দিনাজপুরের নির্জন প্রান্তরে বিকালের শেষ আলো মিশে যাচ্ছিল পাহাড়ের আড়ালে। হঠাৎ করেই যেন অন্য এক জগতে প্রবেশের ডাক পেলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। মাথায় হেলমেট, পায়ে সেফটি স্যু, বুকের ভেতর দুরুদুরু স্পন্দন। ধীরে ধীরে নামতে নামতে একসময় দাঁড়ালেন প্রায় দেড় হাজার ফুট গভীরে। ওপরে কোটি কোটি টন মাটি আর চারপাশে অজানা অন্ধকার। ভয়ের সঙ্গে মিশে থাকা রোমাঞ্চ এবং বিস্ময় তাদের পাঠ্যবইয়ের ধারণাকে ছাড়িয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।

চুয়েটের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং (পিএমই) বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য তিন দিনব্যাপী এ শিক্ষা সফরের আয়োজন করা হয়। ১৩ সেপ্টেম্বর বেলা আড়াইটায় চুয়েট ক্যাম্পাস থেকে দিনাজপুরের উদ্দেশে রওনা দেন ২৫ জন শিক্ষার্থী এবং তিনজন শিক্ষক। প্রথম গন্তব্য ছিল বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি। সেখানে শিক্ষার্থীরা কয়লা উত্তোলনের পদ্ধতি, বায়ু চলাচল ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা প্রটোকল সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন।

পরদিন তারা পৌঁছান পার্বতীপুর উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানিতে। দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ গ্রানাইট খনিতে প্রবেশ করে নেমে যান প্রায় ৮৮৫ ফুট নিচে। এখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি, পাথর ভাঙার প্রক্রিয়া এবং শ্রমিকদের কাজের ধাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন শিক্ষার্থীরা। অজানা অন্ধকারের সঙ্গে যন্ত্রের শব্দ এবং শ্রমিকদের নিয়মতান্ত্রিক কাজ মিলে একটি বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

9

শিক্ষার্থী খাদিজা আক্তার তামান্না বলেন, ‘অবশ্যই এটা আমাদের জন্য ছিল ভিন্নধর্মী এক অভিজ্ঞতা। হাজার ফুট মাটির নিচে ঘুরে আসার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে। একজন শিক্ষার্থীর জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় প্রাপ্তি। এ ধরনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভিজিটের মাধ্যমে আমাদের কর্মক্ষেত্রের সুযোগও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শুধু তা-ই নয়, যেসব বিষয় আমরা বই থেকে পড়ি, সেগুলো সামনে থেকে দেখা সত্যিই অনেক বড় অর্জন।’

আরেক শিক্ষার্থী মুহাইমিনুল ইসলাম নাঈম বলেন, ‘আমাদের তিনদিনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুরে আমরা বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ও মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি ভিজিট করেছি। কয়লা খনিতে প্রায় ১ হাজার ৬০০ ফুট ও মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনে ৮৮৫ ফুট মাটির নিচে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমাদের। ক্লাসে আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিং সম্পর্কে লেকচার শোনা থেকে সশরীরে ভূগর্ভের এত গভীরে গিয়ে জিনিসগুলো দেখা একটা অন্যরকম অনুভূতি। বাস্তবিক জ্ঞান অর্জনের জন্য এ রকম ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভিজিট নিয়মিত আয়োজন করলে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের জন্য খুব কার্যকর হবে বলে আমি মনে করি।’

পিএমই বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. এএসএম সায়েম বলেন, ‘সাধারণত খনির নিচে সরাসরি যাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। তাই শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি দুর্লভ সুযোগ। আমাদের বিভাগে খনিসংক্রান্ত অনেক কোর্স তাত্ত্বিকভাবে পড়ানো হয়, কিন্তু বাস্তবে এমন অভিজ্ঞতা পাওয়া এই প্রথম। আমরা আন্ডারগ্রাউন্ডে কয়লা খনি ও গ্রানাইট খনি—দুটিই সরজমিনে পরিদর্শন করেছি। এ অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পেশাগত জীবনে এবং বাস্তব জ্ঞান অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’