ঢাকার ব্যস্ত শহর ছেড়ে যখন মোংলার উদ্দেশে বাসে রওনা দিলাম তখন চারপাশে রাতের নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। জানালার বাইরে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাওয়া আলোর রেখায় মনে হচ্ছিল শহরের যান্ত্রিকতা থেকে দূরে এক নতুন জগতের দিকে এগিয়ে চলেছি। মোংলায় পৌঁছাতে ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ১টার কাছাকাছি। অন্ধকার আকাশে ঝকঝকে তারা আর নদীর শীতল বাতাস আমাদের ক্লান্তি মুছে দিচ্ছিল। নির্ধারিত জাহাজে উঠতেই সবার মনে এক ধরনের প্রশান্তি নেমে এল। নদীর হালকা ঢেউ আর জাহাজের মৃদু দুলুনি যেন ক্লান্ত শরীর আর মনের ওপর আরামের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিল। রাতের শেষাংশটা ঘুমিয়েই কাটালাম, যেন প্রকৃতি আমাদের পরের দিনের ভ্রমণের জন্য শক্তি সঞ্চয় করতে বলছে। ঘুম যখন ভাঙল তখন সুবহ সাদিকের আলোয় চারপাশ ভরে গেছে। জাহাজের ডেকে উঠে দাঁড়িয়ে দেখি, পুবাকাশে সূর্যের আগমনি বার্তা। ধীরে ধীরে কুয়াশা ভেদ করে আলো ছড়িয়ে পড়ছে নদীর বুকে। সুন্দরবনের যাত্রা শুরু হওয়ার এটাই ছিল আমাদের প্রথম উপহার।

চারপাশে ঘন কুয়াশার আস্তরণ। যেন পৃথিবী এক সাদা চাদরে মুড়ে দিয়েছে নিজেকে। জাহাজ যখন মৃদু ঢেউ ভেঙে বনের দিকে এগিয়ে চলছিল, আমরা সবাই প্রকৃতির শুদ্ধতাকে প্রাণভরে উপভোগ করছিলাম। নদীর পাড়ে হরিণের দল, মাঝে মাঝে পানিতে ভেসে থাকা কুমির আর নীল আকাশে পাখির আনাগোনা সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল যেন কোনো এক স্বপ্নপুরীতে প্রবেশ করেছি।
আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল সুন্দরবনের শেষ প্রান্ত কটকা। জাহাজ থেকে নামার পরই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতি যেন জাগ্রত হলো। প্রকৃতির এমন অপরূপ সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশংসা করলাম সেই মহান স্রষ্টার যিনি সারা জাহানের মালিক এবং যার অসীম কুদরতে সৃষ্টি হয়েছে এ অনিন্দ্য সুন্দরবন। সবুজ গাছপালার মাঝে ঝিকিমিকি আলো, দূরের সাগরের গর্জন আর কুয়াশায় ঢাকা প্রান্তর যেন এক স্বর্গীয় আবহ তৈরি করেছিল।
হঠাৎ পথিমধ্যে দেখা হলো বন পাহারাদারের সঙ্গে। তাকে দেখে কৌতূহলী হয়ে খুঁটিনাটি জানতে চাইলাম, বাঘ আছে কিনা, হরিণ কোথায় বেশি দেখা যায়, বনের কোন পথে চলা নিরাপদ ইত্যাদি। পাহারাদার একটি পুকুরের দিকে আঙুল তুলে সহাস্যে বললেন, তিনদিন আগে এখানেই বাঘ তার বাচ্চাদের নিয়ে পানি খেতে এসেছিল। কথাটা শুনে আমাদের গায়ে যেন শিহরণ বয়ে গেল। চোখের সামনে বাঘ না দেখলেও মনে হচ্ছিল প্রকৃতির একেবারে হৃদয়ে প্রবেশ করেছি। পাহারাদারের দেখানো পথে আমরা এগিয়ে চলতে লাগলাম। রিয়েল অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ নিতে সেই ট্রেইলে হাঁটা শুরু হলো। পথে শাল, গর্জন আর সুন্দরী গাছের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা পেলাম একদল চিত্রল হরিণের। হরিণের দল সাবলীল গতিতে দূরে ছুটে চলছিল আর আমরা মুগ্ধ চোখে সেই দৃশ্য দেখছিলাম। যদিও বাঘের দেখা আর পেলাম না, তবু জানতাম এ বনের প্রতিটি মুহূর্তই রহস্য আর বিস্ময়ে ভরা।
কটকার বন্য প্রকৃতি, দিগন্তজোড়া নীল আকাশ, বিস্তীর্ণ বঙ্গোপসাগর আর পায়ের নিচের মাটির দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো আমি যেন এ মহাজগতের এক বিন্দু মাত্র। পরের গন্তব্য ছিল জামতলা সি বিচ ও ডিমেরচর সি বিচ। এ বিচের সৌন্দর্য এমন যে চোখ বন্ধ করলেও মনে হয় সাগরের ঢেউয়ের সংগীত শুনতে পাচ্ছি। সাদা বালির এ সৈকত আর বিশাল সাগরের একাকিত্বে দাঁড়িয়ে মনে হলো জীবন কতটা ক্ষুদ্র। কোলাহলহীন এ পরিবেশে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল যেন সময় থেমে গেছে।
তৈয়েবুর রহমান: শিক্ষার্থী, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়










