জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ। এক নীরব সংগ্রামের ভেতর দিয়ে পথচলা শুরু। পর্যাপ্ত শ্রেণীকক্ষ নেই, নেই আধুনিক ল্যাব, হাতেকলমে চলচ্চিত্রচর্চার উপযোগী পরিকাঠামোও নেই। সরঞ্জাম অপ্রতুল, বাজেট সামান্য আর বেশির ভাগ কোর্স ফিল্মই তৈরি হয় শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত অর্থায়নে। সেই বাস্তবতার ভেতর থেকেও এ বছর প্রথমবারের মতো এ বিভাগের শিক্ষার্থীরাই জাতীয় চলচ্চিত্র অনুদানের তালিকায় নিজেদের নাম লিখিয়েছে। ‘একটি সিনেমার জন্য’ এবং ‘Who Has Made Us Fly’—এ দুই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ২০২৫ সালের জাতীয় অনুদানের ২০টি নির্বাচিত চলচ্চিত্রের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। প্রতিটি চলচ্চিত্র পেয়েছে ২০ লাখ টাকার সরকারি অনুদান। শিক্ষার্থীদের কাছে এটা ছিল স্বপ্নের মতো। এ অনুদানের নিয়মকানুন শেখা, আবেদনপত্র তৈরি করা, নানান প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বোঝা—সবকিছুই করতে হয়েছে তাদের নিজেদের চেষ্টায়।
‘একটি সিনেমার জন্য’ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের প্রযোজক স্নাতকোত্তরের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাদমান শিহির। গল্প, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন একই বর্ষের শিক্ষার্থী রাবি আহমেদ। সহকারী পরিচালক হিসেবে আছেন চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আদনান মাহমুদ সৈকত। বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা সহকারী পরিচালনা, কস্টিউম, মেকআপসহ নানা বিভাগে একত্রে কাজ করছেন। শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে এ সিনেমা তৈরির ক্ষেত্রে গড়ে উঠেছে এক ধরনের একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবরেশন। যুক্ত হয়েছেন দেশের স্বনামধন্য অভিনয়শিল্পীরাও। ৩০ মিনিট দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য প্রায় শেষ, প্রি-প্রডাকশনের কাজ চলছে। জানুয়ারিতে ঢাকার বিভিন্ন লোকেশনে শুটিং শুরু হবে। এ সাফল্যে শিক্ষকরা গর্বিত হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছিল নামমাত্র। সাদমান শিহির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা খুব বেশি নেই; জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ অনেকটাই অবহেলিত। তহবিল নেই, ল্যাব নেই, সরঞ্জাম নেই। কোর্স ফিল্মও করতে হয় বাবা-মায়ের টাকায়। তবে শিক্ষকরা আমাদের উৎসাহ দিয়েছেন এটাই বড় অনুপ্রেরণা।’
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘Who Has Made Us Fly’-এর গল্প শুরু হয়েছিল আরো বড় স্বপ্ন থেকে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে নয়জন শিক্ষার্থীর নয়টি ঘরানার নয়টি স্বল্পদৈর্ঘ্য নিয়ে একটি অ্যান্থোলজি নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এ চলচ্চিত্রটি ছিল সেই প্রকল্পের কমেডি ঘরানার অংশ। লজিস্টিকস ও জটিলতার কারণে অ্যান্থোলজিটি আর বানানো হয়নি। কিন্তু চলচ্চিত্রটি বাতিল হয়নি—শিক্ষার্থীরা এটিকে স্বাধীন প্রকল্প হিসেবে পুনর্গঠন করে বিভিন্ন জায়গায় কো-প্রডাকশনের জন্য পাঠান। এর মাঝেই আসে জাতীয় অনুদান ২০২৪-২৫-এর ঘোষণা। এ বছর গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে বিশেষ একটি শাখা রাখা হয়। তারা সুযোগটি কাজে লাগান এবং চলচ্চিত্রটি এ শাখায় অনুদান পায়। আবহমান বাংলার সব রাজনৈতিক অভ্যুত্থান, আন্দোলন ও বিপ্লব নিয়ে অনুদান পাওয়া চলচ্চিত্রটির প্রি-প্রডাকশন প্রায় শেষ, ডিসেম্বর থেকে ঢাকায় শুটিং শুরু হবে। এটির চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় আছেন চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শাহ শাকিব সোহান। সঙ্গে রয়েছেন এ বিভাগেরই বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম সাবিত, শিহাব সরার নিহাল, জোহান, রুদ্র ব্যানার্জি, কাব্য কাবির, আরিফুর রহমান, তানহা তাবাসসুম ও সৃজন পাল। তারা সেট ডিজাইন, কস্টিউম, সহকারী পরিচালনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ সামলাচ্ছেন।
শাহ শাকিব সোহান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলচ্চিত্র নির্মাণে আমি আগেই কাজ করছিলাম, তাই অনেকে আমাকে চিনতেন। বিভাগ আমাকে সবসময়ই সমর্থন দিয়েছে। বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমনকি বিদেশেও শুটিংয়ে গিয়েছি আমি, বিভাগ থেকে কখনো বাধা পাইনি, বরং সবাই উৎসাহ দিয়েছে।’
সার্বিক বিষয়ে বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর সামির আহমেদ বলেন, ‘আমি আট বছর ধরে পড়াচ্ছি। আমাদের বিভাগ সবসময়ই অবহেলিত। বারবার প্রস্তাব পাঠিয়েও খুব বেশি বাজেট পাওয়া যায় না। ১-২ লাখ টাকা পাওয়া যায়। সেটাও ল্যাপটপ, ক্যামেরা ইত্যাদি কিনতেই শেষ হয়ে যায়। এতগুলো শিক্ষার্থীর জন্য তা মোটেও যথেষ্ট নয়। তবু আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। এত বাধা পেরিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ে জায়গা করে নিয়েছে—এটা আমাদের জন্য গর্বের।’










