আমরা শহুরে বা আধা-শহুরে মানুষ জীবনকে যেভাবে দেখি জীবন কি আসলেই তেমন? এর বাইরেও এক পৃথিবী আছে, যা একেবারে অন্য রকম। যেখানে নেই কোনো কোলাহল, মানুষ যেখানে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে না, যেখানে জীবনকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ রয়েছে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির রোমাঞ্চপ্রিয় শিক্ষার্থীদের অজানাকে জানার সুযোগ দিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব’। শিক্ষার্থীদের দেশ ও দেশের বাইরের প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত করানো, পৃথিবীকে নতুনভাবে উন্মোচন করা, সবাইকে নিয়ে এক সঙ্গে কাজ করা এবং নতুন নতুন দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের পরিচিত করানোই এ ক্লাবের মূল উদ্দেশ্য।
সে জায়গা থেকেই ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব (বিইউএসি) সম্প্রতি তাদের আরেকটি অভিযানের সফল পরিসমাপ্তি করেছে। এ অভিযানে তাদের সঙ্গে আমরা গিয়েছিলাম পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানে অবস্থিত ক্রিসতং ও রুংরাং পাহাড়ে। ক্রিসতং পর্বতচূড়া সমৃদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৯৬৯ ফুট এবং রুংরাং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৭৭২ ফুট ওপরে অবস্থিত। এ দুটি শৃঙ্গ জয় করার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ছিল সবার জন্য এক অনন্য অধ্যায়।
আমরা ১৭ জানুয়ারি রাতে ঢাকা থেকে আমাদের যাত্রা শুরু করি। বান্দরবানের আলিকদমে পৌঁছে সকালের নাশতা করে চাঁদের গাড়িতে করে ২১ কিলোর উদ্দেশে রওনা দিই। সেখানে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা প্রাণবন্ত ভোরের আলোয় উষ্ণ অভ্যর্থনা পাই। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ ৯ ঘণ্টার ট্র্যাক। বন-জঙ্গলে কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে শেষমেশ খেমচংপাড়ার প্রশান্ত অভয়ারণ্যে পৌঁছাই আমরা। দীর্ঘ ও অসম্ভব ক্লান্তিকর এ ভ্রমণের পর আমাদের কারো শরীরই আর সায় দিচ্ছিল না, আর একটুও শক্তি অবশিষ্ট ছিল না।
এদিকে সবারই পেটে তখন ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। একটু বিশ্রাম নেয়ার পর আগুন জ্বালিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই মুরগি বারবিকিউ ও খিচুড়ি রান্না করে ফেললাম সবাই। কনকনে শীত থাকায় লাকড়ি জ্বালিয়ে সবাই আগুনের পাশে বসে পড়লাম। বিইউএসির কয়েকজন সদস্য গল্পের ঝুড়ি খুলে বসল। গল্প আর আড্ডা উপভোগ করতে করতে কনকনে শীতের রাত কাটিয়ে দেয়া যেন এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে আমরা ক্রিসতংয়ের কঠিন ঢাল বেয়ে ওপরে উঠি। শৃঙ্গের সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করেছে। পাহাড় বেয়ে ওঠা অসম্ভব কঠিন এক কাজ। আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তবে আমাদের হাতে সময় কম ছিল। আমাদের রুংরাং শৃঙ্গও জয় করতে হবে। এ ভাবনাই যেন আবারো সবার মধ্যে শক্তির সঞ্চার করে। সেদিনই আমরা রুংরাংয়ের পথে যাত্রা করি।
দ্বিতীয় এ দিনটি ছিল ক্লান্তিতে ভরা। আমরা হাঁটছি তো হাঁটছি। পথের যেন শেষ নেই। ৬ ঘণ্টার দীর্ঘ ট্র্যাকিংয়ের পর আমরা যখন ক্লান্ত শরীর নিয়ে খুব কঠিন চড়াই-উতরাই পার করে রুংরাংয়ের চূড়ায় পৌঁছলাম, তখন নতুন এ দৃশ্য দেখে আমাদের সব ক্লান্তি মিটে গেল। আমরা সবাই মিলে এ অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করলাম। তখনো অর্ধেক যাত্রা বাকি, যেতে হবে মেনিয়াংপাড়া।
শুরু হলো যাত্রা। ৪০ জনের দল নিয়ে মেনিয়াংপাড়া পৌঁছাতে আরো ৪ ঘণ্টা লেগে গেল। কিন্তু মেনিয়াংপাড়ার তারাভরা আকাশ যেন সব ক্লান্তির অবসান ঘটায়। পরের দিন মেনিয়াংপাড়া থেকে ভোর সাড়ে ৬টায় যাত্রা শুরু করি এবং ৬ ঘণ্টার ট্র্যাকিংয়ের পর ডুসরি বাজারে পৌঁছাই। ডুসরি বাজার থেকে আমরা ২ ঘণ্টার অসাধারণ নৌকাভ্রমণ উপভোগ করি। নৌকা আটকে গেলে সবাই মিলে নৌকা ঠেলা দেয়ার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমাদের ক্রিসতং ও রুংরাং ভ্রমণ শেষ হয়।
পাহাড়ে ওঠা বা নামার মুহূর্তগুলো ছিল অন্য রকম। পাহাড়ের এ বিশালত্ব মনে করিয়ে দিয়েছে মানুষ হিসেবে আমরা কত ক্ষুদ্র আর অসহায়। পায়ের নিচে বিশাল শূন্যতা। আমাদের সবারই মনে হচ্ছিল, এই বুঝি পা হড়কালো। আমরা একে অন্যের হাত শক্ত করে ধরেছি, নিজের সঙ্গে অন্যদের কথাও প্রতি মুহূর্তে ভেবেছি। ঠিক তখনই মনে হয়েছে এটাই তো জীবন। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাই তো জীবন নয়, সবার সঙ্গে ভালোভাবে বেঁচে থাকাটাই তো জীবনের আসল উদ্দেশ্য।
পাহাড় থেকে ফেরার ইচ্ছে করছিল না। পাহাড়ের বুকের পথগুলো যেন হাজার বছরের অজানা প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছে। আমরা বারবার এ পথের পথিক হতে চাই। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব (বিইউএসি) এবং এর সদস্যদের স্মৃতিতে এ যাত্রা একটা বিশেষ স্থান দখল করে থাকবে সারা জীবন। তবে আমাদের এই “Winners of All Barriers” হওয়ার যাত্রা কখনো থামবে না। নতুন দিনে, নতুন পায়ে আমরা আবারো খুঁজব অদম্য বিজয়ী হওয়ার নতুন পথ। কারণ আমাদের সবার জীবন একটা অভিযাত্রা ছাড়া তো আর কিছু নয়!
মো. ইফতেখার হোসেন
জেনারেল সেক্রেটারি
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব (বিইউএসি)










