শিক্ষাজীবনে অসামান্য অবদানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের দেয়া হয় চ্যান্সেলরস গোল্ড মেডেল বা রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক। গত শনিবার অনুষ্ঠিত বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) দ্বিতীয় সমাবর্তনে ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জনের জন্য আট শিক্ষার্থীকে দেয়া হয় চ্যান্সেলরস গোল্ড মেডেল। এছাড়া একই দিনে অনুষ্ঠিত ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) ২৫তম সমাবর্তনে দুই শিক্ষার্থী পান এ স্বর্ণপদক। উচ্চশিক্ষায় অনন্য মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ শিক্ষার্থীদের স্বর্ণপদক জয়ের পেছনের গল্প শুনেছেন শফিকুল ইসলাম

সফলতা প্রতিদিনের ছোট ছোট প্রচেষ্টার ফল

মো. রাকিবুল ইসলাম

অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, স্নাতকে সিজিপিএ: ৩.৯৯

The future depends on what you do today—মহাত্মা গান্ধীর এ উক্তি আমাকে আজও অনুপ্রাণিত করে। আমার নিয়মিত আন্তরিক পরিশ্রমের ফলাফল আজকের এ অর্জন। যারা সফল হতে চায়, তাদের জন্য আমার বার্তা—সফলতা প্রতিদিনের ছোট ছোট প্রচেষ্টার ফল। আন্তরিকভাবে পরিশ্রম করবেন আর নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখবেন। আজকের কঠোর পরিশ্রমই আগামী দিনের সফলতা নির্ধারণ করবে। আমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকায়। স্কুল ও কলেজ দুটোই বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ। স্নাতকে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করে রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক পাওয়া নিঃসন্দেহে আমার ব্যক্তিজীবনের এখন পর্যন্ত সব থেকে বড় অর্জন। আমার এ অর্জন বাবা, মা ও শিক্ষকদেরই অবদান। আর তাদেরই উপস্থিতিতে স্বর্ণপদক প্রাপ্তির মুহূর্তটি ছিল আনন্দের, একই সঙ্গে আবেগঘন।

আমার এ অর্জনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে চারটি বিষয়। প্রথমত, নিয়মিত অধ্যয়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ, দ্বিতীয়ত লক্ষ্য স্থির রেখে ধারাবাহিক পরিশ্রম, তৃতীয় মা-বাবা ও শিক্ষকদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা এবং সঠিক পরিকল্পনা ও সময় ব্যবস্থাপনা। আর এসবের থেকেও জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন আমার মা। পড়াশোনাসংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্তে তিনি আমার ইচ্ছার সবসময় প্রাধান্য দিয়েছেন। নিরন্তর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।

তবে শিক্ষাজীবন যে খুব সহজ ছিল তাও নয়। অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে পারিবারিক ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে নিজের লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থাকা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। যারা ভালো ফলাফল অর্জন করতে চায় তাদের জন্য আমার পাঁচটি পরামর্শ থাকবে। লক্ষ্য ঠিক করুন এবং সেটির জন্য নিয়মিত কাজ করুন। পড়াশোনাকে চাপ হিসেবে না দেখে শেখার আগ্রহ রাখুন। সঠিক পরিকল্পনা ও সময় ব্যবস্থাপনা করুন। শিক্ষকদের গাইডলাইন মেনে চলুন, প্রয়োজনে সাহায্য নিন। স্মার্ট স্টাডি করুন—শুধু পরিশ্রম নয়, কৌশলগত পড়াশোনাও জরুরি।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সময়ের সঠিক ব্যবহার ও মানসিক চাপ মোকাবেলা

ফারিয়া আফরিন

টেক্সটাইল বিভাগ, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, স্নাতকে সিজিপিএ: ৩.৯৯

রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক পাওয়ার অনুভূতি এক কথায় বর্ণনা করা কঠিন। এটি আমার জন্য এক বিশাল গর্বের বিষয়। এ পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে আমি শুধু নিজের নয়, বরং আমার পরিবার ও শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রমের সঠিক মূল্যায়ন পেলাম। এ অর্জনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে আমার কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও শিক্ষকদের অবিরাম সহায়তা। তাদের দিকনির্দেশনা এবং আমার নিজস্ব মনোযোগ আমাকে এ অবস্থানে পৌঁছতে সাহায্য করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন আমার মা-বাবা। তারা আমাকে সর্বদা উৎসাহিত করেছেন, আমাকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং কঠিন সময়ে মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন। তাদের সহায়তা ছাড়া এ অর্জন সম্ভব ছিল না।

শিক্ষাজীবনে আমি বেশকিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছি। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং মানসিক চাপ মোকাবেলা করা। অনেক সময় কঠিন পরিস্থিতিতে পড়লেও আমি চেষ্টা করেছি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যেতে। যারা ভালো ফলাফল অর্জন করতে চায়, তাদের জন্য আমার পরামর্শ—নিয়মিত অধ্যয়ন, মনোযোগ এবং ধৈর্য ধরে পড়াশোনা করুন। শিক্ষকদের পরামর্শ গ্রহণ করুন। আত্মবিশ্বাসী থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি কেবল এটাই বলতে চাই যে শেখার কোনো বিকল্প নেই। যারা নিজের লক্ষ্য স্থির করে কাজ করে তারা একদিন সফল হবেই।

