অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান। দেশে প্রথমবারের মতো চালু হওয়া এ বিভাগটির প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক। ড. ফারুক এশিয়ান সোসাইটি অব ভিকটিমোলজির এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড ভিকটিমোলজির সভাপতি। সম্প্রতি তিনি বিভাগটি প্রতিষ্ঠার গল্প ও ক্যারিয়ারের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম
দেশে নতুন সাবজেক্ট হিসেবে ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ চালুর গল্পটি জানতে চাই।
টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (মাভাবিপ্রবি) ২০০৩-০৪ সেশন থেকে ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগটি চালু হয়। বাংলাদেশে বিভাগটি সর্বপ্রথম চালু করা হয়। বিভাগটি চালুর স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন মাভাবিপ্রবির প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইউসুফ শরীফ আহমেদ খান। তার হাত ধরেই বিভাগটি চালু করা হয়। তার এ বিভাগটি চালুর পেছনে অন্যতম বিষয় ছিল যে বাংলাদেশে এত অপরাধ হয় কিন্তু সেটি নিয়ে একাডেমিক ডিসকোর্স নেই, যেটি অন্যান্য দেশে অনেক আগেই শুরু হয়েছে। যেমন প্রতিবেশী দেশ ভারতে ১৯৫৬ সালে ক্রিমিনোলজি বিষয়ে একাডেমিক প্রোগ্রাম চালু হয়। অধ্যাপক ড. ইউসুফ শরীফের স্বপ্ন ছিল দেশে এমন একটি ডিসিপ্লিন ডেভেলপ করুক যেখানে ফরেনসিক, ক্রিমিন্যাল ইনভেস্টিগেশন, ল এনফোর্সমেন্ট স্কিলড ব্যক্তি তৈরি হবে, যারা জাতিকে সেবা দেবে এবং বৈজ্ঞানিকভাবে ইনভেস্টিগেশন করার জন্য যে যোগ্যতা, দক্ষতা দরকার তারা এখান থেকে অর্জন করে সরাসরি পুলিশে নিয়োগ হবে। এটি ছিল তার স্বপ্ন। যদিও এটি সরকারের পলিসির ব্যাপার। বিভাগ চালুর কিছুদিন পরই অধ্যাপক ড. ইউসুফ শরীফ মারা যান। মাভাবিপ্রবির সারা দেশে পরিচিতি দিয়েছে এ ব্যতিক্রমী বিভাগটি।
বিভাগটি চালুর ক্ষেত্রে কী কী চ্যালেঞ্জ ছিল আর সম্ভাবনা?
শুরু থেকে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো কারিকুলাম তৈরি করা। আবার এটির একটি সুবিধাও ছিল। আমরা যে কারিকুলাম ডেভেলপ করেছি সেটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ডের আদলে তৈরি করেছি। যে কারণে দেশের বাইরে যখন আমাদের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণে যায় তারা প্রশ্ন করেন বাংলাদেশে এ কারিকুলাম পড়ানো হয়! ভারত, পাকিস্তানের একাডেমিশিয়ানরাও বলেছে কারিকুলাম ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ড। কারিকুলাম তৈরিতে আমাদের সহায়তা করেছিলেন অধ্যাপক বীন কাশেম, যিনি আমেরিকা থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছিলেন। আমরা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ি বই নিয়ে। বিদেশ থেকে বই কিনতে হয়েছে। এগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লেখা না। বিভিন্ন দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের পাঠিয়েছি যেখানে ক্রিমিনোলজি বিভাগ রয়েছে। সেখানকার বই ফটোকপি করে শিক্ষার্থীদের আমরা দিয়েছি। এমনকি আমরা শিক্ষকরা নিজস্ব অর্থায়নেও বই কিনেছি। এখন আমাদের সেমিনার, লাইব্রেরি যথেষ্ট সমৃদ্ধ।
ঢাবিতে শুধু ক্রিমিনোলজি বিষয়ে পড়ানো হয়। মাভাবিপ্রবি ও চবিতে ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স নামে বিভাগ রয়েছে। দুটির মধ্যে বিশেষ পার্থক্য কী?
ক্রিমিনোলজি সাবজেক্টে সবকিছুই কাভার করে কিন্তু আমরা যখন পুলিশ সায়েন্স বলব তখন ফরেনসিক, ইনভেস্টিগেশন চলে আসবে। একটি তাত্ত্বিক অপরাধবিজ্ঞান আরেকটি ব্যবহারিক অপরাধবিজ্ঞান। শুধু ক্রিমিনোলজিতে তাত্ত্বিক ও গবেষণাই বেশি ফোকাস। পুলিশ সায়েন্সে ব্যবহারিক ক্রিমিনোলজিতে বেশি ফোকাস করা হয়। যে কারণে আমাদের পাঠ্যক্রমে ক্রিমিন্যাল ইনভেস্টিগেশন, ফরেনসিক, ক্রাইম ম্যাপিং, সাইবার ক্রাইম অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি কোর্স রয়েছে।অপরাধ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রযুক্তিগত দিকগুলো পুলিশ বিজ্ঞানে গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়। কিন্তু শুধু ক্রিমিনোলজিতে এসব বিষয় থাকে না। দেশের চাহিদা অনুযায়ী অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিধি ব্যবস্থা বৈজ্ঞানিকভাবে কীভাবে চলতে পারে তার জন্য আমরা পুলিশ বিজ্ঞান যুক্ত করেছি। মাভাবিপ্রবিতে বিভাগটি লাইফ সায়েন্সের অধীনে পড়ানো হয় অর্থাৎ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে পড়তে পারবেন।
গ্র্যাজুয়েটরা কর্মক্ষেত্রে কেমন করছে?
চাকরির ক্ষেত্রে অলিখিত একটি সুবিধা রয়েছে। যে স্বপ্ন থেকে এ বিভাগটি চালু হয়েছিল তার অনেকগুলো বৈচিত্র্যের জায়গা আমরা খুঁজে পেয়েছি। এখানকার গ্র্যাজুয়েটরা কর্মক্ষেত্রে অনেক ভালো করছে। প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশনে তারা ভালো করছে। যেমন ওয়ালটনের মতো প্রতিষ্ঠানের ইনভেস্টিগেশন সেল ডেভেলপ হয়েছে এ বিভাগের গ্র্যাজুয়েটদের হাত ধরে। সেখানে ৫০ জন চাকরি করছেন। প্রত্যেক ইউনিটে তারা এখন প্রধান। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ জেল, কোস্টগার্ড, সিভিল সার্ভিসসহ অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে গবেষণা সেক্টরে ভালো করছে। অনেক শিক্ষার্থীই দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। আমার জানা মতে, এ পর্যন্ত দু-একজন শিক্ষার্থী ছাড়া সবাই প্রত্যাশিত চাকরি করছে। ব্যাংক সেক্টরেও ইনভেস্টিগেশন ও মানি লন্ডারিং ইউনিটে ভালো করছে।










