরিকল্পিত বাংলাদেশ গড়তে হলে নগর পরিকল্পনাবিদের বিকল্প নেই। তাই বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে দক্ষ ও যোগ্য নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলে আগামীর পরিকল্পিত ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, চুয়েট