স্বপ্নের পেছনে ছুটুন

সামিয়া আক্তার

ফার্মেসি বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি), স্নাতকে সিজিপিএ: ৪.০০

এত গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে স্বর্ণপদক পাওয়া সত্যিই অসাধারণ। বিশেষ করে ফার্মেসি বিভাগের হয়ে এ অর্জন সবচেয়ে বেশি আনন্দের। কারণ বিভাগটি তুলনামূলক অন্য বিভাগের চেয়ে নতুন। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া এ অর্জন সম্ভব ছিল না। আমার জন্য একটি অ্যাডভান্টেজ ছিল আমি ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষার্থী ছিলাম। সে জন্য পড়াশোনায় খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। ফলাফলে এটিই বড় প্রভাব ফেলেছে। যদিও শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হবে তবে এটা সত্যি যে আমি ব্যাকবেঞ্চার ছিলাম। পরীক্ষার আগের দিন পড়তে বসতাম। যখন দেখতাম কোনো কোর্স বেশি কঠিন সেটা এক সপ্তাহ আগে থেকে স্টাডি করতাম। নোট করে রাখতাম আলাদা করে। পড়াশোনার বাইরেও অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। আমি এগিয়ে গিয়েছি। যারা ভালো ফলাফল করতে চায় তাদের জন্য একটাই পরামর্শ ফোকাসড থাকুন। আপনার চারপাশে নেতিবাচক কোনো কিছু নিজেকে স্পর্শ করতে দেবেন না। স্বপ্নের পেছনে ছুটুন। আমি ছোটবেলা থেকে বাবা-মা ও আশপাশের অনেক মানুষের অসুস্থতা দেখেই ফার্মাসিস্ট হওয়ার স্বপ্ন বুনি। এখন জিনোম সিকুয়েন্সিং নিয়ে পড়াশোনা করতে চাই। রোগ-বালাই কীভাবে প্রাথমিক পর্যায়েই প্রতিরোধ করা যায় সেটি নিয়ে কাজ করব। নতুন ওষুধ আবিষ্কারে গবেষণা করতে চাই।

স্বর্ণপদক বিজয়ী মা-ই অনুপ্রেরণা

রাবিয়াহ বিনতে হোসাইন

ইংলিশ অ্যান্ড মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি), স্নাতকে সিজিপিএ: ৪.০০

পুরস্কার পেয়ে আমি সত্যিই গর্বিত। আমি যখন প্রথম আইইউবিতে ভর্তি হই কখনেই কল্পনা করিনি যে চার বছরের অধ্যবসায় এ সোনালি মুহূর্তটি উপহার দেবে। যাত্রাটি চ্যালেঞ্জিং ছিল, তবে শেখার মাধ্যমে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছি। আমার এ অর্জনের সব কৃতিত্ব সর্বশক্তিমান আল্লাহর। সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর ছিল সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করা। আমি না বলতে শিখেছি—অপ্রয়োজনীয় সামাজিক অনুষ্ঠান, এমনকি পারিবারিক দাওয়াতেও। কারণ আমি জানতাম আমি কী লক্ষ্যে কাজ করছি। শুধু কঠোর অধ্যয়ন নয়, বরং প্রতিদিন স্মার্ট চয়েজের একটা ব্যাপার আছে। নিজের আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি, হতাশা, সংশয় অনেক কিছুরই সম্মুখীন হয়েছি কিন্তু আমি নিজেকে মনে করিয়ে দিতাম যদি আমি এখন থামি, তবে সব ত্যাগ বিফলে যাবে। আমার পরিবার, বিশেষ করে আমার মা সামনে এগিয়ে যাওয়ার এ মনোবল তৈরি করে দিয়েছিলেন। আমার বাবা-মা, শিক্ষক এবং বন্ধুরা আমার পড়াশোনায় সমর্থন জুগিয়েছে। আমার ভাই এবং বোন প্রতিটি চ্যালেঞ্জে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। আমার প্রতি আমার মায়ের অটুট বিশ্বাস ছিল আমার শক্তি ও অনুপ্রেরণার সবচেয়ে বড় উৎস। মা একজন স্বর্ণপদক বিজয়ী ছিলেন এবং তার গল্প আমাকে সবসময়ই নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণে অনুপ্রাণিত করেছে।

আমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে একটি ছিল কঠোর সময়সীমা মেনে চলা। আমার আগ্রহ নেই কিন্তু বাধ্যতামূলক এমন কিছু কোর্সের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়া। সংশয় ও অনিশ্চয়তার অনেক সময় পার করেছি কিন্তু আমি থেমে যাইনি। পেছনে ফিরে তাকালে আমি সত্যিই বিশ্বাস করি যে আল্লাহ আমাদের জন্য সবকিছু সহজ করে দেন, যখন আমরা চেষ্টা করি এবং বিশ্বাস রাখি। যারা ভালো ফলাফল করতে চায় তাদের জন্য আমার পরামর্শ হলো পিতামাতার কথা শুনুন এবং লক্ষ্যে স্থির থাকুন। কনসার্ট, সিনেমা, খেলাধুলা—সামনে অনেক কিছু থাকবে কিন্তু মনোযোগ স্থির রাখতে হবে এবং আপনার অগ্রাধিকারগুলো গুরুত্ব দিতে হবে। শৃঙ্খলা ও কাজের ধারাবাহিকতা আপনাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখবে। আপনি যদি লক্ষ্যচ্যুত না হয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারেন, সাফল্য আপনাকেই অনুসরণ করবে।